মিরসরাই দুর্ঘটনায় গেটম্যান মাইক্রোবাস চালক দায়ী

চট্টগ্রামের মিরসরাইয়ের বড়তাকিয়া স্টেশন এলাকায় লেভেল ক্রসিংয়ে ট্রেনের সঙ্গে মাইক্রোবাসের ধাক্কার ঘটনায় গেটম্যান সাদ্দাম হোসেন ও মাইক্রোবাস চালক গোলাম মোস্তফার দায় পেয়েছে তদন্ত কমিটি। এ মর্মান্তিক দুর্ঘটনার সময় গেটম্যান সাদ্দাম হোসেন ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন না।

গত ১৫ আগস্ট রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মুহম্মদ আবুল কালাম চৌধুরীর কাছে ছয় পৃষ্ঠার প্রতিবেদন জমা দেন। মাইক্রোবাস চালক গোলাম মোস্তফা ঘটনাস্থলে নিহত হন। আর গেটম্যান সাদ্দাম হোসেন বর্তমানে কারাগারে আছেন।

তদন্ত প্রতিবেদন হাতে পাওয়ার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন রেলওয়ে পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় রেলওয়ে ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) মুহম্মদ আবুল কালাম চৌধুরী। তিনি বলেন, প্রতিবেদনটি পর্যালোচনা করে অনুমোদন করা হলেই কমিটির দেওয়া সুপারিশগুলো বাস্তবায়ন করা হবে।

প্রতিবেদনে ব্যারিয়ার ফেললেও ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকার জন্য গেটম্যানকে শাস্তির আওতায় আনতে সুপারিশ করা হয়। প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, ট্রেন যাওয়ার আগে গেটম্যান দুই পাশের ব্যারিয়ার ফেলেছিলেন। কিন্তু কেউ না কেউ একটি ব্যারিয়ার উঠিয়ে ফেললে মাইক্রোবাসটি ক্রসিং পার হয়ে যায়। কিন্তু অন্যপ্রান্তের ব্যারিয়ার নামানো থাকায় দ্রুত সময়ের মধ্যে রেলক্রসিং পার হতে পারেনি। গেটম্যান ব্যারিয়ার ফেলে শুক্রবারের জুমার নামাজ পড়ার জন্য গেলেও তার বিরুদ্ধে অতীতে কাজে ফাঁকি দেওয়ার কোনো অভিযোগ ছিল না।

প্রতিবেদনে আরও উল্লেখ করা হয়, রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় অন্তত ৬০০ থেকে ৮০০ মিটার দূরবর্তী স্থান থেকে একটি ট্রেনকে দেখতে পাওয়ার কথা। রেলওয়ে আইন অনুযায়ী, রেলক্রসিং পার হওয়ার সময় বিভিন্ন সতর্কতামূলক নির্দেশ প্রতিপালন, রেলওয়ের সতর্কতা অ্যালার্ম শুনে পারাপার কিংবা ট্রেনের হুইসেল শুনে ক্রসিং পার হওয়ার নিয়ম রয়েছে। তাছাড়া একটি মাইক্রোবাসে ১০ থেকে সর্বোচ্চ ১২ জনের ভ্রমণ সম্ভব হলেও ওই মাইক্রোবাসে চালক-হেলপারসহ ১৮ যাত্রী ছিল। যার কারণে মাইক্রোবাসের অভ্যন্তরে উচ্চৈঃস্বরে গান বাজানো, হই-হুল্লোড়সহ মোটরযান আইন মেনে না চলায় মর্মান্তিক এ দুর্ঘটনা ঘটেছে। এ ঘটনায় গেটম্যানের চেয়েও মাইক্রোবাস চালকের দায় সবচেয়ে বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে তদন্ত কমিটির এক সদস্য দেশ রূপান্তরকে বলেন, গেটম্যান সাদ্দাম রেলওয়ের নিজস্ব কর্মী নন। মূলত রেলওয়ের প্রকল্পের অধীনে অস্থায়ী গেটম্যান হিসেবে তাকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। এ ক্ষেত্রে প্রকল্প থেকে চাকরিচ্যুত করা ছাড়া আর কোনো শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। আর মাইক্রোবাস চালক মারা গেছেন।

গত ২৯ জুলাই দুপুর দেড়টার দিকে ঢাকা থেকে চট্টগ্রামমুখী মহানগর প্রভাতী আন্তঃনগর ট্রেন মিরসরাই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় রেললাইনের ওপর থাকা পর্যটকবাহী একটি মাইক্রোবাসকে ধাক্কা দেয়। ওই ঘটনায় ট্রেনটি মাইক্রোবাসকে অন্তত এক কিলোমিটার নিয়ে যায়। এতে ঘটনাস্থলে মারা যান ১১ জন ও পরে দুজনের মৃত্যু হয়। আহত বাকি পাঁচজন বর্তমানে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন।

এ মর্মান্তিক ট্রেন দুর্ঘটনায় হতাহতরা চট্টগ্রামের হাটহাজারী উপজেলার আমানবাজারের পূর্ব খন্দকিয়া গ্রামের বাসিন্দা। নিহত ১৩ জনের মধ্যে গাড়িচালক ছাড়া অন্যরা স্থানীয় একটি কোচিং সেন্টারের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী। ঘটনার দিন সকালে তারা মাইক্রোবাসে মিরসরাইয়ের খৈয়াছড়া ঝরনা দেখতে যান। দুপুরে সেখান থেকে ফেরার পথে দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। দুর্ঘটনার পর গেটম্যান সাদ্দাম হোসেনকে পুলিশ গ্রেপ্তার করে।

এ দুর্ঘটনা তদন্তে রেলওয়ে চার ও পাঁচ সদস্যের দুটি পৃথক তদন্ত কমিটি গঠন করে। একটি তদন্ত কমিটির প্রধান করা হয় পূর্বাঞ্চলের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী মো. আরমান হোসেনকে। বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তার কমিটি প্রতিবেদন জমা দিলেও অন্য কমিটি প্রতিবেদন জমা দেয়নি এখনো। অন্য কমিটির প্রধান করা হয় রেলওয়ের পূর্বাঞ্চলের বিভাগীয় পরিবহন কর্মকর্তা (ডিটিও-অতিরিক্ত দায়িত্ব) আনসার আলীকে। তার কমিটি প্রতিবেদন জমা দিয়েছে।