মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা

করোনা-পরবর্তী জনজীবনে স্বাভাবিকতা ফিরে এলেও সরকার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করায় জনজীবন আবারও অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে খাদ্য, পণ্য থেকে শুরু করে সবকিছুর দাম দ্রুত বাড়ার কারণে জনজীবন দুর্দশাকবলিত হয়ে পড়েছে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের সমন্বয়হীনতায় মানুষের ত্রাহি অবস্থা।

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি পরিবহন খাতে যে প্রভাব ফেলেছে তা সামগ্রিকভাবে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম সংকট। এতে একই সঙ্গে পরিবহন খাতেও নৈরাজ্য সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি দলের নেতা, সাংসদ, মন্ত্রিপর্যায়ের অনেকে এই পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণ করেন। তাই পরিবহন ক্ষেত্রে জনগণের স্বার্থ দেখার সরকারের কোনো উপায় আগেও ছিল না। আজও নেই। কয়েক মাস আগে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সময় পরিবহন মালিকদের সঙ্গে সরকার দেন-দরবার করে দেশে পরিবহন ভাড়া ২৭ শতাংশ বৃদ্ধি করেছিল। এবারও বাসমালিকদের সঙ্গে বিআরটিএর চেয়ারম্যান ঘোষণা দিয়েছেন বাসভাড়া আবারও বৃদ্ধি করা হলো ২০ শতাংশ। অর্থাৎ গত কয়েক মাসের ব্যবধানে বাসভাড়া বেড়ে দাঁড়াল ৪৭ শতাংশ। এতে পেশাজীবী প্রতিটি নিম্ন আয়ের মানুষকে গুনতে হবে অধিক যাতায়াত ভাড়া। যারা গণপরিবহনে যাতায়াত করেন তারা নিম্ন আয়ের সাধারণ মানুষ, ছাত্র, বেসরকারি কর্মচারী। কিন্তু তাদের বেতন-ভাতা বৃদ্ধির কোনো লক্ষণ তো এ যাবৎ দেখা যায়নি। দেখা যাবে বলেও অনুমান করা যাবে না।

বর্তমান মূল্যস্ফীতিতে একমাত্র সরকারি চাকুরেরাই স্বস্তিতে আছেন। সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন সরকার দ্বিগুণ করেছে বটে। তবে মোট জনসমষ্টির কত শতাংশ মানুষ সরকারি চাকরিজীবী? বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে সর্বাধিক মানুষ কাজ করে, অথচ তাদের বেতন বৃদ্ধি তো পরের কথা, করোনা মহামারীর সময় থেকে তাদের বেতন-ভাতা হ্রাস এবং অনিয়মিত হয়ে পড়েছে। দেশে পত্রিকার সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে সত্য। কিন্তু ব্যক্তি মালিকানাধীন সংবাদপত্রশিল্পে কর্মরতদেরও বেতন-ভাতা করোনাকালীন থেকে অনিয়মিত। বিকল্প পেশার অভাবে বেশির ভাগ পত্রিকার পেশায় যুক্তরা অনিয়মিত বেতন-ভাতা পেয়েও নিরুপায়ে ওই পেশায় যুক্ত থাকতে বাধ্য হয়েছেন।

বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য যখন নিম্নমুখী, সরকার তখনই কোনোরূপ পূর্ব ঘোষণা ব্যতিরেকে ডলার সংকট ও বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে দেশে জ্বালানি তেলের মূল্য রাতের আঁধারে বাড়িয়ে দিয়ে চরম সংকটের মুখে ঠেলে দিয়েছে দেশবাসীকে। আইএমএফের শর্তের বেড়াজালে আটকে পড়া সরকার আইএমএফের নির্দেশনায় অনুগত হয়েই অত্যন্ত অজনপ্রিয় হঠকারী এই সিদ্ধান্ত দেশবাসীর ওপর চাপিয়ে দিয়েছে। অথচ সরকার পক্ষ বলছে, আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সমন্বয়ের জন্য জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি করেছে তারা। বাস্তবতা হচ্ছে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্যহ্রাস পাওয়ার ঠিক বিপরীত। সরকারের এই সিদ্ধান্তের ফলে পরিবহন, কৃষি, শিল্প, বাণিজ্য, অর্থাৎ পুরো উৎপাদনব্যবস্থা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যসামগ্রী হতে সব ক্ষেত্রের ওপর মারাত্মক বিরূপ প্রভাব ফেলবে। অতীতের সব দরবৃদ্ধির রেকর্ড ম্লান করে বিশ্বরেকর্ড গড়েছে। আইএমএফ তাদের দেওয়া ঋণ পরিশোধের নিশ্চয়তায় সরকারকে জনবিরোধী যে নির্দেশনা দিয়েছে, সরকার জনগণের কথা না ভেবে সেই নির্দেশনা অনুসরণ করেছে। আইএমএফের কঠোর শর্তে সরকার ঋণ গ্রহণের ফলে ঋণ পরিশোধের উপায় হিসেবে তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী আর্থিক সংকটের বোঝা দেশের সমষ্টিগত মানুষের ওপর চাপিয়ে আন্তর্জাতিক লগ্নি পুঁজি ও তার সহযোগী ধনিক শ্রেণির শোষণ-লুণ্ঠনের স্বার্থরক্ষার পথকেই প্রসারিত করেছে।

জ্বালানি তেলের পাশাপাশি গ্যাস ও বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির নির্দেশনাও আইএমএফ দিয়েছে। সেটাও সরকার অতি দ্রুত বাস্তবায়নের পথে এগোচ্ছে। অবস্থাদৃষ্টে একটি রাজনৈতিক দল রাষ্ট্রক্ষমতায় থাকা সত্ত্বেও জনগণের ওপর মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা মেরে কেন চলেছে? তার প্রধানতম কারণটি হচ্ছে সরকার অনিবার্যরূপে জনগণের স্বার্থকে তোয়াক্কা করছে না। কেননা ক্ষমতাসীন সরকারের এখন আর জনগণের ভোটের প্রয়োজন পড়ে না। আকস্মিক এবারও যে জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে, সেটাও রাতের আঁধারেই ঘটেছে। অন্ধকার রাতে ঘটে যাওয়া প্রমাণ করে সরকার অন্ধকারকে বেছে নিয়ে অন্ধকার পথেই হাঁটছে। দিনের আলোকে আলোকিত হওয়ার মোটেও ইচ্ছে নেই তাদের।

মাঝরাতের ঘোষণায় ৮০ টাকার ডিজেল ও কেরোসিন ১১৪ টাকা, ৮৬ টাকার পেট্রল ১৩০ টাকা এবং ৮৯ টাকার অকটেন ১৩৫ টাকা প্রতি লিটার নির্ধারণ করেছে। ওদিকে প্রতিবেশী ভারতে বিশ্ববাজারে তেলের মূল্য হ্রাস পাওয়ায় তারা জ্বালানি তেলের মূল্য কিছুটা কমিয়েছে। অস্বাভাবিক এই দরবৃদ্ধির ফলে সরকারের লাভের পরিমাণ বৃদ্ধি পাবে। ভারতে বর্তমানে পেট্রল ১০৫ রুপি এবং ডিজেল ৯৩ রুপিতে বিক্রি হচ্ছে।

অন্যদিকে, দেশে চলতে থাকা অবাধ লুণ্ঠনের এবং বিদেশে টাকা পাচার ঠেকাতে ব্যর্থতার দায় সরকার নিশ্চয়ই এড়াতে পারেন না। কেননা ওইসব অপকর্মে লিপ্তরা সরকারের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাই তারা ধরাছোঁয়ার বাইরে। সরকার সে-বিষয়ে কঠোর হলে আইএমএফের ঋণের জালে জড়িয়ে কঠোর শর্ত পালন করতে গিয়ে দেশবাসীকে এমন বিপর্যস্তের কবলে ঠেলে দিতে হতো না।

দেশের কাঁচাবাজারে মাছ, মাংস, সবজি থেকে শুরু করে সব ধরনের খাদ্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধি ঘটেছে পরিবহন খরচ দুই দফায় ৪৭ শতাংশ বৃদ্ধিতে। আয়ের সঙ্গে ব্যয়ের অসংগতির টানাপড়েনে জনজীবনে নেমে এসেছে চরম হতাশা। ক্ষুব্ধ প্রগতিশীল ছাত্ররা শাহবাগসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে বিক্ষোভ, সভা, মিছিল করেছে। কিন্তু পুলিশ নির্দয়ভাবে অমানুষিক নির্যাতন করে তাদের রক্তাক্ত করেছে। দেশ যে এখন চরম আমলাতান্ত্রিক ও পুলিশি রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে পড়েছে, এ বিষয়ে তো সন্দেহের কোনোই অবকাশ নেই। সরকার জনবান্ধব তো নয়ই, প্রকৃতই আমলাতন্ত্রনির্ভর গণবিরোধী সরকারে পরিণত। যেহেতু জনগণের ভোটের প্রয়োজন নেই। তাই জনগণের প্রতি কোনো দায়দায়িত্ব, সহানুভূতিও তাদের নেই।

এদিকে, কাগজের মূল্যবৃদ্ধির ফলে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি দেশের প্রকাশনাশিল্পে মারাত্মক প্রভাব পড়েছে। একটি জাতির শিক্ষা ও সংস্কৃতির বাহন রূপে সৃষ্টিশীলতা-সৃজনশীলতা, জ্ঞান-বিজ্ঞানের জন্য বই সহায়ক ভূমিকা পালন করে। তেমনি শিক্ষার্থীদের পাঠ্যপুস্তক, লেখার খাতার মূল্য প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ বৃদ্ধি পেয়েছে। এর বিরূপ প্রভাব এরই মধ্যে শিক্ষার্থীদের ওপর পড়েছে। পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি জ্ঞান অর্জনে পড়–য়া পাঠকদের বই কেনার ও পাঠের প্রবণতা ক্রমাগত সংকুচিত হয়ে পড়বে। এতে পড়াশোনাটা একমাত্র জীবিকানির্ভর হয়ে পড়বে, জ্ঞান অর্জনের জন্য বই পড়া থাকবে বলে মনে হচ্ছে না।

তাহলে কি এ রকম অমানবিক শাসনের কবল থেকে আমাদের পরিত্রাণের কোনো অবকাশ নেই? নিশ্চয়ই আছে। অতীত ইতিহাসেই তার অজস্র প্রমাণ রয়েছে। আমরা জানি ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ঘটে না। কিন্তু ইতিহাস তো বলে এমন শাসনের পরিণতি শুভফল বয়ে এনেছে, বিশ্বব্যাপী তেমন দৃষ্টান্ত কিন্তু একটিও খুঁজে পাওয়া যাবে না।

লেখক : নির্বাহী সম্পাদক, নতুন দিগন্ত