জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সপরিবারে হত্যা করা হয় ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট। ইতিহাসের জঘন্যতম এ হত্যাকান্ডের পরের বিভিন্ন ঘটনা নানা প্রশ্নের জন্ম দেয়।
বিনা প্রতিরোধে খুনিচক্রের মিশন সফল হওয়া, ইনডেমনিটি অধ্যাদেশ জারি, খুনিদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেওয়া, বিভিন্ন দূতাবাসে চাকরি দিয়ে পুনর্বাসিত করা প্রতিটি পদক্ষেপই ছিল প্রশ্নবিদ্ধ।
প্রশ্নবিদ্ধ একটি ঘটনা সম্পর্কে আজও পরিষ্কার হওয়া যায়নি; স্পষ্ট কোনো ধারণা পাওয়া যায়নি। ঘটনাটি হলো, বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পরে ১৬ অক্টোবর খুনি মোশতাকের ডাকে ১৯৭৩ সালের সংসদের (পার্লামেন্টের) সদস্যদের বঙ্গভবনে উপস্থিত হওয়া।
বঙ্গবন্ধুর বদান্যতায় সংসদ সদস্য হয়ে তার অবর্তমানে কেন সেদিন বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধুর সহকর্মীরা? মোশতাকের ডাকে কেন তারা সাড়া দিয়েছিলেন?
এমন প্রশ্নে ’৭৩ সালের পার্লামেন্টের যারা সদস্য ছিলেন তাদের এখনো বিব্রত হতে হয়। সেদিন মোশতাকের ডাকে সাড়া দিয়ে বঙ্গভবনে যাওয়ার কারণ ব্যাখ্যা করেছেন ওই পার্লামেন্টের সদস্যরা।
’৭৩ সালের সংসদ সদস্যরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যার প্রতিবাদ জানাতে, হত্যার বিচার চাইতে ও মোশতাককে অবৈধ রাষ্ট্রপতি আখ্যা দিতেই সেদিন বঙ্গভবনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল।’ তারা এমনটাই দাবি করেছেন।
’৭৩-এর সংসদ সদস্যরা জানান, ‘বঙ্গভবনে যাওয়ার আগে নাখালপাড়ার এমপি হোস্টেলে বসে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় বঙ্গভবনে যাওয়ার, প্রতিবাদ করার ব্যাপারে।’ কোনো সংসদ সদস্য অবশ্য স্বীকার করেছেন, ‘ভয়কে জয় করতে পারেননি বলে মোশতাকের ডাকে সাড়া দিয়ে বঙ্গভবনে গিয়েছিলেন তারা। অজানা আতঙ্ক ঘিরে রেখেছিল তাদের, তাই সেদিন বঙ্গভবনে যেতে হয়েছিল। আবার প্রতিবাদের সিদ্ধান্ত নিয়ে গেলেও বঙ্গভবনে খুনিচক্রের সরব উপস্থিতিতে প্রতিবাদের ভাষা জোরালো হয়ে ওঠেনি তাদের।’
বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে কেন মোশতাকের ডাকে সাড়া দিতে হলো, ১৬ অক্টোবর বঙ্গভবনে যাওয়ার মূল কারণ কী? জানতে চাইলে ১৯৭৩ সালের পার্লামেন্টের সদস্য ব্যারিস্টার আমীর-উল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ওইদিন মোশতাকের ডাকে সাড়া দিয়েছি দাওয়াত খেতে বা তার আতিথেয়তা গ্রহণ করতে ব্যাপারটা একেবারেই তা নয়। ওইদিন বঙ্গভবনে গিয়েছি মোশতাককে ‘কনডেম্ড’ করতে। গিয়েছি তার কাছে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার চাইতে।’
‘মোশতাক যে অবৈধ রাষ্ট্রপতি একথা জানিয়ে দিতেই মূলত যাওয়া হয়।’ বেশ রেগে গিয়েই তিনি একথা বলেন। পরে তিনি তার ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন বন্ধ করে দেন। ঘণ্টাখানেক আর তার ফোনে সংযোগ পাওয়া যায়নি।
’৭৩-এর পার্লামেন্টের আরেক সদস্য অধ্যাপক আবু সাইয়ীদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পরে ১৬ অক্টোবর মোশতাকের ডাকে বঙ্গভবনে মূলত যাওয়া হয় প্রতিবাদ করার সিদ্ধান্ত নিয়ে।’ তার দাবি, সেটা হয়েও ছিল। কুমিল্লার তৎকালীন এমপি সিরাজুল হক (বর্তমান আইনমন্ত্রীর বাবা) মোশতাককে অবৈধ রাষ্ট্রপতি উল্লেখ করেন। সংবিধান লঙ্ঘন করে মোশতাক রাষ্ট্রপতি হয়েছেন তাই তাকে মানেন না বলে চিৎকার করে বলেন তিনি, বঙ্গভবনে।’ তার এ প্রতিবাদের সঙ্গে যুক্ত হন শামসুল হক চৌধুরী ও মোহাম্মদ ময়েজুদ্দিন সাহেব। এরপর খুনির দল তাদের ওপর চড়াও হয়, অস্ত্র উঁচিয়ে ধরে। তখন জেনারেল ওসমানী পরিবেশ শান্ত করেন।
তিনি দাবি করেন, ‘তখন নাখালপাড়ায় ছিল এমপি হোস্টেল। মোশতাক যখন বঙ্গভবনে সবাইকে ডাকেন তখন আমরা বেশকিছু সংসদ সদস্য নাখালপাড়ায় বসি। সেখানে আব্দুল করিম ব্যাপারি, হাসান আলী, সরদার আমজাদ হোসেন, হায়দার আলী, আবু সালেহ ও ইউসুফ আলীসহ বেশ কয়েকজন বসি। প্রথমে বঙ্গবন্ধু ও তার পরিবারের সদস্যদের আত্মার মাগফেরাত কামনা করে দোয়া অনুষ্ঠিত হয়।’
অধ্যাপক সাইয়ীদ বলেন, ‘সরদার আমজাদ বলেন, মোশতাকের মিটিংয়ে যাওয়া যাবে না। তাহলে তাকে বৈধতা দেওয়া হবে। অবশ্য পরে সিদ্ধান্ত নিই যে, আমরা বঙ্গভবনে যাব। কয়েকটা দাবি তুলে ধরব।’
’৭৩ সালের পার্লামেন্টের এ সদস্য আরও বলেন, ‘সেখানে গিয়ে হত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করব, হত্যার বিচার চাইব এবং মোশতাক যে অবৈধভাবে রাষ্ট্রপতি পদ দখল করেছেন সেটা তুলে ধরব। কারণ সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতির অবর্তমানে সংসদের স্পিকার হবেন রাষ্ট্রপতি।’
পৃথিবীর ইতিহাসে জঘন্যতম, নারকীয় এক হত্যাকান্ডের পরে স্বঘোষিত রাষ্ট্রপতি খন্দকার মোশতাক আহমদ ১৬ অক্টোবর জাতীয় সংসদের (তৎকালীন) অধিবেশন আহ্বান করেন বঙ্গভবনে। সে ডাকে বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক সহচররা, সংসদ সদস্যরা বঙ্গভবনে যাবেন কিনা দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগেন।
শেষ পর্যন্ত ’৭৩ সালের সংসদে নির্বাচিত অধিকাংশ সদস্য সাড়া দিলেন মোশতাকের ডাকে। তারা গেলেন বঙ্গভবনে। এ নিয়ে এখনো সমালোচনা সইতে হয় সে পার্লামেন্টের অধিকাংশ সদস্যকে। কেউ কেউ এখনো আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে আছেন। অনেকে নিষ্ক্রিয় হয়ে, একঘরে হয়ে আছেন।
ওই সংসদের সদস্য প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘ভয় ও শঙ্কা থেকেই ওইদিন বঙ্গভবনে গিয়েছি। আমাদের সবাইকে অজানা আতঙ্ক তাড়া করে বেড়াচ্ছিল। ওইদিন বঙ্গভবনে যাওয়ার আর কোনো কারণ ছিল না।’ তিনি বলেন, প্রতিবাদ হয়েছে সেখানেও। বঙ্গভবনের অধিবেশন কক্ষে ঢোকার আগে রেওয়াজ অনুযায়ী যখন ঘোষণা আসে রাষ্ট্রপতি প্রবেশ করছেন তখন চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে কুমিল্লা থেকে নির্বাচিত সংসদ সদস্য সিরাজুল হক চিৎকার করে বলেন, ‘আপনি কে? আপনি বৈধ প্রেসিডেন্ট নন, আপনাকে প্রেসিডেন্ট আমি মানি না।’ তখন ঘাতক কর্নেল ফারুক, রশিদসহ অন্যরা পিস্তল তাক করেন সিরাজুল হকের দিকে। তার সঙ্গে ওইদিন প্রতিবাদ জানান শামসুল হক ও ময়েজুদ্দিন সাহেব।
টাঙ্গাইলের জেলা আওয়ামী লীগের বর্তমান সভাপতি ফজলুর রহমান খান ফারুক। তিনিও ’৭৩ সালের পার্লামেন্টের সদস্য ছিলেন। তার দাবি, ‘খুনি মোশতাকের আহ্বানে ওই দিন সংসদে যাব কি যাব না সে দ্বিধায় ছিলাম। সিনিয়র নেতাদের পরামর্শ গ্রহণ করি। পরে সিদ্ধান্ত নিই, গিয়ে দেখি, পরিবেশ-পরিস্থিতি কোথায় গিয়ে দাঁড়ায়।’ প্রবীণ এ নেতা আরও বলেন, ‘মোশতাকের ডাকে সাড়া দিয়ে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে নির্বাচিত প্রায় সবাই গেলেও সংরক্ষিত নারী আসনের নির্বাচিত সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী যাননি। আমরা ভয়কে উপেক্ষা করতে পারিনি। কিন্তু সাজেদা চৌধুরী না গিয়ে সাহস দেখিয়েছেন; তিনি মোশতাকের ডাকে বঙ্গভবনে যাননি।’
ফারুক বলেন, ’৭৩ সালের ওই সংসদে আওয়ামী লীগের নৌকা প্রতীক নিয়ে নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের অনেকেই বঙ্গভবনে ওই অধিবেশনে মোশতাকের পক্ষ নিয়ে কথা বলেছেন। তিনি জানান, তাদের মধ্যে প্রয়াত মিজান চৌধুরী, নূর-এ আলম সিদ্দিকী ও রফিক ভুঁইয়া ছিলেন।
অধ্যাপক আবু সাইয়ীদ বলেন, ‘রফিক ভুঁইয়া আমাদের সঙ্গেও ছিলেন, মোশতাকের সঙ্গেও হাত মিলিয়েছেন।’ তার দাবি, ‘বঙ্গভবনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত সবাই মিলে গ্রহণ করলেও তিনি এবং আরও কয়েকজন নেতা ওইদিন বঙ্গভবনে প্রবেশ করেননি।’
ফারুক দাবি করেন, ‘বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পরবর্তী পরিস্থিতিতে অনেক কিছুই করার ছিল, কিন্তু করা হয়নি। জাতির জনকের অনুপস্থিতিতে সবাই শক্তি ও সাহস হারিয়ে ফেলেছিলেন। বলা চলে, ভয়ে-শঙ্কায় খুনি মোশতাকের কাছে আমরা পরাজিত হয়েছি।’
অধ্যাপক আবু সাইয়ীদ বলেন, ‘বঙ্গভবনে যাওয়ার পর সিরাজুল হকসহ কয়েকজনের প্রতিবাদই মূলত মোশতাকের মসনদ নড়বড়ে করে তোলে। ওইদিন প্রকৃত অর্থেই আইনি ও সাংবিধানিক পদ্ধতি অনুসরণ করে বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারের হত্যার প্রতিবাদ করা হয়েছিল। এ প্রতিবাদের ফলেই মোশতাকের বিদায় অত্যাসন্ন হয়ে ওঠে।’
এ প্রসঙ্গে ফজলুর রহমান ফারুক বলেন, ‘ওইদিন বঙ্গভবনের পরিবেশ সবাইকে সাহস ও শক্তিহারা করে তোলে। ওইদিন বঙ্গভবনে না গেলে পরিণতি কী হতে পারত সে দুর্ভাবনা থেকে অনেকে গিয়েছেন। আবার অনেকে গেছেন বঙ্গবন্ধুর অনুপস্থিতিতে কী করা যেতে পারে তার পরিকল্পনা গ্রহণ করতে। বঙ্গবন্ধুর অবর্তমানে আমরা এতই নেতৃত্বশূন্য হয়ে পড়ি যে, কোনটি সঠিক সিদ্ধান্ত বুঝে উঠতে পারিনি।’
ওই সংসদের আরেক সদস্য অ্যাডভোকেট ইউসুফ হোসেন হুমায়ুন বলেন, ‘ভয়কে জয় করতে পারিনি বলেই ওইদিন বঙ্গভবনে যেতে হয়েছে সবাইকে।’
বঙ্গবন্ধু হত্যাকান্ডের পরে খুনি মোশতাক খুনিদের পাহারায় বঙ্গভবনেই থাকতেন। নিজ নিরাপত্তার কথা আমলে নিয়ে সংসদ সদস্যদের নিয়ে প্রথম মিটিং ডাকেন তিনি বঙ্গভবনে। বৈঠক চলে সাত ঘণ্টা। দুপুরে ভোজেরও আয়োজন ছিল। বৈঠকে সিরাজুল হক মোশতাককে চ্যালেঞ্জ করার পর কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়নি।