ডলার ও বিদ্যুতের নিয়ন্ত্রিত লোডশেডিং নিয়ে কিছুদিনের অস্থিরতার পর ফের ঊর্ধ্বমুখী ধারায় ফিরেছে দেশের পুঁজিবাজার পরিস্থিতি। বিদ্যুতে লোডশেডিং পরিস্থিতির উন্নতি না হলেও ডলারের উত্তাপ কিছুটা কমেছে। আর এতেই ইতিবাচক ধারা তৈরি হয়েছে বাজারে। সাইড লাইনে থাকা বিনিয়োগকারীরা ফিরতে শুরু করায় টানা পাঁচ দিন ধরে ধারাবাহিকভাবে বাড়ছে পুঁজিবাজারের সূচক ও লেনদেন।
গতকাল সোমবার প্রধান পুঁজিবাজার ঢাকা স্টক এক্সচেঞ্জে (ডিএসই) লেনদেন এক হাজার ৪৭৭ কোটি ছাড়িয়েছে। এ লেনদেন গত ২৩ জানুয়ারির পর বা গত সাত মাসের সর্বোচ্চ। একই সময়ে ডিএসইর প্রধান মূল্যসূচক ডিএসইএক্স টানা পাঁচ কার্যদিবস ১৫১ পয়েন্ট বেড়ে এক মাস পর ফের ৬৩০০ পয়েন্টের মাইলফলক পার করেছে।
বাজার সংশ্লিষ্টরা জানান, কিছু প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীসহ ব্যক্তিশ্রেণির বড় বিনিয়োগকারীরা নতুন করে বিনিয়োগ শুরু করেছেন। অনেক নিষ্ক্রিয় বিনিয়োগকারী সক্রিয় হচ্ছেন শেয়ার লেনদেনে। এমনকি গত বছরের অক্টোবর থেকে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত যেসব বড় বিনিয়োগকারী শেয়ার বিক্রি করে বিনিয়োগ তুলে নিয়েছিলেন, তারাও এখন লেনদেনে ফিরছেন। এতে করে শেয়ার ক্রয়ে চাপ কিছুটা বাড়ছে, লেনদেনেও গতি তৈরি হয়েছে।
তবে সার্বিকভাবে লেনদেন বাড়লেও বরাবরের মতো অল্প কিছু শেয়ারেই তা সীমাবদ্ধ। অনেক শেয়ার এখনো ফ্লোর প্রাইস বা ফ্লোর প্রাইসের কাছাকাছি দরে কেনাবেচা হচ্ছে এবং শেয়ার কেনাবেচাও তুলনামূলক অনেক কম। তবে ফ্লোর প্রাইস ছেড়ে কিছু শেয়ারের উঠে আসার চেষ্টাও আছে। বিভিন্ন ব্রোকারেজ হাউজ কর্মকর্তারা জানান, এখন ‘আইটেম ধরে’, অর্থাৎ নির্দিষ্ট শেয়ার নিয়ে বড় বিনিয়োগকারীদের আগ্রহ, পুরো বাজার নিয়ে নয়।
এমন পরিস্থিতিতে গতকাল ডিএসইতে কেনাবেচা হওয়া ৩৮০ কোম্পানির শেয়ার ও মিউচুয়াল ফান্ডের মধ্যে ১৬৪টির দর বেড়েছে, কমেছে ১১৬টির এবং অপরিবর্তিত থেকেছে ৯৯টির দর। এ ৯৯টির মধ্যে ৫৯টি ফ্লোর প্রাইসে কেনাবেচা হয়েছে।
গতকাল সূচক বাড়াতে প্রধান ভূমিকা রেখেছে দেশীয় কোম্পানিগুলো। এরমধ্যে বীকন ফার্মা, বেক্সিমকো লিমিটেড, ওরিয়ন ফার্মা, জিপিএইচ ইস্পাত, অলিম্পিক ইন্ডাস্ট্রিজ, বেক্সিমকো ফার্মা, তিতাস গ্যাস, ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স কোম্পানি ডিএসইর প্রধান সূচকটিতে প্রায় ২৭ পয়েন্ট যোগ করেছে।
খাতওয়ারি লেনদেন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, মোট লেনদেনে অংশ কমলেও গত কিছুদিনের মতো গতকালও বস্ত্র খাত ছিল লেনদেনের শীর্ষে। অন্য অধিকাংশ খাতের সার্বিক লেনদেন বাড়লেও বেশি বেড়েছে প্রকৌশল, ওষুধ ও রসায়ন, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতে।
গতকাল বস্ত্র খাতের ৫৮ কোম্পানির ২৫৩ কোটি ৬২ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা ছিল খাতওয়ারি লেনদেনে একক সর্বোচ্চ, যা রবিবারের তুলনায় ৪৮ কোটি টাকা বেশি। এ খাতের অধিকাংশ শেয়ারের কম-বেশি কেনাবেচা হলেও অপেক্ষাকৃত বেশি শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে মালেক স্পিনিং, ফারইস্ট নিটিং, ম্যাকসন্স স্পিনিং এবং কাট্টলী টেক্সটাইলে।
খাতওয়ারি লেনদেনের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ অবস্থানে থাকা বিবিধ খাতে গতকাল ২০৬ কোটি ৫৫ লাখ টাকার শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে, যা আগের দিনের তুলনায় ২১ কোটি ৫০ লাখ টাকা বেশি। তবে মোট লেনদেনে এ খাতের অংশ সাড়ে ৩ শতাংশ কমে ১৪ শতাংশের নিচে নেমেছে। এ খাতের কোম্পানি বেক্সিমকো লিমিটেডে এককভাবে ১২৬ কোটি টাকারও বেশি শেয়ার কেনাবেচা হয়েছে। যেখানে ওষুধ ও রসায়ন খাতের লেনদেন প্রায় ১২ কোটি টাকা বেড়ে প্রায় ১৭৪ কোটি টাকায় উন্নীত হয়েছে এবং মোট লেনদেনে এ খাতের অংশ পৌনে ৩ শতাংশ বেড়ে হয়েছে পৌনে ১২ শতাংশ। একইভাবে খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের লেনদেন আড়াই শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে ১৩৩ কোটি টাকা বা ৯ শতাংশে উন্নীত হয়েছে। এছাড়া বীমা খাতের লেনদেনও ৪৯ কোটি টাকা ২ শতাংশীয় পয়েন্ট বেড়ে প্রায় ৯৯ কোটি টাকা হয়েছে।
শেয়ার কেনাবেচায় মিশ্রধারায় ছিল ব্যাংক, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বীমা খাতের শেয়ার। বস্ত্র, খাদ্য ও আনুষঙ্গিক খাতের দর বৃদ্ধি পাওয়া ও দর হারানো শেয়ার সংখ্যা ছিল প্রায় সমান। কিন্তু জ্বালানি ও বিদ্যুৎ, ওষুধ ও রসায়ন, সিমেন্ট, সিরামিক, কাগজ ও ছাপাখানা, ভ্রমণ ও অবকাশ এবং বিবিধ খাতের বেশিরভাগ শেয়ারের দাম বেড়েছে। এরমধ্যে সবচেয়ে বেশি বেড়েছে সিরামিক, কাগজ ও প্রকাশনা খাতের। গতকাল সিমেন্ট, তথ্য-প্রযুক্তি, খাদ্য অনুষঙ্গ ও পাট খাতের বেশিরভাগ শেয়ার দর হারিয়েছে।
গতকাল ৫ থেকে ১০ শতাংশ পর্যন্ত দর বেড়েছে মোট ১১ কোম্পানির শেয়ারের। এর মধ্যে সার্কিট ব্রেকার নির্ধারিত সর্বোচ্চ দর বা এর কাছাকাছি মূল্যে কেনাবেচা হয়েছে ফারইস্ট লাইফ ইন্স্যুরেন্স, ওরিয়ন ইনফিউশনস, সমতা লেদার, মেট্রো স্পিনিং, ইউনিয়ন ক্যাপিটাল এবং ফারইস্ট নিটিং অ্যান্ড ডাইং কোম্পানির শেয়ার।