৬ আগস্ট ১৯৪৫, আলো ঝলমলে সকাল, হিরোশিমা শহরের প্রাণচাঞ্চল্য নিত্যদিনের মতোই। আগের রাতে নিশ্চিন্তে ঘুমানো মানুষ এয়ার অ্যাটাকের সাইরেনকে পাত্তা না দিয়েই যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে ছুটছে। সকাল ৮:১৫ মিনিট, পৃথিবী যেন শিউরে উঠল কয়েক সেকেন্ডের ব্যবধানে। সাড়ে আট হাজার ফুট ওপর থেকে ‘ইনোলা গে’ নামে একটি বিমান ৯০ ডিগ্রি বাঁক নিয়ে হিরোশিমার বুকে নিক্ষেপ করল ‘লিটল বয়’ নামক প্রলয়ংকরী যান্ত্রিক দানবকে। পৃথিবীর প্রথম পারমাণবিক বোমার তান্ডব নৃত্যে কম্পিত হলো হিরোশিমা শহর। হিরোশিমা গ্রাউন্ড জিরোতে পাওয়া ইতিহাসের সাক্ষী ঘড়িগুলোর মতোই থমকে গিয়েছিল পৃথিবী, বাঁক বদল করেছিল ইতিহাসের গতিপথও। ৩৫ টন বিস্ফোরণ ক্ষমতাসম্পন্ন ভুবনবিনাশী বোমার ধোঁয়ায় ঢেকে যায় হিরোশিমার আকাশ-বাতাস আর নিচে পড়ে থাকে হাজারো মানুষের ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন দেহ, এবড়োখেবড়ো মাংসের স্তূপ, ঝলসে যাওয়া চামড়া এবং ছাই হয়ে যাওয়া নাগরিক জীবনের সব আয়োজন।
রাজধানী ওসাকা থেকে ২৮০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত হিরোশিমা জাপানের মূলদ্বীপ হোনশুর চুগোকু অঞ্চলের সবচেয়ে বড় শহর এবং প্রশাসনিক অঞ্চলের রাজধানী। ‘ওটা’ (Ota) নদীর কূলঘেঁষে সাজানো-গোছানো হিরোশিমা ৬৫৬ বর্গ কিলোমিটার (বর্তমান আয়তন ৯০৫.০৮ বর্গ কিলোমিটার) এলাকা ঘিরে প্রকৃতির আশীর্বাদ নিয়েই যেন পরম মমতায় আগলে রেখেছিল তার প্রায় ৩ লাখ ৪ হাজার বাসিন্দাকে। পারমাণবিক বোমার আঘাতে প্রায় ৭০ হাজার বাসিন্দাকে হারিয়ে এবং দীর্ঘমেয়াদি ক্ষতি পুষিয়ে প্রায় ৯০ হাজার থেকে ১ লাখ ৬৬ হাজার লোকের আত্মাহুতির পর ২০২০ সালে এসে তার জনসংখ্যা দাঁড়ায় ১১ লাখ ৯৯ হাজার ৩৯১ জন। ঐতিহাসিকভাবেই হিরোশিমা অঞ্চলটি ভূ-রাজনৈতিক, সামরিক ও কৌশলগত কারণে গুরুত্বপূর্ণ স্থান দখল করে আছে। ১৫৮৯ সালে একটি ক্যাসল টাউন হিসেবে হিরোশিমা প্রতিষ্ঠিত হলেও ১৮৬৮ সালের মধ্যেই এটি অন্যতম বৃহৎ নগর কেন্দ্রে পরিণত হয়। জাপানি সম্রাটের শাসনকালে হিরোশিমা সামরিক কর্মকান্ডের একটি প্রাণকেন্দ্র হিসেবে প্রতিষ্ঠা লাভ করে। পরে প্রথম চীন-জাপান যুদ্ধ (১৮৯৪-৯৫) এবং রুশ-জাপান যুদ্ধেও (১৯০৪-১৯০৫) গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে পোড় খাওয়া হিরোশিমা। শুধু তা-ই নয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় হিরোশিমা শহর ‘সেকেন্ড জেনারেল আর্মি’ এবং ‘চুগোকু আঞ্চলিক আর্মি’র সদর দপ্তর ছিল। এ সময় শহরটি সামরিক সরঞ্জাম সরবরাহ এবং শিপিংয়ের গুরুত্বপূর্ণ ডিপো হিসেবে ব্যবহৃত হতো।
হিরোশিমার বুকে আছড়ে পড়া মানববিধ্বংসী পারমাণবিক বোমাটি ছিল যুক্তরাষ্ট্রের ম্যানহাটন প্রজেক্টের একটি পরীক্ষামূলক ও সফল প্রয়োগ। যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ফ্রাঙ্কলিন ডি রুজভেল্টের সময়ে ‘লিটল বয়’ তৈরির প্রাথমিক কাজ শুরু হলেও বোমা হামলার নির্দেশটি দেন পরবর্তী প্রেসিডেন্ট হ্যারি ট্রুম্যান। যুক্তরাষ্ট্রের সেনাবাহিনীর বোয়িং বি-২৯ সুপারফোরট্রেস ‘ইনোলা গে’ নামক বোমা বহনকারী বিমানের পাইলট ছিলেন কর্নেল পল ওয়ারফিল্ড টিবেটস জুনিয়র। ৯৭০০ পাউন্ড বা ৪৪০০ কেজি ওজনের বোমাটি লম্বায় ছিল ১২০ ইঞ্চি (৩ মিটার), যার ব্যাসরেখা ছিল ২৮ ইঞ্চি (৭১০ মিমি)। প্রতি বর্গ মিটারে ৩৫ টন বিস্ফোরণ ক্ষমতাসম্পন্ন এবং ইউরেনিয়াম-২৩৫ পরমাণু ব্যবহার করে নির্মিত বোমাটি হিরোশিমাকে ধ্বংস্তূপে পরিণত করতে সময় নেয় মাত্র কয়েক সেকেন্ড। ১৩ কিলোটন ট্রাইনাইট্রো টলুইনের (টিএনটি) সমতুল্য বিস্ফোরণ মাত্রার লিটল বয়ের ভয়ংকরী সে কয়েক সেকেন্ডের মাশুল হিরোশিমাকে দিতে হয়েছে কয়েক দশক ধরে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা তিন প্রভাবশালী দেশ জার্মানি, ইতালি ও জাপান ছিল অক্ষশক্তির প্রধান কেন্দ্রবিন্দু। ১৯৪৩ সালের ৮ সেপ্টেম্বর মুসোলিনি ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার মাধ্যমে ইতালির আত্মসমর্পণ ঘটে মিত্রশক্তির কাছে। এর প্রায় দেড় বছর পর অর্থাৎ ১৯৪৫ সালের ২৫ মে হিটলারের রহস্যময় আত্মহত্যার মাধ্যমে জার্মানিও অবনত হয় মিত্রশক্তির ক্ষমতার কাছে। কিন্তু জাপান তখনো প্রবল বিক্রমে মিত্রশক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ চালিয়ে যাচ্ছিল। ২৬ জুলাই মিত্রশক্তি জাপানকে সর্বশেষ হুঁশিয়ার করে, কিন্তু জাপান যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়ার সিদ্ধান্তে অটল থাকে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট হিরোশিমায় এবং ৯ আগস্ট নাগাসাকিতে বোমা হামলা চালিয়ে সমাপ্তি ঘটানো হয় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন দগ্ধ সময়ের। হামলায় হিরোশিমার সব সম্পদ যেন ছাইয়ে মিলিয়ে গেল নিমিষেই, যার কোনো হিসাব-নিকাশই নেই। তবে এটুকু হিসাব করা হয়েছে, হামলায় ৭০ ভাগ দালানকোঠা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়েছে আর ৭ ভাগ টিকে ছিল জরাজীর্ণ কঙ্কাল কাঠামোতে ব্যবহার অযোগ্য হিসেবে। রাস্তাঘাট, সেতু-কালভার্ট, বৃক্ষ, লতা, পশুপাখির এত পরিমাণ ক্ষয়ক্ষতি হয় যে, এর কোনো হিসাব-নিকাশই করেনি হিরোশিমার হৃদয়ভাঙা মানুষরা।
হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমার আঘাত ও দুই শহরের মানুষের বিভীষিকাময় জীবন নিয়ে তৈরি হয়েছে অসংখ্য সিনেমা, উপন্যাস, গল্প ও কবিতা। বোমা হামলার বৈধতা-অবৈধতা ছাপিয়ে হিরোশিমা-নাগাসাকির গল্প বিশ্ববাসীর মনে আঁচড় কেটেছে। এ ঘটনা নিয়ে অসংখ্য সিনেমা তৈরি হলেও জাপানি ভাষায় তৈরি ৫টি সিনেমা যুগ যুগ ধরে তাড়িত করেছে মানবতাবাদী মানুষের আবেগকে। ১৯৫২ সালে যুদ্ধ-পরবর্তী হিরোশিমার পরিস্থিতি নিয়ে নির্মিত সিনেমা ‘চিলড্রেন অব হিরোশিমা’, পারমাণবিক হামলার ৭ বছর পর অর্থাৎ ১৯৫৩ সালে বোমা হামলার বাস্তবসম্মত চিত্রায়ণে নির্মিত ‘হিরোশিমা’, ১৯৬৫ সালে দানবের অমর হৃদয় থেকে জন্ম নেওয়া বুনো ছেলের কাহিনী অবলম্বনে নির্মিত ‘ফ্রাঙ্কেনস্টাইন কনকোয়ার্স দ্য ওয়ার্ল্ড’, ১৯৮৯ সালে হিরোশিমায় বোমা হামলা-পরবর্তী পরিস্থিতি নিয়ে মাসুজি আইবুসের উপন্যাস অবলম্বনে ‘ব্ল্যাক রেইন’ এবং ১৯৯৯ সালে নাগাসাকি শহরের হামলার দিনকে উপজীব্য করে নির্মিত ‘এনএন-৮৯১১০২’ সিনেমাগুলো যুদ্ধহীন শান্তির পৃথিবী গড়ার তাড়নায় নাড়া দিয়ে যায়। এ ছাড়া জাপানি কবি সানকিচি তোগে, হারা তামাকি, ফরাসি ঔপন্যাসিক মার্গারেট ডুরাসের কবিতা উপন্যাসেও ফুটে উঠেছে হিরোশিমার তরতাজা স্মৃতি, যা বিশ্বসাহিত্যে হিরোশিমার জন্য সূচনা করে নতুন এক আবেগী উপাখ্যানের।
হিরোশিমাবাসী শুধু পারমাণবিক বোমার আঘাতেই ক্ষত-বিক্ষত হয়নি। মাস ব্যবধানেই ১৯৪৫ সালের ১৭ সেপ্টেম্বর প্রলয়ংকরী টাইফুন ঝড় মাকুরাজাকিতে (Makurazaki) বিধ্বস্ত হয় হিরোশিমা। টাইফুনের প্রভাবে সমগ্র অঞ্চল ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, প্রায় ৩ হাজারের বেশি লোকের মৃত্যু এবং মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি আহত হয়ে বেঁচে থাকার লড়াইয়ে এক অসম প্রতিযোগিতায় নামে হিরোশিমা, যে প্রতিযোগিতায় সে টিকে যায়। যদিও বোমার আঘাত সহ্য করে টিকে থাকা অর্ধেকের বেশি সেতু ভেঙে পড়ে, রাস্তাঘাট প্রচন্ডভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়, রেললাইন উপড়ে গিয়ে রেল যোগাযোগ বন্ধ হয়ে যায়। এর পরও হিরোশিমা টিকে থাকে এবং নানামুখী কর্মকান্ডের মাধ্যমে আবারও মাথা উঁচু করে দাঁড়ায় জাপানি নেতৃত্ব ও মানুষের অদম্য সাহসিকতায়।
পারমাণবিক হামলা ও টাইফুন মাকুরাজাকির ধ্বংসযজ্ঞের পর হিরোশিমা পুনর্গঠনের জন্য ১৯৪৯ সালে জাপানের জাতীয় পার্লামেন্ট হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল সিটি কনস্ট্রাকশন আইন পাস করে। একই সঙ্গে পার্লামেন্টে হিরোশিমাকে ‘সিটি অব পিস’ হিসেবে ঘোষণা করে, যার মাধ্যমে শহরটি ব্যাপকহারে আন্তর্জাতিক মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করে। ধীরে ধীরে হিরোশিমায় গড়ে ওঠে হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল পার্ক, হিরোশিমা প্রিফেকচুয়াল ইন্ডাস্ট্রিয়াল প্রমোশন হল, হিরোশিমা পিস মেমোরিয়াল মিউজিয়াম, পিস প্যাগোডা, হিরোশিমা বিশ্ববিদ্যালয়, হিরোশিমা পিস ইনস্টিটিউটসহ বিশ্বশান্তি ও পারমাণবিক নিরস্ত্রীকরণের বুদ্ধিবৃত্তিক সূতিকাগারের মতো নানা প্রতিষ্ঠান। এরই ধারাবাহিকতায় বারাক ওবামা ২০১৬ সালের ২৭ মে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কোনো প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী হিরোশিমা পরিদর্শনে যান এবং দ্বিতীয় বিশ্ব যুদ্ধে ক্ষতিগ্রস্ত হিরোশিমার বিভিন্ন স্মৃতিচিহ্ন পরিদর্শন করেন। এভাবেই শত প্রতিকূল পরিবেশ পেরিয়ে বিশ^শান্তির দূত হয়ে আপন মহিমায় হিরোশিমা টিকে আছে ঘাত-প্রতিঘাতের সাক্ষী হয়ে।
১৯৪৫ সালের ৬ আগস্ট ও ৯ আগস্ট হিরোশিমা-নাগাসাকিতে বোমা হামলার পর সমগ্র পৃথিবীর বিবেকবান মানুষই দাঁড়িয়েছে নির্মমতার বিরুদ্ধে, তাই জাপানের শহর দুটো আর জাপানের একান্তই নিজের থাকেনি, হয়ে ওঠে বিশ্ব শান্তিকামী মানুষের আপন শহর। এ দুটি শহরের বিভীষিকাময় দৃশ্যপটের করুণ আর্তনাদে মানসচিত্তে যেমন দুঃখের মেঘ জমা হয়েছে, তেমনি তাদের ঘুরে দাঁড়ানোর প্রত্যয় এবং উন্নয়নের স্রোতোধারায় হাসি ছড়িয়েছে সেসব মানবতাবাদী মানুষের মনের গহিনে।
হিরোশিমা-নাগাসাকি একদিক থেকে সমগ্র বিশ্বের মানুষকে নিয়ে এসেছে একই পতাকাতলে, যেখানে সবাই স্বপ্ন দেখে পারমাণবিক গবেষণা শুধু মানুষের কল্যাণের জন্য ব্যবহৃত হবে কোনো যুদ্ধের উপকরণ হিসেবে নয়, নয় কোনো মৃত্যুর দূত হিসেবে। তাই তো ১৯৪৫ সালের পর থেকে অদ্যাবধি বিশ্বের পারমাণবিক ক্ষমতাধর আটটি দেশের কেউই আর নতুন করে এ মারণাস্ত্র ব্যবহারের চিন্তা করেনি।
যুদ্ধবিধ্বস্ত হিরোশিমা আর আজকের শান্তির পতাকাবাহী হিরোশিমা যেন দুই ভুবনের দুই প্রতিচ্ছবি। মহাদানব লিটল বয়ের তেজস্ক্রিয়তার প্রভাব এখনো ভেসে বেড়ায় হিরোশিমার প্রকৃতিতে। হিরোশিমার মানুষ হয়তো যুদ্ধের বিপর্যয় কাটিয়ে উঠেছে কিন্তু তাদের মানসচিত্তে সে বিভীষিকাময় দৃশ্য আজীবন তাড়িত করবে দান্তের ডিভাইন কমেডির নরকের বর্ণনার মতো। মুহূর্তের আগুনে ছাই হয়ে যাওয়া পুরো শহর, হাজার আলোর ঝলকানিতে পুড়ে নিঃশেষ হয়ে যাওয়া রক্ত-মাংসের শরীরের বেদনা আজ হিরোশিমাকে বিশ্বশান্তির দূত হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে। বিশ্বের সব মানবতাবাদী মানুষ যেভাবে বর্জন করেছে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারকে, সেভাবেই গ্রহণ করেছে হিরোশিমার উত্থানকে। হিরোশিমার আজকের দিনের শিল্পায়ন, শিক্ষা, বুদ্ধিবৃত্তিক আন্দোলন, সমাজব্যবস্থা, যোগাযোগ ও উন্নত জীবনযাপন সে দুঃসহ স্মৃতি ভুলিয়ে স্বস্তির সুবাতাস জোগায়। গত ৬ আগস্ট পালিত হওয়া হিরোশিমা দিবসের স্মৃতিকে নিয়ে বিশ্বশান্তির দূত হিরোশিমাকে হৃদয়ের অতল গভীর থেকে জানাই ভালোবাসা এবং নতুনভাবে এগিয়ে যাওয়ার শুভ কামনা।
লেখক সামরিক বাহিনীতে কর্মরত