৫২ টাকার নিচে চাল নেই, ডিমের দামেও রেকর্ড

জ্বালানি তেলের দামের প্রভাব সবচেয়ে বেশি পড়েছে নিত্যপণ্যের বাজারে। এক সপ্তাহের ব্যবধানে চাল-ডাল, মাছ-মাংস বা সবজি ও ডিমের মতো প্রয়োজনীয় এমন কোনো পণ্য নেই খুচরায় যার দাম বাড়েনি। গতকাল বৃহস্পতিবার রাজধানীর বিভিন্ন বাজার ঘুরে দেখা গেছে, বাজারে ৫২ টাকার নিচে কোনো চাল নেই। পেঁপে ছাড়া ৬০ টাকার নিচে কোনো সবজি নেই। দাম বেড়েছে প্রায় সব ধরনের মাছ-মাংসের। ডিমের ডজনও ১৪০ টাকা। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ডলার সংকট ও হঠাৎ তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচসহ আনুষঙ্গিক সবকিছুই বেড়েছে। এ কারণেই জিনিসপত্রের দাম বেড়েছে।

গতকাল রাজধানীর মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট, কারওয়ান বাজার ও পলাশী বাজার ঘুরে এসব তথ্য পাওয়া গেছে। গতকাল বাজারে মোটা চাল ৫২ থেকে ৫৩ টাকায় বিক্রি হতে দেখা গেছে। প্রতি কেজি মিনিকেট চাল বিক্রি হচ্ছে ৭০-৭১ টাকায়, যা এক সপ্তাহ আগেও ছিল ৬৫ টাকা। ৭২ টাকার নাজিরশাইল ৮০-৮২, ৭১ টাকার কাটারিভোগ ৭৩, ৭৮ টাকার বাসমতী ৮০-৮১ এবং ১০৮ টাকার চিনিগুঁড়া বিক্রি হচ্ছে ১০৮-১১০ টাকায়।

মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেটের নোয়াখালী রাইস মিলের বিক্রেতা বাপ্পি দেশ রূপান্তরকে বলেন, পাইকারিতে দাম বাড়ায় খুচরায় প্রতি কেজি চালে তিন থেকে ছয় টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এদিকে কাঁচাবাজার ঘুরে দেখা যায়, সব ধরনের সবজির দামই বাড়তি। প্রতি কেজি গোল বেগুন ৮০, লম্বা বেগুন ৬০, করলা ৭০-৮০, কাঁকরোল ৬০-৭০, ঝিঙে ৮০, পটোল ৫০-৬০, টমেটো ১২০-১৩৫, কাঁচা মরিচ ২২০, কচুর মুখি ৫০, চালকুমড়া ৪৫ থেকে ৫০, চিচিঙ্গা ৫৫-৬০, বরবটি ৭০, ঢেঁড়স ৫০ ও কাঁচা পেঁপে ৪০ টাকা কেজিতে বিক্রি হচ্ছে।

কারওয়ান বাজারের সবজি বিক্রেতা হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, তেলের দাম বাড়ায় সবজির দাম বেড়ে গেছে। পটোলের দাম ২৫ থেকে ৩০ টাকা ছিল দু-এক দিন আগেও। আর আজকে দাম ৪০ টাকা। অন্যসব সবজির দামও বাড়তি। করলার দাম কেজিতে বেড়েছে ২০-৩০ টাকা।

পলাশী বাজারের সবজি বিক্রেতা মো. আবদুল্লাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, তেলের দাম বাড়ায় পরিবহন খরচ বেড়েছে, এতে সব ধরনের সবজি কেজিতে ১৫-২০ টাকা বেড়েছে।

চাল-সবজি ছাড়াও বেড়েছে মুরগি, ডিম ও পেঁয়াজের দাম। এক সপ্তাহের ব্যবধানে খুচরা বাজারে সব ধরনের মুরগি কেজিতে ১৫-২০, ডিম ডজনে ১৫-২০ পর্যন্ত বেড়েছে। খুচরা দোকানে ডিমের ডজন বিক্রি হচ্ছে ১৪৫ থেকে ১৫০ টাকায়। পেঁয়াজের কেজিতে বেড়েছে ২ থেকে ৪ টাকা।

কারওয়ান বাজার ঘুরে দেখা গেছে, পাইকারি বাজারে হাইব্রিড পেঁয়াজের পাল্লা (৫ কেজি) বিক্রি হচ্ছে ১৯০-২০০, ভারতীয় পেঁয়াজ ১৮০ আর দেশি পেঁয়াজ ২৪০ টাকায়। অথচ কয়েক দিন আগেও ২২০ টাকায় দেশি পেঁয়াজ এবং অন্যগুলোও ১০-২০ টাকা কমে বিক্রি হয়েছে। এখন পাল্লায় ১০ থেকে ২০ টাকা এবং কেজিতে ২ থেকে ৪ টাকা বেড়েছে।

খুচরা বাজারে দেশি পেঁয়াজ কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ৫০ টাকায় আর ভারতীয় ৪০ টাকায়। আলুর দাম পাইকারি বাজারে কিছুটা কমেছে। ১৩০ টাকা ছিল পাল্লা। ১০ টাকা কমে এখন সেটা বিক্রি হচ্ছে ১২০ টাকায়। আর খুচরা বাজারে প্রতি কেজি বিক্রি হচ্ছে ৩০ টাকায়।

কারওয়ান বাজারে আসা আল-আমিন নামে এক ক্রেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা পড়াশোনার জন্য মেসে থাকতে হয়। এক মাস আগেও মাছের মিল পড়ত ৪০-৪২ টাকা। কিন্তু গত দুই সপ্তাহের ব্যবধানে সেই মিল পড়ছে ৫৫-৬০ টাকার মতো। মিল খরচ ও পুষ্টিগুণ বিবেচনায় প্রায় সময় খাবার তালিকায় ডিম রাখা হতো। কিন্তু বাজারে এসে দেখছি প্রতি হালি ডিম বিক্রি হচ্ছে ৪৫-৫০ টাকা। বর্তমানে মাছ দিয়ে খাওয়া আর ডিম দিয়ে খাওয়া একই কথা।

মুরগির বাজার ঘুরে দেখা যায়, সব ধরনের মুরগিতে ১০-২০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। প্রতি কেজি ব্রয়লার মুরগি বিক্রি হচ্ছে ১৯০-২০০, লেয়ার মুরগি ২৯০-৩০০ এবং পাকিস্তানি মুরগি ৩২০-৩৪০ টাকা।

পলাশী বাজারে আসা সাব্বির নামে এক ক্রেতার সঙ্গে কথা হলে তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বাজারগুলোতে এমন কোনো পণ্য নেই যার দাম বাড়েনি। বাজারে এলে মনে হয় এই জীবন টিকিয়ে রাখা অনেক কঠিন। যেভাবে নিত্যপণ্যের মূল্য বাড়ছে, সেভাবে আমাদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়ন হচ্ছে না। বিশেষ করে ব্যয় অনুযায়ী আমাদের আয় বাড়েনি। বরং মালিক পক্ষ তাদের কোম্পানির অর্থনৈতিক অবস্থার কথা খারাপ উল্লেখ করে কয়েক মাসের বেতন আটকে রেখেছে। এভাবে ধার-দেনা করে আর কত দিন চলতে পারব জানি না।’

গত এক সপ্তাহে মুরগির দাম বেড়েছে স্বীকার করে ব্যবসায়ীরা বলেন, পরিবহন খরচ বৃদ্ধি হওয়ায় মুরগির দাম বেড়েছে। খামারিদের থেকে কেনা মুরগি বাজারে আনতে আনতে আগের তুলনায় প্রতি কেজি মুরগিতে আরও অন্তত ৫-৮ টাকা খরচ বেড়েছে।

অন্যদিকে আটা, ময়দা, চিনি, লবণের দামও বেড়েছে। মোহাম্মদপুর কৃষি মার্কেট ও এর আশপাশের দোকান ঘুরে জানা গেছে, ৫০ কেজির প্রতি বস্তা আটায় বেড়েছে ১৫০-১৮০ টাকা। ময়দায় ৭০, চিনিতে বেড়েছে ১৫০ টাকা। গত সপ্তাহেও লবণ ৩৫, খোলা চিনি ৮০, প্যাকেট চিনি ৮৫ ও খোলা আটা ৫০ টাকায় বিক্রি হয়েছে। কিন্তু বর্তমানে কেজিপ্রতি দাম বেড়ে লবণ ৩৮, খোলা চিনি ৮৫, প্যাকেট চিনি ৯০ ও আটা ৫৫ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।