রাশিয়া ও ইউক্রেনের যুদ্ধ ৫ মাস পার হয়ে যাওয়ার পরও এ যুদ্ধ আর কতদিন চলবে তা এ মুহূর্তে বলা মুশকিল। রাশিয়া এরইমধ্যে ইউক্রেনের দনবাসে তার অবস্থান সুসংহত করেছে। তারা এখন দনবাসের দখলকৃত এলাকার শহরগুলো দেখাশোনার দায়িত্ব দিয়েছে রাশিয়ার বিভিন্ন স্থানীয় সরকারকে। এই প্রক্রিয়ার অধীনে রুশ আঞ্চলিক সরকার দোনেৎস্ক ও লুহানস্ক শহরের অভিভাবকত্ব গ্রহণ করেছে। রাশিয়া ইউক্রেনে এ যাবৎ দুই হাজার ৬১০টি শহর দখল করে নিয়েছে। শুধু তাই নয়, গত ৫ মাসের যুদ্ধে ইউক্রেনের প্রায় ৮০ শতাংশ সামনের সারির যোদ্ধা, হয় নিহত অথবা যুদ্ধ থেকে ছিটকে পড়েছে। এ কথা ইউক্রেনও স্বীকার করে নিয়েছে। ইউক্রেন বাহিনীর জনবলের অবস্থা এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, নতুন করে রিক্রুট করে যে জনবল বৃদ্ধি করবে সে অবস্থায়ও নেই। এর কারণ হলো, ইউক্রেনের যুবকদের মধ্যে সামরিক বাহিনীতে যোগদানের উৎসাহ আগের চেয়ে কম দেখা যাচ্ছে। তাদের অধিকাংশই দেশ ছেড়ে চলে যাচ্ছেন। তবে নতুন যে সৈনিক রিক্রুট করে স্বল্পমেয়াদি প্রশিক্ষণ দিয়ে যাদেরই সেনাবাহিনীতে অন্তর্ভুক্ত করা হচ্ছে, তারা স্বাভাবিক কারণেই মূল যোদ্ধাদের চেয়ে দক্ষতা ও পেশাদারিত্বে অনেক পিছিয়ে আছে।
এত সীমাবদ্ধতার মধ্যেও ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল রয়েছেন। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমারাও জেলেনস্কির এই সিদ্ধান্তকে সমর্থন দিয়ে যাচ্ছেন। পরিস্থিতি পর্যালাচনা করে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষকই বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপীয় গোষ্ঠী ইউক্রেনের কাঁধে বন্দুক রেখে এ যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছে। এ জন্য, যুদ্ধ শুরুর পর, যুক্তরাষ্ট্র একাই ইউক্রেনকে ২৪ বিলিয়ন ডলারের সামরিক সাহায্য দিয়েছে। ইউরোপীয় দেশগুলোও সামরিক সাহায্য প্রদানে পিছিয়ে নেই। তারা ইতিমধ্যে ১২ বিলিয়ন ডলারের মতো সাহায্য পাঠিয়েছে। যুদ্ধের সময় বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে পশ্চিমারা ইউক্রেনকে আরও শক্তিশালী অস্ত্র দিতে শুরু করেছে। ইউক্রেনে কেবল অস্ত্র সরবরাহ করেই ক্ষান্ত হয়নি; সরাসরি যুদ্ধের ঘোষণা দিয়ে সৈন্য না পাঠালেও সেসব দেশের অনেক নাগরিক ও প্রাক্তন সেনা সদস্যরা রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধে অংশগ্রহণ করছে। রাশিয়া দাবি করেছে, ইউক্রেনে চলমান যুদ্ধে ৬৪টি দেশ থেকে আসা ভাড়াটে যোদ্ধা ও সামরিক বিশেষজ্ঞ যুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে পোল্যান্ড সবচেয়ে বেশি ভাড়াটে যোদ্ধা পাঠিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র দ্বিতীয় অবস্থানে আছে।
এমন পরিস্থিতিতে রাশিয়াও বসে নেই। তারাও ইউক্রেনে পাল্টা ধ্বংসযজ্ঞ চালিয়ে যাচ্ছে। ২৫ জুলাই ইউক্রেনের চুহুভ শহরে রুশ বাহিনী ১০ দফা ক্ষেপণাস্ত্র আক্রমণ চালিয়ে একটি স্কুল, একটি জাদুঘর ও বহু বেসামরিক ভবন মাটিতে মিশিয়ে দিয়েছে। এদিকে ২৭ জুলাই রুশ বাহিনী ইউক্রেনের দ্বিতীয় বৃহতম বিদ্যুৎকেন্দ্র নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে নিয়েছে। একই সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলীয় তিনটি এলাকায় বিপুল সৈন্য সমাবেশ ঘটিয়েছে। অনুমান করা হচ্ছে, বড় কোনো হামলার পরিকল্পনা করছে রুশ সেনারা।
গত ২৪ ফেব্রুয়ারি ইউক্রেন আক্রমণের পরপরই যুক্তরাষ্ট্র ও ন্যাটোভুক্ত দেশগুলো রাশিয়ার এ আগ্রাসন মোকাবিলায় ইউক্রেনকে রাশিয়ার বিরুদ্ধে ব্যবহার করার ফন্দি আঁটে। সে মোতাবেক তারা ইউক্রেনকে সহায়তার জন্য বিপুল পরিমাণ সাহায্য নিয়ে এগিয়ে এলেও নিজেরা সরাসরি সংঘাতে জড়িত হওয়া থেকে বিরত থেকেছে। রাশিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে তাদের কারোর যে আগ্রহ নেই তা তাদের আচরণেই বুঝিয়ে দিয়েছে। এ যুদ্ধ ইউক্রেনের সীমানার মধ্যে যেন সীমাবদ্ধ থাকে সেটি নিশ্চিত করতে ভারী অস্ত্র সরবরাহের সময় এসব অস্ত্র ব্যবহারে কতগুলো শর্ত জুড়ে দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা। তারা স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, ইউক্রেন যেন রাশিয়ার ঘোষিত কোনো রেডলাইন অতিক্রম না করে। অর্থাৎ এই অস্ত্র যেন রাশিয়ার মূল ভূখ-ের অভ্যন্তরে হামলায় ব্যবহৃত না হয়।
ইউক্রেন আক্রমণের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা রাশিয়াকে উপযুক্ত শিক্ষা দিতে অর্থনৈতিক অবরোধ থেকে শুরু করে নানা প্রকার নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। পশ্চিমা জোট চেয়েছিল রাশিয়াকে একঘরে করে ফেলবে। কিন্তু দিন যতই গড়িয়েছে ততই যেন মনে হচ্ছে, পশ্চিমাদের সে পরিকল্পনা ভেস্তে যাচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র ও পশ্চিমাদের অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার বিরুদ্ধে রাশিয়া পাল্টা ব্যবস্থা গ্রহণ করায়, ইউরোপের কয়েকটি দেশ বেশ বিপাকে পড়েছে। বিশেষ করে রাশিয়ার গ্যাসের ওপর নির্ভরশীল দেশগুলোই এই বিপাকে পড়েছে। এ সমস্ত দেশ রাশিয়ার ওপর পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার বিষয়ে বেশ নমনীয় মনোভাব প্রকাশ করছে। কারণ ইউরোপের চাহিদার প্রায় ৪০ শতাংশ গ্যাস রাশিয়া সরবরাহ করে থাকে। রাশিয়া পশ্চিমাদের নিষেধাজ্ঞার জবাব দিতে গিয়ে ইউরোপে গ্যাস সরবরাহ কমিয়ে দিতেই এসব দেশ বিপদে পড়েছে। ফলে বেড়ে চলেছে তেল ও গ্যাসের মূল্য। তাতে ইউরোপের কিছু কিছু সরকারপ্রধান ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। হাঙ্গেরির প্রধানমন্ত্রী ভিক্তর ওরবান তাদের একজন। তিনি বলেছেন, ‘রাশিয়ার ওপর নিষেধাজ্ঞায় ইউরোপ নিজেদের ফুসফুসে গুলি করেছে। রাশিয়ার ওপর ইউরোপীয় ইউনিয়ন যেসব নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে তা ছিল ভুল। ইউরোপীয় ইউনিয়ন তার অবস্থান পরিবর্তন না করলে এই নিষেধাজ্ঞা ইউরোপের অর্থনীতি ধ্বংস করে দেবে’। রাশিয়ার ওপর চাপিয়ে দেওয়া পশ্চিমা দেশগুলোর নিষেধাজ্ঞা কাজে আসেনি। তিনি হতাশা প্রকাশ করে বলেছেন, ‘ন্যাটোর বর্তমান কৌশলে রাশিয়ার বিরুদ্ধে যুদ্ধ জয় সম্ভব নয়।’
রাশিয়াকে অর্থনৈতিক অবরোধ ও নিষেধাজ্ঞার ফাঁদে ফেলতে গিয়ে পশ্চিমারা নিজেরাই যেন ফাঁদে আটকা পড়েছে। রাশিয়ার হাতে এখন বড় হাতিয়ার জ্বালানি। ইউক্রেনে আগ্রাসনের পর থেকে পশ্চিমা নিষেধাজ্ঞার বিপরীতে রাশিয়া এ পর্যন্ত বুলগেরিয়া, ফিনল্যান্ড, পোল্যান্ড, ডেনমার্ক ও নেদারল্যান্ডসে গ্যাস সরবরাহ স্থগিত করেছে। রুবলে গ্যাসের মূল্য পরিশোধের শর্ত না মানায় এসব দেশে গ্যাস দেওয়া বন্ধ করে দিয়েছে রাশিয়া। ৩০ জুলাই থেকে রাশিয়া লাটভিয়াতেও গ্যাস সরবরাহ বন্ধ করেছে। রাশিয়ার এরকম পদক্ষেপকে পশ্চিমারা ‘ব্ল্যাকমেল’ বলে অবহিত করেছে। রাশিয়া যদি এভাবে গ্যাস সরবরাহ কমাতে থাকে তাহলে শীত মৌসুমে ইউরোপীয় দেশগুলো আরও বিপাকে পড়ে যাবে। শীতে ইউরোপীয় দেশগুলোতে জ্বালানির চাহিদা বেশি থাকে। শীতের কথা ভেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন (ইইউ) এখন থেকেই স্বেচ্ছায় গ্যাসের ব্যবহার ১৫ শতাংশ কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে এবং সদস্য দেশগুলোকে এ সিদ্ধান্ত মেনে চলতে বলেছে। কিন্তু হাঙ্গেরিসহ আরও কয়েকটি দেশ এই পরিকল্পনা খারিজ করে দিয়ে জানিয়েছে, এই পরিকল্পনা অন্যায্য, অর্থহীন এবং ক্ষতিকর। তারা বলেছে, কোন সদস্য দেশ কার কাছ থেকে গ্যাস নেবে, কতটা ব্যবহার করবে, তা ঠিক করার আইনগত অধিকার ইইউ-র নেই। তাদের নিজেদের যখন গ্যাস আছে, তখন দেশের মানুষ বা কোম্পানি কেন ব্যবহার কম করবে? হাঙ্গেরি ছাড়াও স্পেন, পর্তুগাল, গ্রিস ও পোল্যান্ড ইইউ-এর সিদ্ধান্তের সঙ্গে একমত হতে পারেনি।
এতদসত্ত্বেও ইইউ ২০২২ সালের পর রাশিয়া থেকে অপরিশোধিত ও পরিশোধিত কোনো ধরনের জ্বালানি পণ্য আমদানি না করা সংক্রান্ত একটি চুক্তিতে পৌঁছেছে। ইউরোপে জ্বালানি রপ্তানি বন্ধ হলেও রাশিয়ার বড় বেশি সমস্যা হবে বলে মনে হয় না। কারণ দেশটি ইতিমধ্যেই এশিয়ায় তাদের গ্যাস রপ্তানি সম্প্রসারণ করছে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্র যদি এভাবেই ইউক্রেনের প্রতি তাদের সমর্থন অব্যাহত রাখে, তাহলে আগামী শীতে যেসব ইউরোপীয় দেশ জ্বালানি সংকটের সম্মুখীন হবে তারা হয়তো যুক্তরাষ্ট্র থেকে আলাদা হয়ে রাশিয়ার ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নিতেও পারে। যদি তাই হয়, তাহলে রাশিয়ার জন্য তা হবে শাপেবর।
এ যুদ্ধের শেষ পরিণতি কী তা এখনই বলা যাচ্ছে না। তবে অনেকেরই প্রশ্ন, রাশিয়া যেভাবে একের পর এক এলাকা দখল করে চলেছে তাতে তারা শেষ পর্যন্ত কি সম্পূর্ণ ইউক্রেনই দখল করে নেবে? সম্ভবত নয়। তাই যদি হতো, তাহলে কিয়েভ দখল করার সব প্রস্তুতিই রাশিয়া গ্রহণ করত। শেষ পর্যন্ত রাশিয়া ইউক্রেনকে নিরস্ত্রীকরণের পথেই হয়তো হাঁটবে। যুদ্ধের শুরুতেই রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিন এ কথাই বলেছিলেন। দখলকৃত দোনেৎস্ক ও লুহানস্কের স্বাধীনতা নিশ্চিতকরণসহ রাশিয়ার প্রতি অনুগত এমন একজনকেই তারা ইউক্রেনের শাসন ক্ষমতায় দেখতে চায়। রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভের সাম্প্রতিক বক্তব্যে সে ইঙ্গিতই মেলে। ২৪ জুলাই মিসরে এক কূটনৈতিক সফরে গিয়ে লাভরভ বলেছেন, ‘ইউক্রেনের ইতিহাসবিরোধী সরকারের হাত থেকে নিজেদের মুক্ত করতে দেশটির জনগণকে আমরা অবশ্যই সহায়তা করব। এ জন্য ইউক্রেনে সরকার পরিবর্তন চায় মস্কো।’ অতএব, এ যুদ্ধের শেষ পরিণতি দেখার জন্য আমাদের হয়তো আগামী শীত মৌসুম পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে!
লেখক অবসরপ্রাপ্ত ব্রিগেডিয়ার জেনারেল ও কলামিস্ট