২ মিনিটের কাজ ৭ ঘণ্টায়

পাসপোর্টের ছবি, চোখের মণির প্রতিচ্ছবি এবং ফিঙ্গারপ্রিন্টের জন্য সীমাহীন দুর্ভোগ পোহাচ্ছে পাসপোর্টপ্রত্যাশীরা। সকালের নরম আলোতে একজন পাসপোর্ট অফিসে ঢুকলে সূর্য ডুবে যাবে, কিন্তু এই কাজ তিনটি শেষ হবে না। অথচ দুই মিনিটের এ কাজটুকু হয় একই টেবিলে, একই ব্যক্তির হাতে।

দৃশ্যত দালালমুক্ত হলেও পাসপোর্ট অফিসের প্রায় সব কাজেই আছে দালালের আধিপত্য। সাধারণ মানুষ যে সেবার জন্য দিনের পর দিন ঘুরে বেড়াচ্ছে, দালাল সেই কাজ কয়েক ঘণ্টায়ই করে দিচ্ছে। গতকাল মঙ্গলবার আগারগাঁও পাসপোর্ট অফিস ঘুরে এ চিত্র পাওয়া গেছে।

বেলা ১১টায় পাসপোর্ট অফিসে ঢুকতেই চোখে পড়ে কয়েকশ মানুষ সারিবদ্ধভাবে পাসপোর্ট করাতে গিয়েছেন। তারা একটি টিনশেডের নিচে সারিবদ্ধভাবে অপেক্ষা করছেন। তাদের মাথার ওপর ফুল স্পিডে ফ্যান ঘুরলেও ভাদ্রের গরমে তা অপর্যাপ্ত। প্রায় ৪৫ মিনিট সেখানে লাইনে দাঁড়িয়ে থাকার পর ১০ জন করে গ্রাহককে ডেকে নেওয়া হয় মূল ভবনের কোনায়। সেখানে মূলত দেখা হয় গ্রাহকরা তারিখ অনুযায়ী উপস্থিত হয়েছেন কি না। তখন পাসপোর্টের আবেদন করলে নির্দিষ্ট দিনের নির্দিষ্ট সময়ে যাওয়ার জন্য অনুরোধ জানিয়ে বার্তা দেওয়া হয়। একটি ডেস্কের দুই কোনায় দুজন বসে ত্বরিত তারিখ দেখেন। তারিখের মিল না থাকলেও সমস্যা নেই। দালালের অদৃশ্য ইশারায় তারাও ঢুকে পড়ছেন মূল ভবনে।

মূল ভবনের নিচতলায় ১০২, ১০৩ ও ১০৬ নম্বর কাউন্টার। এ তিনটি কাউন্টারের সামনে প্রায় ৮০০ বর্গফুট জায়গা। এ জায়গাটুকুতে গায়ে গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে ছিলেন প্রায় ৩০০ সেবাপ্রত্যাশী। এক ঘণ্টা ঠায় দাঁড়িয়ে থাকার পর ধপাস করে মেঝেতে বসে পড়লেন ষাটোর্ধ্ব মকবুল আহমদ। লাইনের পেছন থেকে আর্তনাদ ভেসে এলো, ‘আহা রে, বুড়োটা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।’ তার কিছুক্ষণ পর যিনি আর্তনাদ করে উঠলেন তাকেও দেখা গেল মেঝেতে পা মুড়িয়ে বসে পড়েছেন। দুপুর দেড়টায় দেখা যায় ওই রুমের প্রায় সবাই বসে পড়েছেন। যারা দাঁড়িয়ে ছিলেন তারাও অস্থায়ী রেলিং বা পিলারে ঠেস দিয়ে দাঁড়িয়ে রয়েছেন।

পুরো রুমে নামমাত্র একটা এসি বসানো। রুমের ছাদে ঘুরছিল পাঁচটি পাখা। এই রুমের কাউন্টারগুলো থেকে পাসপোর্টের আবেদন যাচাই-বাছাইয়ের পর পাঠানো হয় ১০২ নম্বর কাউন্টারে। সেখান থেকে সিরিয়াল নম্বর দিয়ে পাঠানো হয় ৫০৫ নম্বর রুমে।

বেলা ৩টার দিকে ৫০৫ নম্বর রুমের সামনে গিয়ে দেখা যায় বিশাল লাইন। ষষ্ঠতলার পুরোটা জুড়ে লাইন ধরে দাঁড়িয়ে আছেন সেবাপ্রত্যাশীরা। এ ফ্লোরেই রয়েছে ৫০৩ নম্বর রুম। ষষ্ঠতলার ৫০৩ নম্বর ফ্লোরের সেবাপ্রত্যাশীরা সাপের মতো পেঁচিয়ে সিঁড়ি বেড়ে অষ্টমতলা পর্যন্ত পৌঁছে গেছেন। ৫০৫ নম্বর রুমের সামনে কয়েকটি ফ্যান থাকলেও সিঁড়ির মধ্যে ফ্যানের কোনো সুযোগ না থাকায় গ্রাহকরা গরমে কাবু হয়েছেন। ৫০৫ ও ৫০৩ নম্বর রুমের সামনে কিছুক্ষণ পরপরই হইচই শুরু হয়। কেউ লাইন ভেঙে সেখানে ঢুকে পড়ার চেষ্টা করলেই পেছন থেকে চিৎকার-চেঁচামেচি শুরু হয়।

বেলা ১১টায় যারা পাসপোর্ট অফিসে ঢুকেছেন তারা সন্ধ্যা ৬টা ৫ মিনিটে কাজ শেষে বের হয়েছেন।

৫০৫ নম্বর কক্ষে গিয়ে দেখা যায় চারজন কর্মকর্তা পাসপোর্টপ্রত্যাশীদের ছবি, ফিঙ্গারপ্রিন্ট, চোখের মণির প্রতিচ্ছবি নিচ্ছেন। একজন কর্মকর্তা সব কাজই করছেন মাত্র দুই থেকে তিন মিনিট সময়ের মধ্যে। একই টেবিল থেকে দুই-তিন মিনিটে এসব কাজ শেষ হলে সেবাপ্রত্যাশীদের এত ভোগান্তি কেন জানতে চাইলে এক কর্মকর্তা বলেন, প্রায়ই সার্ভার ডাউন থাকে। সার্ভার ডাউন থাকার কারণেই দুপুর ১২টা থেকে দেড়টা পর্যন্ত কাজ বন্ধ ছিল। এই দেড় ঘণ্টার রেশ সারা দিনের কাজে পড়েছে।

গতকাল পাসপোর্ট করাতে গিয়েছিলেন লেনিন ঘোষ। তিনি তার অসুস্থ বাবাকে নিয়ে ভারতের চেন্নাই যেতে চান। কিন্তু পাসপোর্টের মেয়াদ ছয় মাসের কম থাকায় তিনি নতুন করে পাসপোর্ট করতে দিয়েছেন। তার ১ নভেম্বর তারিখে পাসপোর্টের জন্য ছবি, ফিঙ্গারপ্রিন্ট ও চোখের মণির প্রতিচ্ছবি নেওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আগেই তার পাসপোর্ট দরকার। এ কারণে দালালকে টাকা দিয়ে নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই এসব কাজ শেষ করেছেন।

পঞ্চাশোর্ধ্ব আদিল হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা তো পাসপোর্টের জন্য সরকারকে কম টাকা দিই না। তাহলে সরকার কেন আমাদের একটু বসার ব্যবস্থা করতে পারে না। আমরা তো খুব বেশি কিছু চাই না। সকাল ৯টা বাজার সঙ্গে সঙ্গে পাসেপোর্ট অফিসে ঢুকে সন্ধ্যা ৬টায় বের হচ্ছি। এই অফিসের ভেতরে একটু পানি খাওয়ারও ব্যবস্থা নেই। একটা সরকারি অফিস করার আগে সবকিছুই তো বিবেচনা করতে হয়।’

গতকাল পাসপোর্ট করাতে আগারগাঁও গিয়েছিলেন গাজীপুরের কালীগঞ্জের সুমন মিয়া। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কত রেমিট্যান্স এনে দিই সরকারকে। অথচ সরকার আমাদের একটু বসার ব্যবস্থা করে সম্মান দেখাতে পারে না।’

এসব অভিযোগ জানাতে গতকাল রাতে যোগাযোগ করা হলে ইমিগ্রেশন ও পাসপোর্ট অধিদপ্তর মহাপরিচালক মেজর জেনারেল মোহাম্মদ আইয়ূব চৌধুরী দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘পাসপোর্ট যারা নিতে আসেন তাদের আমরা আরও ভালো সেবা দিতে চাই। কিন্তু আমাদের কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে অনেক সময় সেটা সম্ভব হয় না। সার্ভার ডাউন হওয়ার তথ্য আমার কাছে নেই। চেক করে দেখতে হবে। আগারগাঁওয়ে দিনে মাত্র এক হাজার লোককে সেবা দেওয়ার সুযোগ আছে। কিন্তু সেবা নিতে আসে প্রায় পাঁচ হাজার লোক। আমি সংশ্লিষ্টদের বসার জন্য চেয়ার দেওয়ার চেষ্টা করেছিলাম। কিন্তু ভবনগুলো এমনভাবে করা হয়েছে যে সেবাগ্রহীতাদের চেয়ার দেওয়ার জায়গা নেই।’

এক প্রশ্নের জবাবে মহাপরিচালক বলেন, ‘দেশের অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি হয়েছে। কভিডের দুই বছর মানুষ পাসপোর্ট করতে পারেনি। সেই চাপ এখন এসে পড়েছে। অনেক মানুষ পাসপোর্ট চায়। আমি চেয়েছি স্টেডিয়ামের মতো বড় বড় জায়গা। ছোট জায়গায় সেটা সম্ভব হচ্ছে না। সুপার এক্সপ্রেসের টাকা জমা দিলে দিনে দিনেই সেবা পাওয়া যায়।’

তিনি আরও বলেন, ‘সারা দেশে প্রতিদিন ২০ থেকে ৩০ হাজার পাসপোর্টে ইস্যু হয়। সমপরিমাণ পাসপোর্ট এনরোলমেন্ট হয়। তাহলে গড়ে ২০ হাজার ধরলেও ৪০ হাজার পাসপোর্টের কাজ হয়। এ পাসপোর্টের জন্য ৮০ হাজার লোক পাসপোর্ট অফিসে যায়। অথচ আমার জনবল মাত্র ১ হাজার ১০০ জন। আগে চার-পাঁচটি অফিস থেকে পাসপোর্ট দেওয়া হতো। এখন সেটা সব জেলায় সম্প্রসারণ করা হয়েছে। ৬৪ জেলার ৬৯টি অফিস থেকে পাসপোর্ট দেওয়া হচ্ছে। ঢাকায় এখন আগারগাঁও ছাড়া উত্তরা ও যাত্রাবাড়ী আঞ্চলিক অফিস থেকে পাসপোর্ট দেওয়া হয়। শিগগিরই আমরা ঢাকায় আরও দুটি অফিস স্থাপন করব। ঢাকার পূর্বাচলে এবং পশ্চিমে বছিলার দিকে আমরা অফিস খুলছি। এগুলো চালু হলে চাপ কিছুটা কমবে।’

পাসপোর্ট অফিসের জনবল সংকটের কথা জানিয়েছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাও। বর্তমানে ১ হাজার ১০০ লোক কাজ করলেও দেড় বছর আগে আরও জনবল বাড়ানোর জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে চিঠি দেওয়া হয়। কিন্তু তাতে কোনো সাড়া দেয়নি সরকার।