পুলিশ হেফাজতে মারা যাওয়া সুমন শেখ ওরফে রুম্মনের (২৭) স্ত্রী জান্নাত খাতুন যখন স্বামীর মৃত্যুর বিচার দাবিতে আদালতের বারান্দায় দৌড়ঝাঁপ করছেন, তখন ছেলের মরদেহ বুঝে নিয়েছেন বাবা পিয়ার আলী। রাজধানীর পশ্চিম রামপুরায় জানাজা শেষে মরদেহ আজিমপুর কবরস্থানে নেওয়া হয়। কিন্তু এর কিছুই জানতেন না জান্নাত। পরে খবর পেয়ে যখন কবরস্থানে পৌঁছান, তখন দাফন প্রায় শেষ।
গতকাল সোমবার বেলা আড়াইটার দিকে রুম্মনের মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের হিমঘর থেকে বুঝে নেন তার বাবা ও ভাই। বিকেলে রুম্মনের স্ত্রী জান্নাতকে ফোন করলে সেটি রিসিভ করেন তার বড় ভাই মোশাররফ। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আদালতে আছি। এখনো মামলা করতে পারি নাই। জান্নাতের অবস্থা ভালো না। সে খুবই অসুস্থ।’
মরদেহ বুঝে পাওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে রুম্মনের স্ত্রীর ভাই মোশাররফ বলেন, ‘এ বিষয়ে আমরা কিছু জানি না। আমাদের অজান্তে কে বা কারা মরদেহ মর্গ থেকে নিয়েছে, জানা নেই।’ পরে রাত ১০টার দিকে তিনি বলেন, ‘আমরা খবর পেয়ে রাতে আজিমপুর কবরস্থানে গিয়ে দেখি মরদেহের দাফন প্রায় সম্পন্ন হয়েছে। শেষবারের মতো স্বামীর মুখটাও দেখতে পারল না জান্নাত।’
স্বজনরা জানান, রুম্মনের স্ত্রী জান্নাত ও তার ভাই আজিমপুর কবরস্থানে গিয়ে মরদেহ হস্তান্তরের বিরোধিতা করে দাফনে বাধা দেন। পরে পুলিশের হস্তক্ষেপে লাশ দাফন করা হয়।
মরদেহ হস্তান্তর নিয়ে অভিযোগের বিষয়ে জানতে চাইলে ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) তেজগাঁও বিভাগের অতিরিক্ত উপকমিশনার (এডিসি) হাফিজ আল ফারুক দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এমন তো হওয়ার কথা না। পরিবারের পক্ষ থেকে লাশ নিয়েছেন সুমনের বাবা।’
ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) এইচ এম আজিমুল হক বলেন, ‘আজ (গতকাল) বেলা আড়াইটার দিকে সুমনের মরদেহ শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের হিমঘর থেকে তার বাবার কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।’
এদিকে গতকাল সকালে জান্নাতের ভাই মোশাররফ দেশ রূপান্তরকে বলেছিলেন, ‘জান্নাত আজকে (গতকাল) শারীরিকভাবে অসুস্থ। মাঝেমধ্যেই সে জ্ঞান হারিয়ে ফেলছে। তার চিকিৎসা শেষে লাশ নেওয়ার বিষয়টি দেখব।’
পুলিশ জানিয়েছে, মরদেহ হস্তান্তরের পর গোসলের জন্য নেওয়া হয় রাজধানীর মোহাম্মদপুরের বাবর রোডের আল মারকাজুলে। পরে পশ্চিম রামপুরায় তার বাবার বাসায় নেওয়া হয় মরদেহ। সেখানে বাদ আসর জানাজা শেষে রাতে আজিমপুর কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে।
পরে রাতে তিনি জানান, রুম্মনের স্ত্রীকে নিয়ে গত দুই দিন চেষ্টা করেও তারা ঢাকা মহানগর হাকিম আদালতে মামলা করতে পারেননি।
গত শুক্রবার এক চুরির মামলায় রুম্মনকে গ্রেপ্তার করে হাতিরঝিল থানা পুলিশ। ওই দিন রাত সাড়ে ৩টার দিকে থানা হাজতে তার মৃত্যু হয়। পুলিশের দাবি, রুম্মন গলায় ফাঁস দিয়ে আত্মহত্যা করেছে। তবে স্ত্রী ও স্বজনদের দাবি, রুম্মনকে
হত্যা করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, মর্গে গেলে পুলিশ শর্ত দেয় মরদেহ গ্রামের বাড়ি নবাবগঞ্জে নিতে হবে। তবে পুলিশ বলছে, পরিবারের এ অভিযোগ সত্য নয়। দিনভর তারা মর্গে বসে থাকলেও কেউ মরদেহ নিতে আসেনি।
পুলিশের ভুল কৌশল : পুলিশের ভাষ্যমতে, শুক্রবার রাত ৩টা ৩২ মিনিটে সুমন ওরফে রুম্মন তার পরনের ট্রাউজার দিয়ে লোহার গ্রিলের সঙ্গে গলায় ফাঁস নেয়। এ বিষয়টি তার পরিবার জানতে পারে শনিবার দুপুরের দিকে। স্বজনদের অভিযোগ, সকালে থানায় গেলেও রুম্মনের মৃত্যুর বিষয়টি তাদের জানানো হয়নি। আদালত থেকে তারা জানতে পেরেছেন।
এদিকে থানা হেফাজতে রুম্মনের মৃত্যুর বিষয়টি দীর্ঘ সময় পর জানানোয় ক্ষুব্ধ হয় স্বজন ও এলাকাবাসী। শনিবার বিকেল থেকে রাত পর্যন্ত হাতিরঝিল থানার সামনে বিক্ষোভ করে তারা। পরদিন রাতেও পশ্চিম রামপুরায় সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ হয়। এ সময় বিক্ষোভকারীদের ওপর ছাত্রলীগের হামলার অভিযোগ ওঠে।
সব মিলিয়ে পুলিশের কিছু ভুল কৌশলে ঘটনাটি বড় হয়ে জনরোষ তৈরি হয় বলে মনে করছেন খোদ পুলিশের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ডিএমপির ডিসি পদমর্যাদার এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে দেশ রূপান্তরকে বলেন, রাতে সুমন ওরফে রুম্মন আত্মহত্যা করার পর দ্রুততম সময়ে তার পরিবারকে বিষয়টি জানানো উচিত ছিল। এ ধরনের ঘটনায় পুলিশকে দোষারোপ করা স্বাভাবিক বিষয়। তবে আত্মহত্যার সময়কার সিসিটিভি ফুটেজ দ্রুত গণমাধ্যমকে দিয়ে দিলে জনরোষের সৃষ্টি হতো না।
তিনি বলেন, থানার হাজতখানায় আসামির আত্মহত্যা নতুন কোনো ঘটনা নয়। অনেকে মানসিক চাপ নিতে না পেরে আত্মহত্যা করে। তবে প্রথম থেকেই যদি থানা পুলিশ সতর্ক হতো, তবে ঘটনা বেশি বড় হতে পারত না।
সুমনের নাম বিভ্রাট : সুমন শেখের প্রকৃত নাম রুম্মন শেখ বলে জানিয়েছেন তার বাবা পিয়ার আলী। তিনি দেশ রূপান্তরকে বলেন, সুমন শেখ তার বড় ছেলের নাম। রুম্মনের কোনো এনআইডি না থাকায় সুমনের এনআইডি দিয়ে চাকরি নিয়েছিল। এ জন্য অফিসের সবাই তাকে সুমন বলে জানে।
রুম্মনের বাসা পশ্চিম রামপুরার ওয়াপদা রোডে। স্ত্রী ও সাত বছরের ছেলেকে নিয়ে সেখানে থাকতেন তিনি। পশ্চিম রামপুরার মেসার্স মাসুদ অ্যান্ড ব্রাদার্স নামের একটি প্রতিষ্ঠানের বিপণনকর্মী ছিলেন। ১৩ আগস্ট রাতের কোনো একসময় এই প্রতিষ্ঠানের ৫৩ লাখ ৫২ হাজার ৭২০ টাকা খোয়া যায়। এই চুরির ঘটনায় ১৫ আগস্ট হাতিরঝিল থানায় মামলা করেন প্রতিষ্ঠানটির ডিস্ট্রিবিউশন ম্যানেজার মোসলেম উদ্দিন মাসুম। মামলায় প্রতিষ্ঠানের দুজন ক্যাশিয়ার ও একজন স্টোরকিপারকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। সর্বশেষ গত শুক্রবার দুপুরে সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে পুলিশ গ্রেপ্তার করে সুমনকে। তার কাছ থেকে চুরি হওয়া সাড়ে ৩ লাখ টাকা উদ্ধারের দাবি করেছে পুলিশ।