ঢাকা সফররত জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিশনের এশিয়া-প্যাসিফিক শাখার প্রধান ররি মুনগোবেনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন বিএনপি নেতারা। এ সময় ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পর থেকে আওয়ামী লীগ সরকার আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ব্যবহার করে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের যেভাবে তুলে নিয়ে গুম করেছে তার বিশদ বিবরণ তুলে ধরেছেন তারা। একই সঙ্গে সরকারের অস্বীকার, গুম হওয়াদের পরিবারের সদস্যদের হয়রানি, আর্থিক সংকটসহ বিভিন্ন বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।
এ ছাড়া গুম হওয়া নেতাকর্মীদের ডাটাবেজসহ নানা তথ্য-উপাত্ত দেওয়া হয়েছে। পাশাপাশি জাতিসংঘের অধীনে সঠিক তদন্ত দাবি করা হয়েছে বিএনপির পক্ষ থেকে। গতকাল বুধবার বৈঠক শেষে দেশ রূপান্তরকে এসব কথা জানিয়েছেন বৈঠকে অংশ নেওয়া এক নেতা।
এর আগে দুপুরে রাজধানীর শাহবাগের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে বিএনপির মানবাধিকারবিষয়ক সম্পাদক অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আসাদের নেতৃত্বে চার প্রতিনিধিদল ররি মুনগোবেনের সঙ্গে বৈঠক করেন। প্রতিনিধিদলের অন্য সদস্যরা হলেন দলের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কমিটির সদস্য শামা ওবায়েদ, তাবিথ আউয়াল, মানবাধিকারবিষয়ক কমিটির ব্যারিস্টার আবরার ইলিয়াস।
প্রায় ৫০ মিনিট বৈঠক শেষে বৈঠকে অংশ নেওয়া ওই নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকে বিরোধীদলীয় নেতাকর্মীদের গুম করেছে। গুমের বিষয়টি আমরা তার কাছে তুলে ধরেছি। বলেছি, সরকার স্বীকারই করে না গুমের বিষয়টি। তাই আমরা চাই বিষয়টি জাতিসংঘের অধীনে তদন্ত হোক এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হোক। জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক কমিটি সরকারের কাছে গুম হওয়া নেতাকর্মীদের তথ্য চাওয়ার পর আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা যে গুম হওয়া নেতাকর্মীদের পরিবারকে হয়রানি করেছে তা তুলে ধরেছি।’
১৭ এপ্রিল ২০১২ রাজধানীর বনানী থেকে ড্রাইভারসহ নিখোঁজ হন বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য এবং দলের সাংগঠনিক সম্পাদক এম ইলিয়াস আলী। তখন ইলিয়াস আলীর স্ত্রী তাহসিনা রুশদী লুনা সাংবাদিকদের জানিয়েছিলেন, মধ্যরাতের পর ঢাকার বনানী থানা থেকে ফোন করে তাকে জানানো হয় মহাখালী থেকে একটি গাড়ি পরিত্যক্ত অবস্থায় উদ্ধার করেছে পুলিশ। এরপর থেকে স্বামীর কোনো খোঁজ তারা পাচ্ছেন না। একই সঙ্গে নিখোঁজ রয়েছেন গাড়ির চালক আনসার।
বৈঠকে অংশ নেন ইলিয়াস আলীর বড় ছেলে ব্যারিস্টার আবরার ইলিয়াস। বৈঠক শেষে আবরার দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমি আমার বাবার নিখোঁজের বিষয়টি তুলে ধরেছি। বলেছি, আমার বাবা ইলিয়াস আলী নিখোঁজ হওয়ার পর প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে গণভবনে আমরা দেখা করেছিলাম। প্রধানমন্ত্রী আমাদের আশ^াস দিয়েছিলেন আমার বাবাকে খুঁজে বের করে আমাদের মাঝে ফেরত দেবেন। কিন্তু বিগত ১০ বছরেও আমি আমার বাবাকে খুঁজি পাইনি। আমার মা তাহসিনা রুশদীর লুনা আদালতে একটি রিট করেছিলেন। কোনো অগ্রগতি নেই।’
তিনি বলেন, ‘গুম হওয়া নেতাকর্মীদের স্বজনদের একটি সংগঠন রয়েছে, যার নাম ‘মায়ের ডাক’। গুম হওয়া নেতাকর্মীদের স্বজনরা একমাত্র অর্থ উপার্জনকারীকে হারিয়ে পুরো পরিবার নিয়ে দুর্বিষহ জীবনযাপন করছেন। একই অবস্থা আমাদের। বাবা নিখোঁজ থাকায় ব্যাংকে বাবার অ্যাকাউন্টে যে টাকা জমা ছিল তা আইনি জটিলতায় তুলতে পারছি না। সরকারের কাছে অনুরোধ জানানোর পরও আমরা টাকা তুলতে পারছি না। আর্থিক সংকটের কারণে আমাদের পরিবারের সদস্যদের চলতে সমস্যা হচ্ছে। বিষয়টি যাতে সরকারের সর্বোচ্চ পর্যায়ে জানানো হয় এবং এর সুরাহা হয় সে বিষয়ে দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি।’
বৈঠক শেষে বেরিয়ে এসে হোটেল লাউঞ্জে সাংবাদিকদের কাছে অ্যাডভোকেট আসাদুজ্জামান আসাদ বলেন, ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি কেমন সেটা নিয়ে আমাদের সঙ্গে কথা হয়েছে। আমরা আমাদের বক্তব্য তাকে বলেছি। বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আমরা ব্যাখ্যা করেছি যেটা পত্র-পত্রিকায় বিভিন্ন সময়ে এসেছে।’
মুনগোবেন কী বলেছেন জানতে চাইলে আসাদ বলেন, ‘উনি আমাদের বক্তব্য শুনেছেন। উনি তো ফিড ব্যাক দেবেন না আমাদের। আপনাদের সঙ্গে মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনারের সংবাদ সম্মেলনে হয়তো বলবেন।’
সাংগঠনিক সম্পাদক শামা ওবায়েদ বলেন, ‘বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি আপনারা (গণমাধ্যমের সাংবাদিক) যেভাবে দেখেন বিএনপি সেভাবেই দেখে। সারা বাংলাদেশের মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে নতুন করে বলার কিছু নেই। সবই আপনারাও জানেন, সকলে জানে।’
গত রবিবার চার দিনের সফরে বাংলাদেশে আসেন চিলির সাবেক প্রেসিডেন্ট ও জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাই কমিশনার মিশেল ব্যাশেলের। ২০১৮ সালের আগস্ট থেকে তিনি এই দায়িত্ব পালন করছেন।
এর আগে গত সোমবার হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে দেশের বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠনের শীর্ষ ব্যক্তিরা জাতিসংঘের হাই কমিশনারের সঙ্গে বৈঠক করেছিলেন। সেখানে অংশ নিয়েছিলেন ‘মায়ের ডাক’ সংগঠনের আহ্বায়ক ও নিখোঁজ বিএনপি নেতা সাজেদুল ইসলাম সুমনের বোন সানজিদা ইসলাম তুলি।