বঙ্গবন্ধু সেই মহান নেতা যিনি জন্মগ্রহণ না করলে আমরা স্বাধীন বাংলাদেশ পেতাম কিনা জানি না। পাকিস্তান আন্দোলন, ৪৮-৫২ সালের ভাষা আন্দোলন, ১৯৬৬ সালের ৬ দফা ও ১৯৬৯ সালে ছাত্র জনতার ১১ দফা আন্দোলন, ১৯৭০ সালে বাঙালির মুক্তির নির্বাচনের আন্দোলন, ১৯৭১ সালে ২৬ মার্চের স্বাধীনতা ঘোষণার মাধ্যমে হয়ে ওঠা একটি নাম বঙ্গবন্ধু। এই নামেই নয় মাস মুক্তিসংগ্রাম ও স্বাধীনতার সংগ্রাম পরিচালিত হয়।
আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধে অংশ নিয়েছিলাম আমাদের কাছে বঙ্গবন্ধুর নামই প্রেরণা জুগিয়েছে। যুদ্ধ করে লাখ লাখ লোক জীবন দিয়েছে ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’ বলে। সেই মহান নেতাকে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট হত্যা করে কিছু বিপথগামী বাঙালি সামরিক বাহিনীর সদস্য। যে কাজ ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে পাকিস্তানিরা করতে সাহস পায়নি, সেই অঘটনই ঘটাল কিছু বাঙালি সেনা সদস্য!
বঙ্গবন্ধু জীবনে একবার যাকে দেখেছেন বা নাম জেনেছেন তাকে আর দ্বিতীয়বার নাম বলতে হয়নি। বঙ্গবন্ধু তাকে তার নাম ধরে ডেকেছেন। এই মহান নেতার সঙ্গে আমার প্রথম ও শেষ দেখা হওয়ার ঘটনা দুটি বেশ উল্লেখযোগ্য। প্রথমটি ব্যক্তিগত কারণে এবং শেষ দেখা হওয়াটা ১৫ আগস্টের প্রেক্ষাপটে বিশেষভাবে স্মরণযোগ্য হয়ে উঠেছে।
১৯৬৪ সালে পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট নির্বাচন। মুসলিম লীগের প্রার্থী প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ আইয়ুব খান আর আওয়ামী লীগসহ কমবাইন্ড অপজিশন পার্টির (কপ) প্রার্থী মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ্র একমাত্র বোন ফাতেমা জিন্নাহ্। আইয়ুব খানের মার্কা গোলাপ ফুল, আর ফাতেমা জিন্নাহ্র মার্কা হারিকেন। ফেনী কপের আহ্বায়ক মহকুমা আওয়ামী লীগের সভাপতি খাজা আহমদ, আমি কপের দপ্তর সম্পাদক। নির্বাচনের খরচ বহনের জন্য কপ ফাতেমার ছবি দিয়ে ২ হাজার ৫১০ টাকার কুপন ছাপল। সেই কুপন আনার জন্য শেখ মুজিবুর রহমানের কাছে চিঠি দিয়ে খাজা আহমদ আমাকে ঢাকা পাঠালেন। তখন আওয়ামী লীগের অফিস ছিল ঢাকার ১৫ পুরানা পল্টন।
খাজা আহমদের চিঠি নিয়ে রাতে ঢাকা মেইলে গেলাম, ফুলবাড়িয়া স্টেশনে সকালে নামলাম, বেলা ১১টার দিকে ১৫ পুরানা পল্টন গেলাম। বঙ্গবন্ধুর হাতে চিঠি দিলাম। বঙ্গবন্ধু ১৫ পুরানা পল্টনে পশ্চিম দিকের রুমে বসতেন। পূর্ব দিকে বসতেন কেন্দ্রীয় আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক মোহাম্মদ উল্ল্যা (পরে তিনি দেশের রাষ্ট্রপতি); মাঝখানে বসতেন তাজউদ্দীন আহমদসহ পূর্ব পাকিস্তান আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় নেতারা।
যে নেতার নামে রাজনীতি করি তার সঙ্গে আমার প্রথম সাক্ষাৎ, বুঝতেই পারছেন আমার মনের অবস্থা। দেখা হলো, কুপন সংগ্রহ করলাম। বঙ্গবন্ধু ফেনীর রাজনৈতিক কর্মকা- নিয়ে জিজ্ঞাসা করলেন আর বললেন আমার নেতা কেমন আছে অর্থাৎ খাজা আহমদের কথা জিজ্ঞাসা করলেন। বঙ্গবন্ধু কখনো খাজা আহমদকে নাম ধরে ডাকতেন না। সব সময় নেতা বা ফেনীর নেতা বলতেন। আমাকেও আদর করলেন। আসার সময় আমার মায়ের জন্য কিছু কিনতে এক হাজার টাকা দিলেন। ওই টাকা দিয়ে মায়ের জন্য দুটো শাড়ি কিনলাম। মা মহাখুশি হয়ে বঙ্গবন্ধুর জন্য দোয়া করলেন।
আমার জীবনে প্রথম মায়ের জন্য শাড়ি কিনলাম বঙ্গবন্ধুর টাকায়। তখন আমি ফেনী মহকুমা দৈনিক ইত্তেফাকের প্রতিনিধি ও খাজা আহমদ সম্পাদিত সাপ্তাহিক ‘আমার দেশ’ পত্রিকায় কর্মরত। খাজা আহমদের দুটি সাপ্তাহিক ছিল। একটি সাপ্তাহিক ‘সংগ্রাম’ ও অপরটি সাপ্তাহিক ‘আমার দেশ’। এ দুটি পত্রিকা বন্ধ হওয়ার পর জামায়াতে ইসলামী ‘দৈনিক সংগ্রাম’ প্রকাশ করে আর বিএনপি প্রকাশ করে ‘দৈনিক আমার দেশ’। এছাড়া, স্বাধীনতার পর ফেনী থেকে সাপ্তাহিক ‘মতবাদ’ প্রকাশ করি আমার সম্পাদনায় মুজিববাদ প্রচারের জন্য।
১৯৭৫ সালে খাজা আহমদ ফেনীর গভর্নর হন। খাজা সাহেবের নেতৃত্বে আমরা ১৪ আগস্ট সন্ধ্যায় গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে চাই। আমাদের সঙ্গে ছিলেন আবদুল মালেক, এম.এস হুদা, নুরুল হুদা, আবদুর রহমান বি.কম, সুজাত আলী, আবদুল হক মোটবী ও ইউনুছ চৌধুরী। বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে রাত ৮টায় বের হই। বঙ্গবন্ধু ওই সময় কালো মার্সিডিজ নিয়ে গণভবন ত্যাগ করেন। বঙ্গবন্ধু যাওয়ার সময় গণভবনের গাছগুলো ঝড়ো হাওয়ায় মাথা নত করে তাকে চিরতরে বিদায় দিল! এই হলো বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে আমার শেষ দেখা। পরে ভোর রাত ১৫ আগস্ট বঙ্গবন্ধুকে সপরিবারে হত্যা করা হয়।
আজ প্রজন্মকে অনুরোধ করব বঙ্গবন্ধুকে জানো, বাংলাদেশকে জানো, মুক্তিযুদ্ধকে জানো, তাহলে তোমাদের কেউ আর ‘স্বাধীনতাবিরোধী হিসেবে’ চিহ্নিত করতে পারবে না। যারা মুক্তিযুদ্ধ দেখেছেন, তাদের কাছে বিশেষভাবে অনুরোধ আপনার সন্তানদের সঠিক কথাটি বলে যান, যাতে ইতিহাস বিকৃত না হয়। কারণ আপনি জীবিত থাকা অবস্থায় যে কথাটি বলবেন আপনার সন্তানরা সেটি বিশ^াস করবেন। ‘জয় বাংলা’, ‘জয় বঙ্গবন্ধু’।
লেখক : মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক সম্পাদক, ফেনী জেলা আওয়ামী লীগ; উপদেষ্টা সম্পাদক, দৈনিক স্টারলাইন