২৪০০ ডাকাত চিহ্নিত

চলতি বছরের গত আট মাসে মহাসড়কে চলন্ত বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণ, বাস আটকে ডাকাতি ও খুনের মতো কয়েকটি ঘটনা ঘটেছে। সর্বশেষ চলতি আগস্ট মাসে টাঙ্গাইল ও গাজীপুরে চলন্ত বাসে ডাকাতি ও ধর্ষণের ঘটনায় মহসড়কে যাত্রী সুরক্ষার বিষয়টি উঠে এসেছে। এ অবস্থায় পুলিশ মহাসড়কে নিরাপদ যাতায়াত নিশ্চিত করার লক্ষ্যে বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছে। এর মধ্যে দেশের মহাসড়কগুলোতে তৎপর ডাকাত দলগুলোর তালিকা করে অভিযানের পরিকল্পনা করা হয়েছে।

পুলিশ সূত্রে জানা গেছে, দেশের মহাসড়কগুলোতে ডাকাতি ও নানা অপরাধে জড়িত দুই শতাধিক গ্রুপের একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছে। এসব দলে ১২-১৫ জন করে সদস্য রয়েছে। এ তালিকা ধরে শিগগির অভিযানে নামবে পুলিশ। তবে পুলিশের আরেকটি সূত্র বলেছে, আগামী সপ্তাহে এ অভিযান শুরু হতে পারে।

পুলিশ সূত্রে আরও জানা গেছে, টাঙ্গাইল ও গাজীপুরে চলন্ত বাসে ধর্ষণের ঘটনার পর সরকারের হাইকমান্ড সড়ক-মহাসড়কে অপরাধ কমাতে বিশেষ নির্দেশনা দিয়েছে। এর আলোকে পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা কয়েক দফা বৈঠক করেন। এর ধারাবাহিকতায় ডাকাতদের বিস্তারিত পরিচয় ও অপরাধের তথ্যসহ তালিকাটি করা হয়। তাদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরুর ব্যাপারে দিকনির্দেশনা দেওয়া হয় হাইওয়ে পুলিশকে।

জানতে চাইলে হাইওয়ে পুলিশের প্রধান ও অ্যাডিশনাল আইজিপি (পুলিশের অতিরিক্ত মহাপরিদর্শক) মল্লিক ফখরুল ইসলাম দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কে জনগণের নির্বিঘ্ন চলাচল ও জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিতে আমরা বেশ কিছু উদ্যোগ নিয়েছি। সড়ক-মহাসড়কে যারা ডাকাতিসহ নানা অপরাধ করে তাদের আইনের আওতায় আনতে হাইওয়ে পুুলিশের মাঠপর্যায়ের ইউনিটগুলোকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।’

তিনি আরও বলেন, মহাসড়কে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা উন্নত করার পাশাপাশি সারা দেশে ৮০টি বিশেষ টহলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। জেলা পুলিশের সঙ্গে সমন্বয় করে যৌথ অভিযানের মাধ্যমে ছিনতাই, দস্যুতা ও ডাকাতি প্রতিরোধ কার্যক্রম অব্যাহত আছে। রাতের বেলায় দায়িত্ব পালন করা পুলিশ সদস্যদের পর্যবেক্ষণে রাখা হচ্ছে। গভীর রাতে তাদের বার্তা পাঠিয়ে দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে।

গত ১৪ জানুয়ারি বগুড়া থেকে ছেড়ে আসা সোনারতরী পরিবহনের বাসে দুই তরুণীকে ধর্ষণ করে সর্বস্ব লুট করা হয়। গত ২ আগস্ট রাতে টাঙ্গাইলের মধুপুরে কুষ্টিয়া থেকে আসা ঈগল পরিবহনের চলন্ত বাসে এক নারী যাত্রীকে ধর্ষণ করা হয়। লুট করা হয় বাসে থাকা যাত্রীদের মালামাল। এ ঘটনার রেশ না কাটতেই ৬ আগস্ট গাজীপুরের শ্রীপুরের তাকওয়া পরিবহনের চলন্ত বাস থেকে স্বামীকে ফেলে দিয়ে নারীকে দল বেঁধে ধর্ষণের ঘটনা ঘটে। এর আগে গত ১১ মে সাভারের আশুলিয়ায় হানিফ পরিবহন এবং ২৯ মে গোপালগঞ্জের কাশিয়ানীতে স্টার লাইন পরিবহনের বাসে ডাকাতির ঘটনা ঘটে।

পুলিশ সূত্র জানায়, মহাসড়কে তৎপর ডাকাতদের যে তালিকা করা হয়েছে তাতে গাজীপুর, সাভার, মানিকগঞ্জ, ফরিদপুর, চট্টগ্রামের মিরসরাই, কক্সবাজারের টেকনাফ, বরিশাল, বরিশালের বাকেরগঞ্জ, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া থেকে কুমিল্লার দাউদকান্দি পর্যন্ত ও চৌদ্দগ্রাম, নোয়াখালী, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, সিলেট, ফেনী, রাঙ্গামাটি, বান্দরবান, রংপুর, সাতক্ষীরা, বগুড়া, সৈয়দপুর, খুলনা, মাগুরা, চাঁপাইনবাবগঞ্জ এলাকার ডাকাতরা রয়েছে। ওই তালিকা অনুযায়ী, একেকটি গ্রুপে ১২ থেকে ১৫ জন সদস্য রয়েছে। তারা বিশেষ প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত বলেও পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, সার্বিক পরিস্থিতি নিয়ে গত সপ্তাহে ভিডিও কনফারেন্সে হাইওয়ে পুলিশের প্রধান মাঠপর্যায়ের পুলিশের সঙ্গে দীর্ঘ সময় কথা বলেছেন। এছাড়া মহাসড়কের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে আনতে সারা দেশের থানা এবং ফাঁড়িতে হাইওয়ে পুলিশের সদর দপ্তর থেকে গত সপ্তাহে কিছু নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।

ওই নির্দেশনায় বলা হয়েছে, অপরাধী চক্রের সদস্যরা মহাসড়কের বিভিন্ন স্থান থেকে যাত্রীবেশে বাসে আরোহণ করে। যাত্রীবাহী বাস এবং বাজার, জনসমাগমস্থলে ভিডিও রেকর্ডের ব্যবস্থা বা সিসিটিভি ক্যামেরা না থাকার কারণে অপরাধীদের আইনের আওতায় আনতে জটিলতা তৈরি হচ্ছে।

এ কারণে নির্ধারিত স্টপেজের বাইরে যাত্রী না তুলতে কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে, স্টপেজ ছাড়া অন্য কোনো স্থানে বাস দাঁড় করালেই শাস্তির আওতায় আনতে হবে। এসব বিষয় মনিটরিং করতে স্টপেজগুলোতে জরুরি ভিত্তিতে ক্লোজ সার্কিট (সিসি) ক্যামেরা স্থাপন করা হবে। নির্ধারিত রুটের বাইরে যাতে বাস চলাচল না করে সে বিষয়টি কঠোর মনিটরিংয়ের আওতায় আনতে বলা হয়েছে। বাস টার্মিনাল থেকে যাত্রার আগে যাত্রী, চালক ও হেলপারদের ছবি ও ভিডিওধারণ বাধ্যতামূলক করতে হবে। ভিডিও পুলিশকে দিতে হবে। নতুন যাত্রী ওঠানোর সময় ছবি তোলা ও তা সংরক্ষণ করতে বাস মালিক সমিতির সঙ্গে আলোচনা করে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে হবে। হাইওয়ে ও জেলা পুলিশের টহল দল যথাসময়ে যথাস্থানে কর্তব্য পালন করছে কি না তা সংশ্লিষ্ট ইউনিটের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নিবিড়ভাবে তদারক করতে বলা হয়েছে। দায়িত্ব পালনে ব্যত্যয় হলে ব্যবস্থা নিতেও বলা হয়েছে।

সূত্র জানায়, দূরপাল্লার গাড়িতে ডেস্ক ক্যামেরা স্থাপনের উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। ওই ক্যামেরার মাধ্যমে গাড়ির যাত্রীদের মনিটরিং করা হবে। সেখানে একটি বিশেষ ডিভাইস থাকবে। ওই ডিভাইসটি জাতীয় জরুরি সেবার হেল্পডেস্ক নম্বর ৯৯৯-এর সঙ্গে সংযুক্ত থাকবে। গাড়িতে কোনো অপরাধী চক্র আক্রমণ করলে ওই ডিভাইসে চাপ দিলেই সংকেত চলে যাবে ৯৯৯-এ। এর মাধ্যমে স্থানীয় থানার সদস্যরা বিপদে পড়া গাড়ির বিষয়ে যথাযথ ব্যবস্থা নিতে পারবে। এছাড়া ডিভাইসের মাধ্যমে গাড়ির অবস্থানও চিহ্নিত করা যাবে।

হাইওয়ে পুলিশের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, অপরাধ প্রতিরোধ করতে মহাসড়ককেন্দ্রিক অবৈধ হাটবাজার এবং অবৈধ দোকানপাট উচ্ছেদের পাশাপাশি ঝোপঝাড় কেটে পরিষ্কার করা হচ্ছে। সচেতনতা বাড়াতে জনসাধারণের মধ্যে দুই লাখ লিফলেট এবং হাইওয়ে পুলিশের মোবাইল নম্বর সংবলিত এক লাখ কার্ড বিতরণ করা হয়েছে। এছাড়া বিপুলসংখ্যক অযান্ত্রিক যানবাহন আটক করা হয়েছে।