সোনা চোরাচালান ও পাচার রোধে অভিযানে নামবে সরকারের একাধিক সংস্থা। সোনার বিনিময়ে অর্থ পাচারের বিষয়টি অনেক দেরিতে হলেও বাংলাদেশ জুয়েলার্স অ্যাসোসিয়েশন (বাজুস) সরকারের সংশ্লিষ্টদের নজরে আনায় নড়েচড়ে বসেছে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী। জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর সোনা চোরাচালান প্রতিরোধে অভিযানে নামছে বলে সংস্থাটি জানিয়েছে।
এসব বিষয়ে জানতে চাইলে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের মহাপরিচালক মোহাম্মদ ফখরুল আলম গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সোনা চোরাচালান প্রতিরোধে নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। কোথা থেকে কীভাবে বাংলাদেশে সোনা আসছে এবং পাচার হচ্ছে সেগুলো চিহ্নিত করা হচ্ছে। শিগগিরই সোনা চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান চালানো হবে।
এনবিআর ছাড়াও বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটও (বিএফআইইউ) আলদাভাবে নজরদারি করবে বলে নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে।
গত ১৩ আগস্ট সংবাদ সম্মেলন করে বাজুস জানিয়েছে সোনা চোরাচালানের মাধ্যমে বছরে ৭৩ হাজার কোটি টাকা পাচার হচ্ছে। সেদিন সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্যে বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন অ্যান্টি স্মাগলিং অ্যান্ড ল’ এনফোর্সমেন্ট চেয়ারম্যান এনামুল হক খান দোলন বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের রক্ত-ঘামে অর্জিত বৈদেশিক মুদ্রার অপব্যবহার করে প্রতিদিন সারা দেশের জল, স্থল ও আকাশপথে কমপক্ষে প্রায় ২০০ কোটি টাকার অবৈধ সোনার অলংকার ও বার চোরাচালানের মাধ্যমে বাংলাদেশে আসছে। যা ৩৬৫ দিন বা একবছর শেষে দাঁড়ায় প্রায় ৭৩ হাজার কোটি টাকা। দেশে চলমান ডলার সংকটে এই ৭৩ হাজার কোটি টাকার অর্থপাচার ও চোরাচালান বন্ধে সরকারের উদ্যোগ নেওয়া দরকার।
তিনি আরও বলেন, সোনা চোরাকারবারিদের চিহ্নিত করতে বাজুসকে সম্পৃক্ত করে পৃথকভাবে সরকারি মনিটরিং সেল গঠন করতে পারে সরকার। ব্যাগেজ রুলের আওতায় সোনার বার ও অলংকার আনার সুবিধা অপব্যবহারের কারণে ডলার সংকট ও চোরাচালানে কী প্রভাব পড়ছে, তা উদঘাটনে বাংলাদেশ ব্যাংক ও এনবিআর সমীক্ষা পরিচালনা করলে সহায়তা করবে বাজুস।
মাঝে মধ্যেই বিদেশ ফেরত ও সীমান্ত এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ সোনার বারসহ পাচারকারীদের আটক করছে কাস্টমস গোয়েন্দা, বিজিবি, বিমানবন্দর থানা পুলিশ। চলতি বছরের ২২ জুলাই ভারত ও বাংলাদেশের ঘোজাডাঙ্গা-ভোমরা সীমান্তের কাছে গুনারমাথ এলাকা থেকে ৪১ কেজি ৪৯১ গ্রাম সোনা উদ্ধার করেছে ভারতের সীমান্তরক্ষী বাহিনী বিএসএফ। যার আনুমানিক বাজার মূল্য প্রায় ২৫ কোটি টাকা।
গত ২৮ মে সিলেট এমএজি ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে দুবাই থেকে আসা ফ্লাইটের যাত্রী মো. আলী আহমদের কাছ থেকে প্রায় কোটি টাকা মূল্যের সোনার চালান আটক করে। দুদিন আগে গত ২৬ মে ঢাকা বিমানবন্দরে বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের এক কর্মীর কাছ থেকে আট কেজি সোনার বার উদ্ধারের পর তাকে আটক করে ঢাকা কাস্টম হাউজ। ১৮ এপ্রিল দুবাই থেকে ৮ কেজি সোনাসহ ঢাকা বিমানবন্দরের কাস্টমস গোয়েন্দার হাতে আটক হন মোহাম্মদ আরিফ।
চলতি বছরের শুরুর দিকে দুবাই থেকে বিপুল পরিমাণ সোনার বার নিয়ে ঢাকায় ফেরার পথে নেপাল কাস্টমস কর্তৃপক্ষের হাতে আটক হন ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ইমিগ্রেশন শাখার উপ-পরিদর্শক (এসআই) মো. মিরাজুল ইসলাম। নেপাল কাস্টমসকে ৩৩ লাখ রুপি (প্রায় ২৪ লাখ টাকা) জরিমানা দিয়ে ছাড়া পান মিরাজ। মিরাজের সঙ্গে সোনার বহনকারী ছিলেন আরও ৭ জন। যাদের দিয়ে টাকার বিনিময়ে দুবাই থেকে সোনা পাচার করাতেন।
এদিকে সোনা চোরাচালান বড় সংকট ও চ্যালেঞ্জ উল্লেখ করে গত ২ আগস্ট বাংলাদেশ ফাইন্যান্সিয়াল ইন্টেলিজেন্স ইউনিটের প্রধানকে চিঠি দিয়েছেন বাজুস প্রেসিডেন্ট সায়েম সোবহান আনভীর। চিঠিতে বলা হয়েছে বিদ্যমান পরিস্থিতিতে ডলার সংকটের অন্যতম কারণ সোনা চোরাচালান অর্থনৈতিক সংকট বাড়াচ্ছে। চোরাচালান রোধে বিএফআইইউর সঙ্গে একসঙ্গে কাজ করতে চায় বাজুস।
এসব বিষয়ে বাজুস স্ট্যান্ডিং কমিটি অন অ্যান্টি স্মাগলিং অ্যান্ড ল’ এনফোর্সমেন্ট চেয়ারম্যান এনামুল হক খান দোলন গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, বাজুসের সংবাদ সম্মেলনের পর বেশ কয়েকজন চোরাকারবারি গা ঢাকা দিয়েছেন। দেশ ছেড়েছেন কয়েকজন। সরকারের সংস্থাগুলো যদি সোনা চোরাকারবারিদের বিরুদ্ধে অভিযান শুরু করে তাহলে বাংলাদেশ হয়ে চোরাচালান বন্ধ হবে। প্রবাসীদের কষ্টার্জিত অর্থ বৈধ পথে দেশে আসবে। ডলার সরবরাহ বাড়বে।