হাইকোর্টের নির্দেশনার পরও ১৩৩ কোটি টাকার বেশি দামের সম্পত্তি মাত্র ১৫ কোটি টাকায় নিলামে তোলার ঘটনায় কুষ্টিয়ার ডিসিকে সতর্ক করেছে হাইকোর্ট। এছাড়া তলবের পরও না আসা করোনা আক্রান্ত ওসিসহ চারজনকে ফের আসতে বলা হয়েছে। এ বিষয়ে আদেশ দেওয়ার জন্য আগামী ২৪ অক্টোবর পরবর্তী দিন ঠিক করেছে আদালত। গতকাল সোমবার বিচারপতি আবু তাহের মো. সাইফুর রহমান ও বিচারপতি এ কে এম রবিউল হাসানের সমন্বয়ে গঠিত হাইকোর্টের একটি বেঞ্চ এ আদেশ দেয়।
আদালতে গতকাল রাষ্ট্রপক্ষে শুনানি করেন অ্যাটর্নি জেনারেল এএম আমিন উদ্দিন ও ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল ওয়ারেস আল হারুনী। অন্যদিকে কুষ্টিয়ার ডিসি ও এসপির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মুন্সী মনিরুজ্জামান ও ইউসুফ খান। ব্র্যাক ব্যাংকের এমডির পক্ষে সৈয়দ মিনহাজুল হক এবং রিটকারী ব্যবসায়ী শফিকুলের পক্ষে শুনানি করেন আইনজীবী ব্যারিস্টার রাগীব রউফ চৌধুরী।
শুনানির একপর্যায়ে জেলা প্রশাসকের উদ্দেশে আদালত বলে, ‘আপনাকে আদালতে আসতে হবে না। তবে সতর্ক করছি। সাধারণ জনগণের জন্য আপনাদের দরজা খোলা রাখবেন। দরজা-জানালায় কোনো পর্দা রাখবেন না, যাতে সাধারণ মানুষ সহজেই আপনার কাছে যেতে পারে। অভিজ্ঞতা আছে, ডিসি অফিসে সাধারণ মানুষ যেতে পারে না। দরজা-জানালায় ভারী পর্দা দেওয়া থাকে। যেকোনো মানুষ যাতে আপনার কাছে যেতে পারে, সেজন্য কোনো ভারী পর্দা রাখবেন না।’
‘আপনারা লাক্সারিয়াস জীবনযাপন করেন’Ñ এমন মন্তব্য করে জেলা প্রশাসকের উদ্দেশে আদালত বলে, ‘সাধারণ মানুষের সঙ্গে আপনাদের তেমন যোগাযোগ থাকে না। সব শ্রেণির মানুষ যাতে আপনাকে দেখতে পারে আপনি বসে কাজ করছেন। লুঙ্গি পরা একজন মানুষও যেন প্রয়োজনে আপনার কাছে যেতে পারে। চুরি, ডাকাতি, গু-ামি, দখলবাজি যদি চলেÑ এসব নজরে এলে সঙ্গে সঙ্গে দেখবেন। অভিযোগ শুনে ব্যবস্থা নিতে হবে।’
‘একজন জেলা প্রশাসক সরকারের হার্ট’ উল্লেখ করে আদালত বলে, ‘আপনাদের দায়িত্ব অনেক। আপনাদের কাজের ওপর সরকারের ভাবমূর্তি নির্ভর করে। আপনারা অনেক কাজ করেন, তারপরও সাধারণ মানুষের জন্য আপনাদের দরজা খোলা রাখুন। এ মামলায় অভিযোগকারী আপনার কাছে অভিযোগ নিয়ে গিয়েছিলেন, তবে আপনার কাছ পর্যন্ত যেতে পারেননি। আপনার অফিসের লোকজন অভিযোগ গ্রহণ করেননি। সেদিন যদি আপনি অভিযোগ সম্পর্কে শুনতে পেতেন, তাহলে হয়তো এতদূর আসত না।’
এর আগে গত ১১ আগস্ট আদালত অবমাননার অভিযোগে করা মামলার শুনানিতে পাঁচজনকে তলব করে হাইকোর্ট। তলবের পরিপ্রেক্ষিতে গত রবিবার সকালে সংশ্লিষ্ট থানার ওসি ছাড়া কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপার, ব্র্যাক ব্যাংকের এমডি ও ব্যবসায়ী আবদুর রশিদ আদালতে হাজির হয়েছিলেন। পরে এ বিষয়ে শুনানি হয়। শুনানি নিয়ে আদেশের জন্য গতকাল দিন ধার্য করে হাইকোর্ট।
রবিবার আদালতে হাজির হয়েছিলেন কুষ্টিয়ার জেলা প্রশাসক (ডিসি) মোহাম্মদ সাইদুল ইসলাম, কুষ্টিয়ার পুলিশ সুপার (এসপি) মো. খাইরুল আলম, ব্র্যাক ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা সেলিম আর এফ হোসাইন ও নিলামকৃত সম্পত্তি গ্রহণকারী ব্যবসায়ী রশিদ অ্যাগ্রো ফুড লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. আবদুর রশিদ। তাদের গতকালও আদালতে হাজির থাকতে বলেছিল হাইকোর্ট। তারই ধারাবাহিতকায় গতকাল ডিসিকে ব্যক্তিগত হাজিরা থেকে অব্যাহতি দেয় আদালত। বাকি চারজনকে ২৪ অক্টোবর উপস্থিত থাকতে বলা হয়েছে। সেদিন তাদের উপস্থিতিতে আদেশ দেওয়া হবে।
এর আগে গত ১১ আগস্ট হাইকোর্টের নির্দেশনার পরও ১৩৩ কোটি টাকার বেশি মূল্যের সম্পত্তি মাত্র ১৫ কোটি টাকায় নিলামে তোলায় কুষ্টিয়ার ডিসি-এসপিসহ পাঁচজনকে তলব করেছিল হাইকোর্ট।
গত ২৪ মার্চ ওই সম্পত্তি (প্রতিষ্ঠান) নিলামে তুলতে দুটি পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দেওয়া হয়। ওই নিলামের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে হাইকোর্টে রিট করেন মেসার্স বিশ্বাস ট্রেডার্স, ভিআইপি রাইস মিলস এবং ভিআইপি অটো রাইস মিলস লিমিটেডের স্বত্বাধিকারী মো. শফিকুল ইসলাম। ২ আগস্ট নিলাম স্থগিত করে আদেশ দেয় হাইকোর্ট। এরপরও গত ৫ আগস্ট ব্র্যাক ব্যাংক আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সহযোগিতা নিয়ে রাতে জমি দখল করে নিলাম ক্রয়কারীর সাইনবোর্ড টানিয়ে দেয়।