প্রাইমারির গন্ডি পেরোয় না মুসার চরের শিশুরা

ব্রহ্মপুত্রের বুকে জেগে ওঠা এক চর। নাম মুসার চর। কুড়িগ্রামের উলিপুর উপজেলার বেগমগঞ্জ ইউনিয়নে এর অবস্থান। নদীবেষ্টিত এ চরে ৫০টির মতো পরিবারের তিন শতাধিক মানুষের বাস। মূল ভূখন্ড থেকে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হওয়ায় নাগরিক সেবা থেকে বঞ্চিত তারা। বিশেষ করে শিক্ষার মতো মৌলিক অধিকার থেকে পুরোপুরি বঞ্চিত এখানকার শিশু-কিশোররা। যোগাযোগের একমাত্র ভরসা নৌকা। চরে কোনো শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় ব্রহ্মপুত্র পাড়ি দিয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যেতে চায় না কেউ। ফলে এখানকার শিশু-কিশোররা প্রাইমারির গন্ডিও পেরোতে পারছে না।

চরবাসীর সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ব্রহ্মপুত্রের ভাঙনে চরের বাসিন্দাদের অনেকের বাড়ি কয়েকবার নদীতে বিলীন হয়েছে। প্রসূতিসহ যে কোনো রোগীকে চিকিৎসার জন্য পাড়ি দিতে হয় ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার নদীপথ। প্রতিনিয়ত নৌকার অভাবে পড়তে হয় বেকায়দায়। জরুরি রোগীকে হাসপাতালে যথাসময়ে নিতে না পারায় মৃত্যুর ঘটনাও ঘটে। হাতেগোনা কয়েকটি বাড়িতে সৌরবিদ্যুৎ থাকলেও এই আধুনিক যুগে কারও বাড়িতে নেই কোনো টেলিভিশন কিংবা ইলেকট্রিক যন্ত্রপাতি। ভোটের সময় চরবাসীর কিছুটা কদর থাকলেও পরে আর কেউ খোঁজ নেয় না তাদের।

সরেজমিনে দেখা যায়, দ্বীপের মতো দেখতে মুসার চরের চারদিকে থৈ থৈ পানি। অগোছালো কয়েকটি বাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। নৌকা ছাড়া যাওয়ার উপায় নেই। বাসিন্দাদের কেউ দিনমজুরের কাজ করে, কেউ নদীতে মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করে। এখানকার অনেকই শিশু-কিশোরই জানে না শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কেমন। লেখাপড়ার সুযোগ না পাওয়ায় অল্প বয়সেই কাজে লেগে যাচ্ছে।

চরের বাসিন্দা জাহিদুল ইসলাম বলেন, ‘আমার তিন সন্তানের বয়স ১২, ৮ ও ৩ বছর। এই গ্রামে স্কুল মাদ্রাসা না থাকায় পড়াতে পারছি না। অন্যখানে রেখে যে পড়াব সে সামর্থ্য নেই। খুব কষ্ট আমাদের। এবছরেই তিনবার বাড়ি ভেঙেছে। ভোটের সময় মেম্বার চেয়ারম্যান বলে স্কুল করে দেবে, ভোটের পর কেউ খবর রাখে না।’

নূর ইসলাম নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, ‘আমার জীবনে ১২ থেকে ১৩ বার বাড়ি  ভেঙেছে। এ জীবনে আরও যে কতবার বাড়ি ভাঙবে জানি না। কেউ অসুস্থ হলে ডাক্তারের কাছে সময়মতো যেতে পারি না। খুব সমস্যায় আছি। দেখার কেউ নেই আমাদের।’

চরের বাসিন্দা আমিরুল ইসলাম (১৫) নামে এক কিশোর বলে, ‘আমার গ্রামে স্কুল নেই, তাই লেখাপড়া করতে পারিনি। এখন নদীতে মাছ ধরি, তা বিক্রি করে সংসারে দিই। আর একটু বড় হলে ঢাকায় গিয়ে কাজ করব।’

আরেক শিশু সুমাইয়া খাতুন (১১) বলে, ‘এখানে স্কুল নেই, স্কুল যে কেমন তাও জানি না। খেলাধুলা করি, মায়ের সঙ্গে বাড়িতে কাজ করি।’

বেগমগঞ্জ ইউনিয়নের ৮ নম্বর ওয়ার্ডের ইউপি সদস্য মো. আবু বক্কর খাঁন বলেন, ‘আমার ওয়ার্ডের মুসার চরে প্রায় ৮০টি পরিবার বাস করত। গত একমাসে অনেক বাড়ি নদীতে বিলীন হয়েছে। সেখানে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান না থাকায় শিশু-কিশোররা শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। পুরো ইউনিয়নের মধ্যে সবচেয়ে খারাপ অবস্থায় আছে এখানকার মানুষজন।’

বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. বাবলু মিয়া বলেন, ‘মুসার চরের বাসিন্দারা সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত। চরে একটি স্কুলের ব্যাপারে অনেক এনজিওর সঙ্গে কথা বলেছি। কোনো এনজিও রাজি হলে মুসার চরে একটি স্কুল করা হবে।’