বিদেশিদের নগদ সহায়তা বাড়ানোর দাবি জাপানের

তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানিতে দেশি ও বিদেশি মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোকে দেওয়া নগদ প্রণোদনার বৈষম্য কমিয়ে আনার দাবি জানিয়েছে জাপান। দেশীয় কোম্পানিগুলোর জন্য বিদ্যমান প্রণোদনা ৫ শতাংশ থেকে কমিয়ে ৩ শতাংশ করা এবং বিদেশি ও যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানিগুলোর জন্য বিদ্যমান প্রণোদনা ২ শতাংশ বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন দেশটির রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি। সম্প্রতি অর্থ সচিবকে দেওয়া এক চিঠিতে এমন দাবি জানিয়েছেন জাপানি রাষ্ট্রদূত।

দেশি মালিকানাধীন কারখানাগুলো পোশাক রপ্তানিতে (নতুন বাজার ব্যতীত) ৫ শতাংশ এবং বাজেট বরাদ্দে আরও ১ শতাংশসহ ৬ শতাংশ প্রণোদনা পেয়ে থাকে। কিন্তু রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের কারখানাগুলো তৈরি পোশাক পণ্য রপ্তানি করে পাচ্ছে মাত্র ১ শতাংশ প্রণোদনা। রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ এলাকার (ইপিজেড) কারখানাগুলোর পোশাক রপ্তানিতে প্রণোদনা বাড়ানোর দাবি জানিয়ে গত ১১ আগস্ট অর্থ বিভাগের সিনিয়র সচিবকে চিঠি পাঠিয়েছেন ইতো নাওকি। চিঠিতে দেশি ও বিদেশি কোম্পানিগুলোর প্রণোদনায় বৈষম্য কমিয়ে সবার জন্য একই হারে ৩ শতাংশ নগদ প্রণোদনার দাবি জানান তিনি।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরো, বিজিএমইএসহ অন্যান্য সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে স্থানীয়ভাবে সংগ্রহ করা সুতা ও কাপড়ের মতো কাঁচামাল ব্যবহার করে তৈরি পোশাক রপ্তানিতে ৫ শতাংশ নগদ প্রণোদনা পান রপ্তানিকারকরা। ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া অপ্রচলিত বাজারে এসব পণ্য রপ্তানি হলে সরকার আরও ৪ শতাংশ নগদ প্রণোদনা দেয়।

বিদ্যমান প্রণোদনার সঙ্গে সরকার চলতি ২০২২-২৩ অর্থবছরের বাজেটে আরও ১ শতাংশ প্রণোদনা বরাদ্দ রেখেছে। পোশাক রপ্তানিকারকরা গত দুই বছর ধরে সব দেশে অতিরিক্ত ১ শতাংশ নগদ প্রণোদনা পেয়ে আসছেন। শতভাগ দেশি মালিকানাধীন কারখানার মালিকরা নতুন বাজারে রপ্তানির ক্ষেত্রে সব মিলিয়ে ১০ শতাংশ প্রণোদনা পাচ্ছেন।

অর্থ মন্ত্রণালয়ে দেওয়া চিঠিতে জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেছেন, নতুন নতুন বাজারে (ইউরোপীয় ইউনিয়ন, কানাডা ও যুক্তরাষ্ট্র ছাড়া) পোশাক রপ্তানির জন্য শতভাগ দেশি মালিকানাধীন (টাইপ-সি) কোম্পানিগুলো ৪ শতাংশ অতিরিক্ত প্রণোদনা পাচ্ছে। কিন্তু রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের (‘এ’ ক্যাটাগরি) শতভাগ বিদেশি মালিকানাধীন এবং (‘বি’ ক্যাটাগরি) দেশি-বিদেশি যৌথ মালিকানাধীন কোম্পানিগুলো একই হারে প্রণোদনা পাচ্ছে না।

তৈরি পোশাক রপ্তানিতে সরকারের দেওয়া প্রণোদনায় বড় ধরনের বৈষম্য রয়েছে জানিয়ে জাপানি রাষ্ট্রদূত চিঠিতে উল্লেখ করেন, সব ধরনের বিদেশি কারখানাগুলো পোশাক রপ্তানিতে মাত্র ১ শতাংশ প্রণোদনা পাচ্ছে। বৈষম্য দূর করে নতুন নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানির জন্য ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির কারখানাগুলোকে অতিরিক্ত ৪ শতাংশ প্রণোদনা দেওয়া হলে জাপানসহ নতুন নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানি নিশ্চিতভাবে বৃদ্ধি পাবে। এতে করে ভবিষ্যতে জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে উৎসাহী হবে। রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের ‘এ’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলো আরও বেশি তৈরি পোশাক রপ্তানিতে যুক্ত হবে।

রাষ্ট্রদূত বলেন, ২০২৬ সালে স্বল্পোন্নত দেশ হতে উন্নয়নশীল দেশে উত্তরণের পর বাংলাদেশ সরকারকে রপ্তানির জন্য নগদ প্রণোদনা পর্যায়ক্রমে বন্ধ করতে হবে। যদি পর্যায়ক্রমে নগদ প্রণোদনা হার কমিয়ে আনা যায়, তাহলে সরকার সব ধরনের কোম্পানির জন্য ২ শতাংশে প্রণোদনা নির্ধারণ করতে সক্ষম হবে, যা দেশি-বিদেশি কোম্পানির মধ্যে বৈষম্য দূর করবে।

নগদ প্রণোদনার হার কমিয়ে আনার উদ্যোগ হিসেবে ‘সি’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর নগদ প্রণোদনা ৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশ কমিয়ে আনা এবং সাময়িকভাবে ‘এ’ ও ‘বি’ ক্যাটাগরির কোম্পানিগুলোর জন্য ২ শতাংশ বৃদ্ধি করা যেতে পারে বলে জানান ইতো নাওকি। সরকার রপ্তানি প্রক্রিয়াজাতকরণ অঞ্চলের জাপানি কোম্পানিগুলোকে এ সুবিধা দিলে তারা শ্রমিক নিয়োগ, মজুরি বৃদ্ধি এবং দক্ষতা উন্নয়নের জন্য আরও বেশি অর্থ ব্যবহার করতে পারে। পরে ধাপে ধাপে প্রণোদনা কমিয়ে আনা যেতে পারে।

চিঠিতে আরও বলা হয়, গত ৪ আগস্ট বাংলাদেশ-জাপান পাবলিক প্রাইভেট জয়েন্ট ইকোনমিক ডায়ালগে (পিপিইডি) বাংলাদেশে জাপানি কোম্পানিগুলোর বিনিয়োগের চ্যালেঞ্জ নিয়ে আলোচনা হয়। সেখানে নতুন বাজারে পোশাক রপ্তানিতে নগদ প্রণোদনা প্রদানের সমস্যাটি এখনো সমাধান না হওয়ার বিষয়টিও উঠে আসে।

দেশের তৈরি পোশাকশিল্প মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ সূত্র জানায়, ২০৩০ সালের মধ্যে তৈরি পোশাকের রপ্তানি ১০ হাজার কোটি ডলারে নিয়ে যাওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছেন মালিকরা। ওই সময় পোশাকশ্রমিকের সংখ্যা গিয়ে দাঁড়াবে ৬০ লাখে। ২০২১-২২ অর্থবছরে ৪ হাজার ২৬১ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি হয়েছে। ১০ হাজার কোটি ডলারের লক্ষ্য অর্জনে আগামী ৯ বছরের মধ্যে বাড়তি ৫ হাজার ৭৮৪ কোটি ডলারের পোশাক রপ্তানি করতে হবে।