চা বাগানের রাজকুমার: যুগ যুগ ধরে বঞ্চনার, দাসের এক জীবন

মৌলভীবাজারের একটি চা বাগানে দেখা হয়েছিল রাজকুমারের সঙ্গে। চা বাগানের রাজকুমার।

এই চা বাগানেই জন্ম, বাগানেই বেড়ে ওঠা, বাগানেই সংসার, বাগানই তার দুনিয়া! বাগানের এই চা পাতা খেয়েই তাদের বেঁচে থাকা! তাদের বলতে এই রাজকুমারের পরিবারের মানুষেরা। তাদের মতো মানুষেরা। যারা চা শ্রমিক হিসেবে পরিচিত।

বছর তিনেক আগে এক বিকেলে তার সঙ্গে দেখা হয়েছিল। জানতে চেয়েছিলাম তার নাম, উত্তরে বলেছিলেন- রাজকুমার। ৫০ বছর বয়সী মানুষটির দুর্বল শরীর নিয়ে একটু খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে চলা ক্লান্ত শরীরের একজনের এমন নাম শুনে চমকে উঠেছিলাম। গল্পে গল্পে জানলাম, পূর্বপুরুষের সঙ্গে ভারতের বিহার থেকে তার মাও এসেছিল ভাগ্য অন্বেষণে এই চা বাগানে। এরপর আটকা পড়ে যান চা বাগানের চক্রের ভেতর! যেন চায়ের পেয়ালায় হাবুডুবু খাওয়া এক করুণ পিঁপড়া, যে এসেছিল খাবারের খোঁজে এরপর আর বেঁচে ফিরতে পারেনি এই পেয়ালা থেকে।

রাজকুমারের সেই বৃদ্ধ মা কাঁদেন, যেতে চান তার দেশে ( ভারতে)। সেখানে তার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি, আছে কত স্বজন-প্রিয়জনেরা। কিন্তু ফেরার কোনো পথ নেই তার জন্য!  এসব গল্প বলছিলেন রাজকুমার। যে ছোট টিলার ওপর বসে এই গল্প বলছিলেন সেই টিলার আরেক প্রান্ত দেখিয়ে বললেন- ‘ওখান থেকে ভারতের ত্রিপুরা রাজ্য দেখা যায় মামা। খুব সুন্দর জায়গা’। আমি বললাম কখনো গেছেন। রাজকুমার নাজুক হাসি হেসে বলেন, নাহ।

যে জায়গায় কখনো যায়নি সেই জায়গাটি যে অনেক সুন্দর তা কীভাবে জানলেন তিনি? এই প্রশ্ন আমার ভেতরে জেগেছিল। নিজেই নিজেকে উত্তর দিয়েছি, হয়তো মায়ের মুখে শুনে...। মায়ের মুখে শোনা গল্প কল্পনায় নিশ্চয়ই অনেক সুন্দর!

সেই ‘সুন্দর ত্রিপুরা’ রাজ্যে যাওয়া তো দূরের কথা নিজের শহরের বাইরেই যাননি তিনি। কখনো ঢাকা আসেননি। সিলেট শহরে গিয়েছে হাতেগোনা দু-একবার।

নিজেদের জীবনের গল্প শোনাতে গিয়ে রাজকুমার বলেছিলেন, পরিবারে বৃদ্ধ মা, দুই মেয়ে আর স্ত্রী রয়েছে। মালিক (বাগান কর্তৃপক্ষ) তাকে দয়া করে বাগান দেখাশোনার কাজ দিয়েছে। সপ্তাহে ৪০০ টাকা পান বেতন! এটাই তাদের বাড়তি আয়! তার স্ত্রী এ বাগানের শ্রমিক। দিনে মজুরি পান ১০২ টাকা। (তার দেওয়া তথ্য অনুসারে, সাল ২০১৯)। এ টাকা দিয়েই তাদের সংসার চলে। রাজকুমার বলেন, একটা মহিলা দিনে ৮ ঘণ্টা ডিউটি করে ২৩ কেজি চা-পাতা তুললে ১০২ টাকা হাজিরা পায়। একজন একা ২৩ কেজি তুলতে পারে না সব সময়।

রেশন যা পান আর যে বেতন পান সব মিলিয়ে এ বাজারে তারা কেমন আছেন তার একটি নমুনা দেওয়া যাক রাজকুমারের গল্প থেকে।

রাজকুমার বলেন ‘রমজান মাসে ছোট একটা মাছ এনেছিলাম। সেই খাওয়া, আর ভাগ (ভাগ্যে) হয়নি।’ । তিনি যখন এ  কথা বলেছিলেন সেই সময় থেকে সম্ভবত ১০/১১ মাস আগে রমজান মাস ছিল। অর্থাৎ প্রায় এক বছর আগে তারা শেষ মাছ খেয়েছেন। শাক-সবজি কেনার পয়সাও হয় না। বেশির ভাগ দিন চা পাতা ভর্তা করে ভাত খান। এই চা পাতা ভর্তা দিয়েই রুটি খান। সেই গল্প বলতে গিয়ে রাজকুমার এক চিলতে হাসি দিয়ে বলেছিলেন, ‘মামা চা পাতা খুব টেস (টেস্ট)’।

১৮৩০ এর দশকে ইংরেজরা ভারতবর্ষের এই মানুষগুলোর সঙ্গে নির্মম প্রতারণা করেছিল। অতি লাভের জন্য তারা কম দামে শ্রমিক সংগ্রহ করেছিল মিথ্যা কথা বলে। ‘গাছ নাড়লে টাকা মিলবে’ এমন কথা বলে আজীবন কাজের শর্তে চুক্তিবদ্ধ করে ভারতের বিহার, মাদ্রাজ, উত্তর প্রদেশ, ওডিশা প্রভৃতি অঞ্চল থেকে কানু, তেলেগু, লোহার, রবিদাস, গোয়ালাসহ প্রায় ১১৬টি আদিবাসী জনগোষ্ঠীকে চা বাগানের শ্রমিক হিসেবে সংগ্রহ করে নিয়ে আসে। একরকম দাস বানিয়ে চা বাগানের জীবন চক্রে সেই শ্রমিকরা আটকে ফেলছে।

এরপর থেকেই যুগ যুগ ধরে বঞ্চনার, দাসের জীবন তার পার করে দিচ্ছে। রাজকুমার এই বঞ্চিতদেরই বংশধর যারা ৮ ফুট বাই ১২ ফুট মাপের একটি ঘরে প্রজন্মের পর প্রজন্ম বাস করে আসছে। রাজকুমারের মা, যার নামটি জানা হয়নি, সেই বৃদ্ধার কথা ভাবছিলাম, যার মাতৃভাষা ছিল ভোজপুরি, সেই ভাষায় এখন কথা বলার মানুষ তার আশপাশে খুব একটা নেই। নতুন প্রজন্মের ছেলে-মেয়েরা সেই ভাষায় কথা বলে না, গান গায় না।

এক সময় নিজের ভাষায় গান, সংস্কৃতির চর্চা হতো। এখন সেসব কিছু নেই। এসব কথা বলতে বলতে রাজকুমার একটা ভোজপুরি গান শুনিয়ে ছিলেন ত্রিপুরা রাজ্যের দিকে তাকিয়ে। যে দিকে আছে তার মায়ের মুল্লুক, যেখানে ফেরার জন্য মায়ের খুব আকুতি আছে। কিন্তু তার মায়ের আর কখনো ফেরা হবে না সেই মুল্লুকে যে মুল্লুক তিনি ছেড়ে এসেছিলেন জীবিকার ফাঁদে পড়ে। কিন্তু  সেই জীবিকা, তার সেই জীবন তাকে পৌঁছে দিয়েছে এই জীবনের কাছে যে জীবনের গল্প শুনিয়েছিলেন এক করুণ রাজকুমার...। যে জীবন এই করুণ রাজকুমারের জীবন... চা পাতা ভর্তা খাওয়া জীবন..।  যার বিনিময়ে আমরা পাই- এক কাপ চা পরম তৃষ্ণা আহা...।

আবদুল্লাহ মাহফুজ অভি: তথ্যচিত্র নির্মাতা।