তারা চাকরি করেন চুয়াডাঙ্গায়। অথচ একজন থাকেন আমেরিকায়, অন্য দুজন ঢাকায়। চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলার দুটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের এই তিন শিক্ষিকা বিভিন্ন কারণ দেখিয়ে ছুটি নিয়ে দীর্ঘদিন ধরে কর্মস্থলে অনুপস্থিত।
তাদের ছুটি শেষ হয়ে গেলেও কর্মস্থলে ফেরেননি চুয়াডাঙ্গা শহরতলির হাজরাহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক নিগার সুলতানা, ওই প্রতিষ্ঠানের সহকারী শিক্ষক নীনা শাহরিয়ার এবং ভিমরুল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নিপা শাহরিয়ার।
শিক্ষক-সংকটে ভেঙে পড়েছে বিদ্যালয়গুলোর শিক্ষাব্যবস্থা। ইতিমধ্যে শিক্ষিকাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কার্যালয়ে চিঠি পাঠিয়েছে চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা প্রশাসন।
জানা গেছে, ২০১৩ সালের ১ জুলাই চুয়াডাঙ্গা শহরতলির হাজরাহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন নিগার সুলতানা। চার বছর তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া-আসা প্রভৃতি কারণ দেখিয়ে বিদ্যালয়ে অনুপস্থিত থাকেন। ২০১৮ সালের ১২ ডিসেম্বর থেকে ২০১৯ সালের ১০ মার্চ পর্যন্ত তিন মাসের চিকিৎসাজনিত ছুটির দরখাস্ত নিজ বিদ্যালয়ে রেখে প্রথম তিনি যুক্তরাষ্ট্রে যান। অথচ এ ধরনের ছুটির জন্য উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার মাধ্যমে মহাপরিচালকের দপ্তরের অনুমতি নেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। দেশে না এসেই ২০১৯ সালের ১১ মার্চ থেকে ১০ মে পর্যন্ত আরও দুই মাসের জন্য চিকিৎসাজনিত ছুটির দরখাস্ত উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠান তিনি। ২ বছর ৯ মাস ৮ দিন অননুমোদিত ছুটি কাটিয়ে ২০২১ সালের ২১ ডিসেম্বর তিনি বিদ্যালয়ে যোগ দেন। এরপর ৩ মাস ৭ দিন বিদ্যালয়ে গেলেও এ বছরের ২৮ মার্চ থেকে যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন তিনি।
নিগার সুলতানার বিষয়টি উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা উত্তম কুমার কু-ু গত ১৫ জুন জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে লিখিতভাবে জানান। তাতে উল্লেখ করা হয়, নিগার সুলতানা আগে কর্তৃপক্ষের অনুমতি ছাড়াই বিদেশ (যুক্তরাষ্ট্র) যান এবং সেখানে অবস্থান করেন।
অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮-এর বিধি ৪-এর উপবিধি (২) (ঘ) ধারা অনুযায়ী বিভাগীয় উপ-পরিচালক গত বছরের ১৯ ডিসেম্বর নিগার সুলতানার বেতন-গ্রেড অবনমিত করে প্রারম্ভিক ধাপে নির্ধারণ করে দেন। এরপর যুক্তরাষ্ট্রে বসবাসরত অসুস্থ মায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ করার জন্য শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের কাছে দরখাস্ত করলে শর্তসাপেক্ষে তাকে গত বছরের ২৩ ডিসেম্বর থেকে পরবর্তী ৬০ দিনের জন্য ছুটি দেওয়া হয়। শর্তে চলতি বছরের ২৭ মে কর্মস্থলে যোগদান করা ও ছুটির মেয়াদ কোনোভাবে না বাড়ানোর কথা বলা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজে যোগ দিতে ব্যর্থ হলে তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও বলা হয়। কিন্তু নিগার সুলতানা সব নির্দেশনা অমান্য করে এখনো যুক্তরাষ্ট্রে রয়েছেন।
একই বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক নীনা শাহরিয়ার ২০২০ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি থেকে এখন পর্যন্ত ছুটি ছাড়াই কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত রয়েছেন। সহকর্মী শিক্ষকদের ভাষ্য, নীনা শাহরিয়ার ঢাকায় তার স্বামীর সঙ্গে বাস করছেন।
হাজরাহাটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ভারপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক এ টি এম শামিউল ইসলাম বলেন, প্রধান শিক্ষক নিগার সুলতানা দীর্ঘদিন ধরে স্বজনদের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রে বাস করছেন। আর সহকারী শিক্ষক নীনা শাহরিয়ার পরিবার-পরিজন নিয়ে ঢাকায় থাকেন। তাদের মুঠোফোনে পাওয়া যায় না, আত্মীয়স্বজনরাও তাদের বিষয়ে কোনো তথ্য দেন না।
বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষকরা বলেন, বিদ্যালয়ের শিক্ষকসংখ্যা ৮। এর মধ্যে ২ জন অনুপস্থিত; আরও ২ জন মাতৃত্বকালীন ও চিকিৎসাজনিত ছুটিতে আছেন। আরেকজন প্রশিক্ষণে রয়েছেন। এখন তিনজন শিক্ষক নিয়ে চলছে স্কুলটি। বিদ্যালয়ে ছাত্রছাত্রী আছে তিন শতাধিক। এত শিক্ষার্থীর পাঠদান ও প্রাতিষ্ঠানিক কাজ করা তিনজন শিক্ষক দিয়ে অসম্ভব প্রায়।
শহরের আরেক শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ভিমরুল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়েও প্রায় একই অবস্থা। সেখানে নিপা শাহরিয়ার নামে এক শিক্ষক কর্মস্থলে অনুপস্থিত। চিকিৎসাজনিত কারণ দেখিয়ে ৬ মাসের ছুটি নিয়ে ৯ মাস ধরে বিদ্যালয়ে আসেন না তিনি। ভিমরুল্লা প্রাথমিকের নিপা শাহরিয়ার ও হাজরাহাটি বিদ্যালয়ের নীনা শাহরিয়ার সম্পর্কে বোন।
ভিমরুল্লা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক উম্মে ছালমা বলেন, নিপা শাহরিয়ার ২০১২ সালের ২৭ আগস্ট সহকারী শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে যোগ দেন। ২০২১ সালের ৯ অক্টোবর করোনায় আক্রান্ত হয়ে চিকিৎসাজনিত ছুটি ভোগ করেন তিনি। সে বছরের ১১ নভেম্বর আবারও ৬ মাসের ছুটি নেন তিনি। সে ছুটি শেষ হয়েছে গত মে মাসে। তারপর তিন মাস পেরিয়ে গেলেও কর্মস্থলে ফেরেননি নিপা।
এ ব্যাপারে সদর উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা উত্তম কুমার কু-ু বলেন, নীনা শাহরিয়ারের বাসার ঠিকানায় গিয়েও তাকে পাওয়া যায়নি। অননুমোদিত ছুটির বিষয়ে ২০২০ সালের ১৪ জুলাই কৈফিয়ত তলব করা হলেও অদ্যাবধি তিনি জবাব দেননি। মুঠোফোনের নম্বর পরিবর্তন করায় তার সঙ্গে যোগাযোগ করা যাচ্ছে না। নিগার সুলতানার বিরুদ্ধে সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি পাঠানো হয়েছে। আর নিপা শাহরিয়ারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে তিন শিক্ষকের একজন আমাদের কাছে স্বেচ্ছায় চাকরি থেকে অব্যাহতি নেওয়ার আবেদন করেছেন। বিষয়টির তদন্ত চলছে, ফলে বিস্তারিত বলা সম্ভব নয়।
চুয়াডাঙ্গা সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামীম ভূইয়া জানান, শিক্ষকদের কাছ থেকে এমনটা কাম্য নয়। তাদের বিরুদ্ধে প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা নিতে চলতি মাসের প্রথম সপ্তাহে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সুপারিশ করা হয়েছে। সুপারিশের চিঠি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হয়েছে।
এ ব্যাপারে শিক্ষক নিগার সুলতানা, নীনা শাহরিয়ার ও নিপা শাহরিয়ারের সঙ্গে মুঠোফোনে যোগাযোগের চেষ্টা করেও পাওয়া যায়নি।