দেশের রাজনৈতিক দলগুলো তাদের নির্বাচনী ইশতেহার বাস্তবায়নে উদাসীন। তারা নির্বাচনের আগে নানা ধরনের প্রতিশ্রুতি দিয়ে থাকে কিন্তু সেসব ইশতেহার বাস্তবায়ন হতে খুবই কম দেখা যায়। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বর্তমান সরকার কর্মসংস্থানবিষয়ক ৪৬টি প্রতিশ্রুতি দিলেও বাস্তবায়ন হয়েছে মাত্র ২৪টি। গতকাল রবিবার রাজধানীতে সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগ (সিপিডি) আয়োজিত দিনব্যাপী সংলাপে এই বক্তব্য এসেছে।
রাজধানীর একটি হোটেলে ‘জাতীয় উন্নয়নে অঙ্গীকার : শিক্ষা, মানসম্মত কর্মসংস্থান, জেন্ডার সমতা’ শীর্ষক এই সংলাপ আয়োজনে সহযোগিতা করে জাতিসংঘ ডেমোক্রেসি ফান্ড (ইউএনডিইএফ)। সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুনের সভাপতিত্বে উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান।
সিপিডি বলছে, যদিও নির্বাচনী ইশতেহারের আইনি কোনো কাঠামো নেই। তবে তারপরও এটিতে মূল্যায়ন ও জবাবদিহি থাকা দরকার। তবে বর্তমান সরকার ২০১৮ সালে যে নির্বাচনী ইশতেহার দিয়েছিল তার মধ্যে শিক্ষা, মানসম্মত কর্মসংস্থান, জেন্ডার সমতার প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়নে অনেকখানি পিছিয়ে আছে বলে মনে করেন রাজনৈতিক বিশ্লেষক ও খাতসংশ্লিষ্টরা।
নাগরিক এ সংলাপের মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করে সিপিডির গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, ‘বাংলাদেশের প্রতিটি রাজনৈতিক দল নির্বাচনের আগে ইশতেহার ঘোষণা করে থাকে। কেননা রাজনৈতিক দলগুলো মূলত ইশতেহার দিয়েই ভোট সংগ্রহ করে থাকে। সেজন্য এটিকে অবশ্যই আইনি ভিত্তি দেওয়া প্রয়োজন।’ তিনি আরও বলেন, ২০১৮ সালে একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ‘সমৃদ্ধির অগ্রযাত্রায় বাংলাদেশ’ শিরোনামে একটি ইশতেহার প্রকাশ করেছিল। সেখানে চারটি মাইলফলক নির্ধারণ করা হয়। সেগুলো হলোÑ ২০২১ সালের আগেই মধ্য আয়ের দেশে উন্নীত হওয়া, ২০৩০ সালের মধ্যে ‘টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা-এসডিজি বাস্তবায়ন’ অর্জন, ২০৪১ সাল নাগাদ উন্নত দেশের মর্যাদা লাভ ও ‘ব-দ্বীপ পরিকল্পনা’ তথা ডেল্টা প্ল্যান-২১০০ বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়া। এ ছাড়া ৩৩টি খাতে জোর দিয়েছিল দলটি। কিন্তু দেখা গেল তারা যে ইশতেহার দিয়েছিল তার মধ্যে শিক্ষা, কর্মসংস্থান ও জেন্ডার সমতা বিষয়ে অনেক ক্ষেত্রেই পিছিয়ে আছে।
সিপিডির গবেষণায় আরও এসেছে, দক্ষতা উন্নয়ন ও কর্মসংস্থান সৃষ্টির জন্য বর্তমান সরকারের ‘কর্মঠ প্রকল্প’ ও ‘সুদক্ষ প্রকল্প’ নামের দুটি নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি থাকলেও পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন, পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) মূল্যায়ন প্রতিবেদন অনুযায়ী এ প্রকল্পের জন্য কোনো অর্থ বরাদ্দ দেওয়া হয়নি।
এ সময় বিশেষ অতিথির বক্তব্যে স্থানীয় সরকার বিশেষজ্ঞ ড. তোফায়েল আহমেদ বলেন, ইশতেহার নিয়ে এক বছর আগে থেকে আলোচনা করতে হবে। নির্বাচনের আগে তা নির্ধারণ হবে। নির্বাচনী ইশতেহারের লক্ষ্য হওয়া উচিত জনগণের কল্যাণ। দেশে যদি সত্যিকারের নির্বাচন হতো তাহলে দলগুলো তাদের ইশতেহারের দিকে গুরুত্ব দিত।
শোভন কর্মসংস্থানের বিষয়ে ড. তোফায়েল বলেন, ‘কোথায় এখন শোভন কর্মসংস্থান আছে? সরকারি কিছু ক্ষেত্রে শোভন কর্মসংস্থান আছে কিন্তু বেসরকারি খাতে তা নেই বললেই চলে। শিক্ষায়ও আমাদের সংকট প্রকট, বিশেষ করে সরকারি ও বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে।’ সরকারকে ক্রাশ প্রোগ্রাম করে চলমান সংকট দূর করার আহ্বান জানান তিনি।
সিপিডির ট্রাস্টি বোর্ডের সদস্য খুশি কবির বলেন, ‘আজকের এই আলোচনার মাধ্যমে জবাবদিহির একটি সংস্কৃতি শুরু হয়ে গেছে। গণতন্ত্র থাকলে জবাবদিহি করার সুযোগ থাকে। আর গণতন্ত্র থাকলে উন্নয়ন ফিরে আসে।’ তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের প্রশ্ন করার সুযোগ দিতে হবে। জবাব দেওয়ার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে। সর্বোপরি ভিন্নমতকে প্রাধান্য দিতে হবে।’ বাংলাদেশের শিক্ষায় অনেক ঘাটতি রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সদস্য শামীম হায়দার পাটোয়ারী বলেন, আপনারা খোঁজ নিয়ে দেখেন আগেও প্রবাসী শ্রমিকরা যা আয় করে এখনো তাই আয় করছে, কারণ তাদের শ্রমের দক্ষতা বাড়েনি। তিনি আরও বলেন, ‘আমরা দেখছি, সরকারি অনেক দপ্তরে এখনো অনেক অশোভন কর্মসংস্থান বিদ্যমান। তারা দৈনিক মজুরি হিসেবে কাজ করেন। তারা অস্থায়ী হওয়ায় তাদের কোনো ভাতা নেই।’