স্বপ্নের অগ্রযাত্রায় বঙ্গবন্ধুর বাংলাদেশ

বর্তমান প্রেক্ষাপট বিবেচনায় নিলে দেখা যাবে, এক যুগ আগের বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশের মধ্যে বিরাট ব্যবধান। সাধারণ মানুষের জীবনমানের উন্নয়ন ঘটেছে। ক্রয়ক্ষমতা বেড়েছে সর্বস্তরের মানুষের। দেশের পরিবহন ও যোগাযোগ খাতে হয়েছে প্রভূত উন্নয়ন। ২০০৯ সালে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতা গ্রহণের পর থেকে যে উন্নয়নের ধারা সূচিত হয়েছে এ দেশে, বর্তমান মেয়াদে সেই ধারা হয়েছে আরও বেগবান। বিশ্বজুড়ে বাংলাদেশ পরিচিত হয়েছে উন্নয়নের এক নতুন মাইলফলক হিসেবে। মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি ও জীবনযাত্রার মান উন্নয়নসহ সবার মৌলিক অধিকার প্রতিষ্ঠার লড়াইয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাংলাদেশ আজ বিশ্বজুড়ে আলোচিত।

আজকের বাংলাদেশের এই উন্নয়নের ভিত্তি গড়ে দিয়েছিলেন স্বয়ং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তানের চব্বিশ বছরের শোষণ এবং মুক্তিযুদ্ধকালীন পাকিস্তানি হানাদারদের নৃশংসতায় ধ্বংসপ্রাপ্ত অকাঠামো ও অর্থনীতির ওপর দাঁড়িয়ে জাতির পিতা যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ পুনর্গঠনে সর্বশক্তি নিয়োগ করেছিলেন। মাত্র সাড়ে তিন বছরের মধ্যে তিনি বাংলাদেশকে বিশ্বসভায় মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত করেন। কিন্তু ১৯৭৫ সালের ১৫ই আগস্ট জাতির পিতাকে সপরিবারে হত্যার পর বাংলাদেশের অগ্রগতি থেমে যায়। পঁচাত্তর-পরবর্তী সরকারগুলোর জনবিচ্ছিন্নতা, লুটপাট ও উন্নয়নদর্শনবিহীন রাষ্ট্র পরিচালনা বাংলাদেশকে একটি মর্যাদাহীন রাষ্ট্রে পরিণত করেছিল। বহির্বিশ্বে বাংলাদেশ পরিচিতি পেয়েছিল ঝড়, জলোচ্ছ্বাস এবং ভিক্ষুক-দরিদ্র-হাড্ডিসার মানুষের দেশ হিসেবে। তার বিপরীতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও উন্নয়নবান্ধব শাসননীতির ফলে সেই বাংলাদেশই আজ ‘মোস্ট এমার্জিং ইকোনমি অফ দ্য ওয়ার্ল্ড’ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে।

শুধু তাই নয়, মানুষের সব ধরনের মৌলিক চাহিদাগুলো আজ পূরণের পথে। তাছাড়াও জাতীয় উৎপাদন, মাথাপিছু আয়, খাদ্য উৎপাদন, কৃষি উৎপাদন, আমদানি-রপ্তানি বাণিজ্য, বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন, বিদ্যুৎ, যোগাযোগ ব্যবস্থা, অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবকাঠামো তৈরি প্রতিটি ক্ষেত্রেই বাংলাদেশ অবিশ্বাস্য পরিমাণে উন্নতি লাভ করেছে। এক হিসেবে দেখা যায়, করোনার বৈশ্বিক থাবায় ২০১৯-২০ ও ২০২০-২১ অর্থবছরে প্রাথমিক হিসেবে বাংলাদেশের ১ হাজার ৭ শত কোটি মার্কিন ডলার ক্ষতি হয়েছে। আমরা দেখতে পাই এই মহামারীর মধ্যেও শেখ হাসিনার যুগোপযোগী অর্থনৈতিক কলাকৌশল ও দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নের গতি স্তব্ধ না হয়ে সামনের দিকেই অগ্রসরমান।

২০২০ সালের পরিসংখ্যান অনুসারে বর্তমানে বাংলাদেশ বিশ্বের ৪১তম অর্থনীতির দেশ। বর্তমান বিশ্বের অর্থনৈতিকভাবে দ্রুত বিকাশমান ৫টি দেশের একটি দেশ বাংলাদেশ। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আগামী ২০৩৫ সালে বাংলাদেশ হবে বিশ্বের ২৫তম অর্থনীতির দেশ। একটা সময় ছিল আমাদের এই বাংলাদেশ বিশ্বের অন্যতম স্বল্পোন্নত, দরিদ্র ও একটি পরনির্ভরশীল দেশ। অন্যের সাহায্য ও সহযোগিতা ছাড়া মোটেই চলতে পারত না। বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি, জাতীয় বাজেট, বিভিন্ন ধরনের প্রকল্প প্রণয়ন ও তা বাস্তবায়নের জন্য প্যারিসের কনসোর্টিয়াম বৈঠকের সাহায্য ও প্রতিশ্রুতির পরিমাণের দিকে তীর্থের কাকের মতো চেয়ে থাকতে হতো। বিশ্ববাসীর কাছে পরিচয় ছিল বাংলাদেশ একটি বন্যা, খরা, প্রাকৃতিক দুর্যোগের দেশ। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের তৎকালীন পররাষ্ট্রমন্ত্রী কিসিঞ্জারের মতে বাংলাদেশ ছিল একটি তলাবিহীন ঝুড়ি। অনেকের ধারণা ছিল যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশ হয়তো আর কোনোদিন নিজেদের পায়ে ভর করে মাথা তুলে দাঁড়াতেই পারবে না। আস্তে আস্তে একদিন অকার্যকর রাষ্ট্রে পরিণত হয়ে পৃথিবীর রাজনৈতিক মানচিত্র থেকে বিলুপ্ত হয়ে যাবে। কিন্তু বঙ্গবন্ধুর স্বপ্নের বাংলাদেশ আজ সেসব ধারণাকে মিথ্যা প্রমাণ করেছে।

বাংলাদেশ আজ কোনো প্রকার বৈদেশিক সাহায্য ছাড়াই বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ সেতু পদ্মা সেতু নিজেদের অর্থের মাধ্যমেই তৈরি করতে পারে। বাংলাদেশ আজ তার বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি ও জাতীয় বাজেট বাস্তবায়নের জন্য ৭০ শতাংশ অর্থই অভ্যন্তরীণ সম্পদ থেকে সংগ্রহ করতে পারে। বাংলাদেশ আজ বিভিন্ন সূচকে ভারত ও পাকিস্তানকেও ছাড়িয়ে দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম তেজি ঘোড়া হিসেবে টগবগ করে বিরামহীনভাবে তার গন্তব্যের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। বিশ্বব্যাপী ক্ষুধা ও দারিদ্র্য দূরীকরণে নিয়োজিত জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থা (এফএও) এর কাউন্সিলের সদস্যও নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ। ২০২১ সালের ১৭ জুন ১৮৩টি সদস্য রাষ্ট্রের প্রতিনিধিদের অংশগ্রহণে সংস্থাটির ৪২তম মিটিং-এ ২০২২-২০২৪ সালের জন্য সর্বসম্মতিক্রমে সদস্য নির্বাচিত হয়েছে বাংলাদেশ। তাছাড়া, বাংলাদেশ জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক পরিষদ (ইকোসক) এর ৩টি অঙ্গ সংস্থা সিএনডি, ইউনিসেফ ও ইউএন উইমেনেরও সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। এই তিনটি সংস্থাতেই বাংলাদেশ ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে কাজ শুরু করেছে।

সুতরাং আমরা দেখতে পাই যে, আমাদের সফল প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনার সফল ও গতিশীল নেতৃত্বে বাংলাদেশ আজ বহির্বিশ্বে বিভিন্ন মর্যাদাশীল আসনে অধিষ্ঠিত রয়েছে। আমরা আশা করি তার দূরদর্শী নেতৃত্ব ও সফল আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক তৎপরতার ফলে বাংলাদেশ আগামীতে আরও মর্যাদাশীল আসনে অধিষ্ঠিত হবে। কোনো কোনো দেশ আজ বাংলাদেশের উন্নয়নের কৌশল গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। হয়তো বা আগামীতে তারা শেখ হাসিনার এই উন্নয়ন কৌশলকে তাদের দেশেও প্রয়োগ করতে পারে। উন্নয়নে শেখ হাসিনার দক্ষ হাতের ছোঁয়ায় ও নেতৃত্বে বাংলাদেশ কেবল অভ্যন্তরীণভাবেই এগিয়ে যাচ্ছে না, বহির্বিশ্বেও আজ বাংলাদেশের সুনাম ছড়িয়ে পড়েছে এবং বাংলাদেশ আন্তর্জাতিকভাবে অনেক মর্যাদার আসনে অবস্থান করছে।

আন্তর্জাতিক সম্পর্ক ও কূটনীতির ক্ষেত্রে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাংলাদেশকে এক নতুন উচ্চতায় নিয়ে গেছেন। তার চাক্ষুস প্রমাণ আমরা পেয়েছি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও আমাদের মহান স্বাধীনতার সুবর্ণ জয়ন্তী পালন অনুষ্ঠানে। তার আন্তর্জাতিক সুখ্যাতি ও সফল কূটনৈতিক তৎপরতার ফলেই করোনা মহামারীর মধ্যেও অনেক রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধান ঐ অনুষ্ঠানগুলোতে সশরীরে উপস্থিত হয়েছেন এবং অনেকেই ভিডিও বার্তা পাঠিয়ে বাংলাদেশ ও দেশের মানুষকে সম্মানিত করেছেন। তার সফল নেতৃত্ব ও আন্তর্জাতিক সুখ্যাতির ফলেই তিনি উন্নত দেশগুলোর সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ভ্যাকসিন যুদ্ধের মধ্যেও জয়ী হয়েছেন।

এমনকি কমনওয়েলথভুক্ত দেশগুলোর মধ্যে কভিড-১৯ মহামারী মোকাবিলায় সফলভাবে নেতৃত্ব দেওয়ার জন্য তিনি বিশে^র শীর্ষ অনুপ্রেরণাদায়ী নেতার মধ্যে অন্যতম একজন নির্বাচিত হয়েছেন। বাংলাদেশ আজ বিশ্বের বিভিন্ন সংস্থায় নেতৃত্ব দিচ্ছে। বিগত ২০২০ সালের ১৪ সেপ্টেম্বর জাতিসংঘের অর্থনৈতিক ও সামাজিক কাউন্সিল (ইকোসক) এর ৮টি অঙ্গ সংস্থার নির্বাচনে ৫৪টি ভোটের মধ্যে ৫৩টি ভোট পেয়ে বাংলাদেশ ঐ সংস্থার ইউএনডিপি, ইউএনএফপিএ ও ইউএনওপিএসের নির্বাহী বোর্ডের সদস্য নির্বাচিত হয়েছে। বাংলাদেশ এই বোর্ডে ২০২১-২০২৩ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করছে। এছাড়া বাংলাদেশ আইওসি রিজিওনাল কমিটি ফর দ্য সেন্ট্রাল ইন্ডিয়ান ওশান (আইওসিইন্ডিও) এর চেয়াররপাসন নির্বাচিত হয়েছে। বাংলাদেশ ১৯ সদস্য বিশিষ্ট এই সংস্থার মে ২০২১ থেকে মে ২০২৩ মেয়াদে দায়িত্ব পালন করবে। উন্নয়নশীল ৮ মুসলিমপ্রধান দেশের সমন্বয়ে গঠিত ডি-৮ এর বর্তমান সভাপতির দায়িত্বও পালন করছেন আমাদের প্রধানমন্ত্রী জননেত্রী শেখ হাসিনা। দুই বছর তিনি এই পদে বহাল থাকবেন। তাছাড়া আগামী সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদের সম্মেলনে সহ-সভাপতির দায়িত্বও পালন করবে বাংলাদেশ।

বাংলাদেশ প্রথমবারের মতো মহাকাশে বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ উৎক্ষেপণ করেছে। পাবনার রূপপুরে ২৪০০ মেগাওয়াটের পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রের নির্মাণকাজ এগিয়ে চলেছে। এছাড়াও ভারতের সঙ্গে স্থল সীমানা চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ছিটমহল সমস্যার সমাধান করা হয়েছে। মিয়ানমার ও ভারতের সঙ্গে সমুদ্রসীমানার বিরোধ মীমাংসার ফলে বঙ্গোপসাগরের বিশাল জলরাশির ওপর সার্বভৌম অধিকার প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। খুলে গিয়েছে নীল-অর্থনীতির দ্বার। জলবায়ু পরিবর্তনের ফলে সৃষ্ট ঘাত-প্রতিঘাত মোকাবিলা করে কাক্সিক্ষত উন্নয়ন অর্জনের জন্য ‘বাংলাদেশ বদ্বীপ পরিকল্পনা- ২১০০’ নামে শতবর্ষের একটি পরিকল্পনা প্রণয়ন করেছে। সপ্তম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনার সঙ্গে এসডিজির লক্ষ্যমাত্রাগুলো সম্পৃক্ত করে তা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনা প্রণয়নের কাজও শুরু হয়েছে। একসময় প্রবল ক্ষুধা ও দারিদ্র্যের চাপে পিষ্ট হতে থাকা বাংলাদেশের অর্থনীতি আজ মজবুত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ছোটখাটো অভিঘাত এই অগ্রগতির পথে বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারবে না। অর্থনৈতিক অগ্রগতির সূচকে বিশ্বের শীর্ষ ৫টি দেশের একটি এখন বাংলাদেশ। তবে এখানেই থেমে থাকলে হবে না। এই উন্নয়নের অগ্রগতির ধারাকে অব্যাহত রাখতে সবার সম্মিলিত প্রচেষ্টা খুবই জরুরি। বাংলাদেশের এ অগ্রযাত্রা আজ বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত ও প্রশংসিত। সামগ্রিক বিচারে এ কথা নিঃসংকোচে বলা যায়, বাংলাদেশ আজ উন্নয়নের মহাসড়কে দোর্দণ্ড প্রতাপে এগিয়ে চলেছে সামনের দিকে।

লেখক গবেষক ও কলামিস্ট 

raihan567@yahoo.com