আওয়ামী লীগ নেতা জাহিদুল ইসলাম টিপু হত্যাকাণ্ডের মূল হোতা বিদেশে আত্মগোপনে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও ফ্রিডম মানিক। এ দুজনের সক্রিয় ভূমিকায় পুরো কিলিং মিশন সম্পন্ন হয়েছে। আলোচিত এ হত্যাকাণ্ডের পর ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখার (ডিবি) তদন্তে এবং বিভিন্ন সময়ে গ্রেপ্তার করা আসামিদের দফায় দফায় জিজ্ঞাসাবাদে পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তদন্তসংশ্লিষ্ট ডিবির মতিঝিল বিভাগের গোয়েন্দা কর্মকর্তারা গতকাল সোমবার দেশ রূপান্তরকে এসব তথ্য জানিয়েছেন।
তারা জানান, টিপু হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থেকে মূল কলকাঠি নেড়েছেন দেশের বাইরে পালিয়ে থাকা শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান ও ফ্রিডম মানিক। তাদের দুজনের নির্দেশেই স্থানীয় সন্ত্রাসী বাহিনীর সদস্যরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। তাদের মধ্যে শুধু জিসান ও মানিক ছাড়া হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত সবাইকে গ্রেপ্তার করে এরই মধ্যে কারাগারে পাঠানো হয়েছে। টিপু হত্যাকাণ্ডের তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাতে ডিবির মতিঝিল বিভাগের উপকমিশনার (ডিসি) মো. রিফাত রহমান শামীম গতকাল দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘এ হত্যাকাণ্ডে পলাতক জিসান ও ফ্রিডম মানিকের সংশ্লিষ্টতার বিষয়ে পুলিশ সদর দপ্তরে প্রতিবেদন পাঠানোর প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। সেই প্রতিবেদনের আলোকে পুলিশ সদর দপ্তরের সংশ্লিষ্ট শাখা সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ করে পলাতক জিসান ও মানিককে আনার চেষ্টা করবে।’
তদন্তসংশ্লিষ্ট একাধিক কর্মকর্তা জানান, আওয়ামী লীগ নেতা টিপু ও কলেজছাত্রী আফনান প্রীতি হত্যাকাণ্ডের ঘটনায় ২২ আসামি গ্রেপ্তার হন। এদের সবাইকে বিভিন্ন সময়ে ব্যাপক জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। অনেক আসামিকে একাধিক দফায় রিমান্ডে নেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি আগ্নেয়াস্ত্র ও একটি মোটরসাইকেল উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার করা এসব আলামতের ফরেনসিক ও ব্যালেস্টিক পরীক্ষার রিপোর্ট হাতে পেলেই আদালতে অভিযোগপত্র (চার্জশিট) দাখিল করা হবে।
গত ২৪ মার্চ রাত ১০টা ২০ মিনিটের দিকে রাজধানীর শাহজাহানপুরের আমতলা এলাকায় আওয়ামী লীগ নেতা টিপু, তার গাড়িচালক মনির হোসেন মুন্না এবং দুই বন্ধু মিরাজ ও আবুল কালাম এজিবি কলোনি কাঁচাবাজারসংলগ্ন গ্র্যান্ড সুলতান রেস্টুরেন্ট থেকে মাইক্রোবাসে বাসায় ফেরার পথে সন্ত্রাসী হামলার শিকার হন। এ সময় মাইক্রোবাসে থাকা টিপু ও পাশেই রিকশায় থাকা কলেজছাত্রী আফনান প্রীতি গুলিবিদ্ধ হয়ে ঘটনাস্থলেই মারা যান। এ ঘটনায় ২৫ মার্চ শাহজাহানপুর থানায় মামলা হয়। এ ঘটনার পর ডিবির একাধিক টিম তদন্তে নামে। প্রাথমিক তদন্তে সুমন শিকদার ওরফে মুসাসহ ছয়-সাতজনের নাম উঠে আসে। পরে তাদের শনাক্ত ও শ্যুটার (গুলিবর্ষণকারী) সম্পর্কে তথ্য পান। তারপর গোপন সংবাদের ভিত্তিতে শ্যুটার মাসুম মোহাম্মদ আকাশকে গ্রেপ্তার করা হয়। তাকে রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদে হত্যাকাণ্ডে অংশ নেওয়ার কথা স্বীকার করেন। পরে আদালতে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। তার জবানীতে শীর্ষ সন্ত্রাসী জিসান, ফ্রিডম মানিক, মুসা ও শামীমের সম্পৃক্ততার তথ্য উঠে আসে।
গোয়েন্দা কর্মকর্তারা জানান, তদন্তের একপর্যায়ে র্যাব সন্দেহভাজন হিসেবে মো. নাসির উদ্দীন ওরফে কিলার নাসির (৩৮), মো. ওমর ফারুক (৫২), মোরশেদুল আলম ওরফে কাইল্যা পলাশ (৫১) ও আবু সালেহ শিকদার ওরফে শ্যুটার সালেহকে গ্রেপ্তার করে। তাদের একাধিকবার রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করলে তারাও এ হত্যাকাণ্ডে সম্পৃক্ত থাকার কথা স্বীকার করেন। পাশাপাশি তাদের কাছ থেকে তদন্তে সহায়ক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পান ডিবির কর্মকর্তারা। এছাড়া গ্রেপ্তার হওয়া শ্যুটার আকাশের কাছ থেকেও গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পায় ডিবি। তাদের দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে আবুল হোসেন মোহাম্মদ আরফান উল্লাহ ইমাম খান ওরফে দামালকে (৪৯) বিদেশি রিভলবারসহ গ্রেপ্তার করা হয়।
মোবাইল থেকে মুছে ফেলা তথ্য উদ্ধার : ডিবির কর্মকর্তারা জানান, টিপু হত্যার আগে গ্রেপ্তার আসামিরা যেসব কথা বলেছেন ও বার্তা আদান-প্রদান করেছেনÑ সেসব তথ্য-প্রমাণ তাদের মোবাইল ফোন থেকে মুছে ফেলেন। পরে তাদের মোবাইল ফোন পরীক্ষার মাধ্যমে মুছে ফেলা সব তথ্য উদ্ধার করা হয় পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ বা সিআইডির ফরেনসিক বিভাগের সহায়তায়। এরপর সিআইডির রিপোর্টের তথ্য ডিবির তদন্তে পাওয়া তথ্যের সঙ্গে পুরোপুরি মিলে যায়। এরপরই সন্দেহভাজন আসামি হিসেবে মো. নাসির উদ্দিন ওরফে মানিক (৪৭) ও মোহাম্মদ মারুফ খানকে (২৮) গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। পরবর্তী সময়ে মানিক নিজেকে জড়িয়ে ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেন। এরপর গ্রেপ্তার হন মশিউর রহমান ওরফে ইকরাম (৩৬)। পরে মুসার ভাগ্নে ইয়াসির আরাফাত সৈকত (৩৩), মুসার ভাতিজা সেকান্দার সিকদার ওরফে আকাশকে (২৬) গ্রেপ্তার করে রিমান্ডে নেওয়া হয়। তাদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য নিয়ে মো. হাফিজুল ইসলাম ওরফে হাফিজ (৫০) নামে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়।
গোপন বৈঠকে জিসান ও মানিকের সঙ্গে ফোন কনফারেন্স : সুমন সিকদার ওরফে মুসা ১৬৪ ধারায় আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে উল্লেখ করেন, হত্যাকাণ্ডের পরিকল্পনার জন্য একাধিক স্থানে তাদের বৈঠক হয়। ওইসব বৈঠকে আসামি সোহেল শাহরিয়ার তার ব্যবহার করা মোবাইল ফোনের সহায়তায় জিসানকে কল করে ফ্রিডম মানিককে কনফারেন্সে নিয়ে বৈঠকে উপস্থিত লোকজনের সঙ্গে টিপুকে হত্যার বিষয়ে শলাপরামর্শ করেন। এসব তথ্য সিআইডির পরীক্ষায় উদ্ধার করা হয়েছে।
দুই ধরনের অস্ত্র ব্যবহার : ডিবি কর্মকর্তারা জানান, মামলায় জব্দ করা আলামত (ফায়ার্ড কার্তুজ ও বুলেট) পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মতামত সংবলিত প্রতিবেদন দেয় সিআইডি। সেই রিপোর্ট পর্যালোচনা করে ডিবির তদন্তকারী কর্মকর্তারা জানতে পারেন, হত্যাকাণ্ডে দুই ধরনের কার্তুজ ব্যবহার করা হয়েছে। কার্তুজগুলো ভিন্ন দুটি ধরনের অস্ত্র থেকে ছোড়া হয় বলে রিপোর্টে উল্লেখ করা হয়। পরে হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত দুটি বিদেশি পিস্তল, আট রাউন্ড গুলি, তিনটি ম্যাগাজিন এবং হত্যাকাণ্ডে ব্যবহৃত মোটারসাইকেলটি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধার হওয়া অস্ত্র ও গুলির ব্যালিস্টিক পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মতামতসহ প্রতিবেদন সংগ্রহের কাজ চলছে। এ রিপোর্ট পাওয়ার পরপরই আদালতে চার্জশিট দাখিল করা হবে।