ব্রিটিশ শাসন থেকে ভারতের স্বাধীনতা লাভের ৭৫ বছর হলো। ১৫ আগস্ট পর্যন্ত কিছুদিন ধরে অনেক আড়ম্বর এবং ঘটনা ঘটেছে। ভারত সরকার ১২ মার্চ ২০২১ তারিখে ‘আজাদি কা অমৃত মহোৎসব’ কর্মসূচি চালু করে। তখন থেকে ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসের ৭৫ সপ্তাহের ক্ষণগণনা শুরু হয়। এই উদ্যোগের উদ্দেশ্য ছিল স্বাধীনতা সংগ্রামের স্মৃতিচারণ, দেশকে গড়ে তোলা ধারণা, কাজ ও অর্জনগুলো উদযাপন এবং ২০৪৭ সালের পথে অভিযাত্রায় দেশকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্যগুলোর অঙ্গীকারকে শক্তিশালী করা। ২০৪৭ সালেই ভারতের স্বাধীনতার শতবর্ষ হবে। তবে ভারতের ‘রিপোর্ট কার্ড’-এর ওপর ভালো করে একটু নজর করলে দেখা যাবে বিভিন্ন ক্ষেত্রেই সমস্যা রয়েছে। প্রায়শই যেমন হয়, মোদি সরকার একটি সফল বিপণন প্রচারাভিযান চালিয়েছে। তা অনেক নাগরিকের মনও কেড়েছে। কিন্তু ৭৫ বছরপূর্তিতে আসলে ভারতের উদযাপন করার মতো খুব বেশি কিছু নেই।
সংকটে অর্থনীতি : ভারতের অর্থনীতি সংকটের মধ্যে রয়েছে। কভিড মহামারী শুরু হওয়ার অনেক আগে থেকেই তা সংকটে। বস্তুত, প্রথম কভিড লকডাউনের প্রাক্কালেই ভারতের মোট দেশজ উৎপাদন (জিডিপি) প্রবৃদ্ধি ছিল ১৯৭৫-৭৬ সাল থেকে সর্বনিম্ন। রপ্তানি ও বিনিয়োগের প্রবণতাও ছিল নিম্নমুখী। অন্যান্য দেশের মতোই মহামারীর সময় ভারতীয় অর্থনীতি তীব্র মন্দার শিকার হয়েছিল। জিডিপি প্রবৃদ্ধি ২৩.৯ হ্রাস পায়। ২০২০-২১ সালে জিডিপি সংকুচিত হয় ৭.৩ শতাংশ। মন্দার প্রভাব সবচেয়ে বেশি অনুভব করেছে দরিদ্রতমরা। ২০২১ সালে পিউ রিসার্চ সেন্টারের একটি সমীক্ষায় দেখা গেছে, মহামারীজনিত মন্দার কারণে ভারতে দিনে ২ ডলার বা তার কম আয় দিয়ে চলা মানুষের সংখ্যা সাড়ে ৭ কোটি বেড়েছে। এটি বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্য বৃদ্ধির ৬০ শতাংশ। সমীক্ষায় আরও দেখা যায়, ভারতীয় মধ্যবিত্তের আকার ২০২০ সালে ৩ কোটি ২০ লাখ কমেছে। এ সংখ্যাও বিশ্বব্যাপী মধ্যবিত্ত শ্রেণি থেকে পিছিয়ে পড়ার ৬০ শতাংশ। বর্তমানে ভারতের অর্থনীতি দৃশ্যত কিছুটা উন্নতির দিকে। তা সত্ত্বেও, ইউক্রেনে রাশিয়ার আগ্রাসনের কারণে বিশ্বব্যাপী জ্বালানি এবং খাদ্যের মূল্যবৃদ্ধি মহামারী-পরবর্তী অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারকে উল্লেখযোগ্য চাপে ফেলেছে। খাদ্যের মূল্যস্ফীতি ইতিমধ্যেই দরিদ্র ও মধ্যবিত্তের সংসারের বাজেটকে কুরে কুরে খাচ্ছে। ২০২২ সালের জুনে বেকারত্বের হার ছিল ৭.৮ শতাংশ। মে থেকে তা ০.৭ শতাংশ বেড়েছে। ২০-২৪ বছর বয়সীদের মধ্যে বেকারত্বের হার ছিল ৪৩.৭ শতাংশ। এছাড়া ডলারের বিপরীতে ভারতীয় রুপি মূল্য হারাচ্ছে যা আমদানিনির্ভর খাতে ক্ষতিকর প্রভাব ফেলবে।
ত্রুটিপূর্ণ নীতিনির্ধারণ : জাতীয় নীতি প্রণয়নও সুশাসনের প্রমাণ দিচ্ছে না। মহামারীর সময় তা আরও স্পষ্ট ছিল। চীনে করোনাভাইরাস প্রথম শনাক্ত হওয়ার পরপরই ভারতকে কভিড প্রাদুর্ভাবের উচ্চ ঝুঁকির দেশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছিল। তবে সরকারের প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের গতি ছিল ধীর। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (ডব্লিউএইচও) ২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি কভিড প্রাদুর্ভাবকে বৈশ্বিক জনস্বাস্থ্য বিষয়ক জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেছিল। তবে মহামারী সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির প্রথম বিবৃতিটি আসতে (একটি টুইট) ৩ মার্চ পর্যন্ত লেগে যায়। এর পর ভারতের স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয় ৬ মার্চ তাদের কভিড-১৯ সচেতনতা প্রচারাভিযান শুরু করে। তার আগ পর্যন্ত এ নিয়ে জনস্বাস্থ্য পরামর্শ আসছিল শুধুমাত্র প্রথাগত চিকিৎসা বিষয়ক আয়ুষ মন্ত্রণালয়ের কাছ থেকে। প্রসঙ্গত, আয়ুষ মন্ত্রণালয়ের আওতায় রয়েছে আয়ুর্বেদ, যোগ ও প্রাকৃতিক চিকিৎসা, ইউনানি, সিদ্ধ এবং হোমিওপ্যাথি ইত্যাদি চিকিৎসাপদ্ধতি। কভিড বিষয়ে আয়ুষ-এর পরামর্শগুলোর মধ্যে কিছু আয়ুর্বেদীয় এবং হোমিওপ্যাথিক প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা এবং প্রতিকারের বেশি তেমন কিছুই ছিল না। অবশেষে ২৪ মার্চ মাত্র চার ঘণ্টার নোটিসে দেশব্যাপী লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছিল। বিশ্বের বৃহত্তম লকডাউনটি যেভাবে কার্যকর করা হয়েছিল তা দুর্বল শাসন এবং ভুল রাজনৈতিক অগ্রাধিকারের জাজ্বল্যমান প্রমাণ। চার ঘণ্টার নোটিসের উদ্দেশ্য ছিল বৈশ্বিক সংকটের মুখে দৃঢ় নেতৃত্ব দেখানো। তবে লকডাউন চলাকালীন অত্যাবশ্যকীয় পণ্য পাওয়ার সুযোগ সম্পর্কে প্রায় কোনো তথ্য না পেয়ে আতঙ্কিত নাগরিকরা লকডাউন চালুর ঠিক আগে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র মজুদ করতে দোকানে ছুটে যায়। সংক্রমণ ঠেকাতে দেওয়া সামাজিক দূরত্বের নির্দেশনার ধার ধারেনি তারা।
লকডাউন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সরকার বিষয়টি দরিদ্র, বিশেষ করে অনানুষ্ঠানিক এবং অভিবাসী শ্রমিকদের ওপর যে প্রভাব ফেলতে পারে তা বিবেচনা করতে ব্যর্থ হয়েছে। অথচ এরা ভারতের বড় শহরগুলোর অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। ব্যবসা বন্ধ হয়ে যাওয়ায় লাখ লাখ লোক বেকার হয়ে পড়ে। গ্রামে ফিরে যাওয়ার জন্য পরিবহনের কোনো উপায় পায়নি তারা। অনেকে শত শত মাইল হেঁটে বাড়ি যায়, যাতে লকডাউন এক মানবিক দুর্যোগে পরিণত হয়। প্রধানমন্ত্রী সবচেয়ে নাজুক মানুষদের ওপর লকডাউনের প্রভাবের জন্য দুঃখপ্রকাশ করে বলেছিলেন, ‘যখন আমি আমার দরিদ্র ভাই ও বোনদের দিকে তাকাই, তখন আমি অবশ্যই অনুভব করি যে তারা নিশ্চয়ই ভাবছে, এ কী ধরনের প্রধানমন্ত্রী যিনি কিনা আমাদের এই অসুবিধার মধ্যে রেখেছেন।... আমি বিশেষ করে তাদের কাছে ক্ষমা চাই।’ প্রধানমন্ত্রী যোগ করেছেন, ‘তবে, করোনাভাইরাস মোকাবিলা করার আর কোনো উপায় ছিল না... এটি জীবন-মরণ যুদ্ধ এবং আমাদের তা জিততে হবে।’
নরেন্দ্র মোদি যখন প্রধানমন্ত্রীর নাগরিক সহায়তা এবং জরুরি পরিস্থিতি ত্রাণ তহবিল স্থাপন করেছিলেন, তখন তার সংক্ষিপ্ত নাম ‘প্রাইম মিনিস্টার কেয়ারস’ রাখা নিছক ঘটনাচক্র ছিল না। ত্রাণ তহবিলটা সত্যিই ছিল দরিদ্রদের সহায়তা করার জন্য। তবে সমালোচকরা এমন একটি তহবিলের প্রয়োজনীয়তা নিয়ে প্রশ্ন তোলেন। কারণ, প্রধানমন্ত্রীর জাতীয় ত্রাণ তহবিলেরই ৫০ কোটি ডলার অব্যবহৃত রয়ে গিয়েছিল। কেউ কেউ যুক্তি দেন তহবিলটি সিএসআর কার্যক্রমের জন্য নির্ধারিত অর্থ সরবরাহ করার জন্য করপোরেট দাতাদের দ্বারা ব্যবহৃত হচ্ছে। করপোরেটরা আইন অনুসারে তাদের নেট লাভের ২ শতাংশ করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার (সিএসআর) জন্য বরাদ্দ করতে বাধ্য। অর্থ মন্ত্রণালয় পিএম কেয়ারস এসব অনুদান করমুক্ত করার জন্য একটি অধ্যাদেশও জারি করে। সরকার এ তহবিল ব্যয় করা সম্পর্কে তথ্য প্রকাশ করতে অনাগ্রহী। অনেকের অনুমান তহবিলটি করপোরেট দাতাদের প্রধানমন্ত্রীর অনুগ্রহ লাভের একটি উপায়।
ইসলামোফোবিয়ার নীতি : ৭৫তম জন্মদিনে ভারতে গণতন্ত্রেরও অবক্ষয় দেখা যাচ্ছে। সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর মানবাধিকার অনবরত আক্রমণের মুখে। ইসলামোফোবিয়া দেশে কার্যত একটি সরকারি নীতিতে পরিণত হয়েছে। বস্তুত গণপিটুনি, ইসলাম সম্পর্কে মিথ্যা আতঙ্ক প্রচার এবং সাংস্কৃতিক ভয় দেখানো ভারতীয় মুসলমানদের জীবনের এক দৈনন্দিন দিক হয়ে উঠেছে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ২০১৯ সালের নাগরিকত্ব সংশোধনী আইনের (সিএএ) কথা। ভারতের সংসদে পাস হওয়া ইসলামোফোবিক আইনটি প্রতিবেশী পাকিস্তান, বাংলাদেশ এবং আফগানিস্তান থেকে আসা অমুসলিম অভিবাসীদের দ্রুত ভারতীয় নাগরিকত্ব দেওয়ার পথ করে দিয়েছে। নাগরিকত্ব পাওয়ার যোগ্যতা হিসেবে ধর্মকে যুক্ত করে এ আইন সাংবিধানিক সমতা ক্ষুণœ করেছে। সরকার এই আইনের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকে নির্মমভাবে দমন করে এবং প্রতিবাদীদের ‘দেশবিরোধী’ আখ্যায়িত করে। কঠোর সন্ত্রাসবিরোধী আইন ব্যবহার করে সিএএ-বিরোধী কর্মীদের গ্রেপ্তার করা হয়েছিল। তাদের জামিন দিতেও অস্বীকৃতি জানানো হয়। এছাড়াও ২০১৯ সালেই বিজেপি সরকার সংবিধানে মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ রাজ্য কাশ্মীরের জন্য থাকা বিশেষ মর্যাদা প্রত্যাহার করে। এই পদক্ষেপটি কেবল ভারতশাসিত কাশ্মীরকে ভারতের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবে নিশ্চিত করার দীর্ঘদিনের হিন্দু জাতীয়তাবাদী প্রতিশ্রুতিই পূরণ করেনি, এটি রাজ্যটির হিন্দুকরণের একটি নতুন পথও প্রতিষ্ঠা করেছে।
বিরোধিতা দমন : মুসলমান নাগরিকদের ভয়ভীতি প্রদর্শন দমন করার প্রচেষ্টা ছাড়াও সরকার সব ধরনের ভিন্নমতকে নীরব করার জন্য এক ব্যাপক প্রচারে ব্যস্ত। ২০২১ সালে প্রকাশ পায় ইসরায়েলি আড়িপাতার সফটওয়্যার পেগাসাসের কথা। জানা যায়, অন্য অনেক দেশের মতো এটি ভারতেও বিরোধী রাজনীতিবিদ, সাংবাদিক এবং আন্দোলনকর্মীদের ওপর নজরদারি করার জন্য ব্যবহার করা হয়েছিল। নরেন্দ্র মোদি এবং তার সরকার মানবাধিকার সংগঠনগুলোর বিরুদ্ধেও কঠোর অভিযান চালিয়েছে। ২০২০ সালে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের দপ্তরে অভিযানের পর তাদের ব্যাংক হিসাব বন্ধ করে দেওয়া হয়। প্রতিষ্ঠানটি ভারতে তাদের কার্যক্রম বন্ধ করতে বাধ্য হয়েছিল। মোদি সরকার যদিও জোর দিয়ে বলেছিল, অ্যামনেস্টি বিদেশ থেকে অনুদান গ্রহণের বিধি লঙ্ঘন করেছে, এনজিওটির দাবি (বেশিরভাগ আন্তর্জাতিক সমপ্রদায় যাতে একমত) ঘটনাটি আসলে ছিল ভারতের মানবাধিকার রেকর্ডের সমালোচনা করার প্রতিক্রিয়া।
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে মোদি সরকার তার নীতির সমালোচনাকারী বেশ কয়েকজন আন্দোলনকর্মী এবং সাংবাদিককে বিদেশ ভ্রমণ করতেও বাধা দিয়েছে। সরকারের অনেক সমালোচকের ওপর গোয়েন্দাগিরি চালানোর পর সন্ত্রাস-সম্পর্কিত অভিযোগে গ্রেপ্তার করে বিনাবিচারে আটক রাখা হয়েছে। পুলিশের বিরুদ্ধে অনেকের কম্পিউটারে মিথ্যা নথি ঢুকিয়ে তার সুবাদে অভিযোগ আনার অভিযোগও উঠেছে।
এসবের ফলস্বরূপ, ভারত রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস-এর ২০২২ সালের সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সূচকে ২০১৯ এর তুলনায় আট ধাপ নিচে নেমে গিয়ে ১৮০ দেশের মধ্যে ১৫০তম স্থান পেয়েছে। ভারত এ বছরের ফ্রিডম হাউজ গণতন্ত্র সূচকে একশর মধ্যে মাত্র ৬৬ স্কোর করেছে। ভারতকে রাখা হয়েছে ‘আংশিকভাবে মুক্ত’ বিভাগে। একথা অনস্বীকার্য, এই ‘রিপোর্ট কার্ড’ যেমনটা দেখাচ্ছে ভারতের ৭৫তম জন্মদিনে আসলেই উদযাপন করার মতো খুব বেশি কিছু নেই। দেশটি যদি ২০৪৭ সালে তার পরবর্তী বড় মাইলফলক জন্মদিনটি উদযাপনের সময় বাস্তব কিছু পেতে চায়, তবে একে ব্যর্থতাগুলো স্বীকার করে আরও মুক্ত, সমতাপূর্ণ এবং গণতান্ত্রিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের লক্ষ্যে কাজ শুরু করতে হবে।
আলজাজিরা অনলাইন থেকে ভাষান্তর: আবু ইউসূফ
লেখক ডেনমার্কের রোশিল্ডে ইউনিভার্সিটির সহযোগী অধ্যাপক