মজুরি বাড়ানোর দাবিতে সারা দেশেই আন্দোলন অব্যাহত রেখেছেন চা শ্রমিকরা। গত ১৩ আগস্ট থেকে শুরু হওয়া অনির্দিষ্টকালের ধর্মঘট চলেছে গতকাল মঙ্গলবারও। অবশ্য গতকালই বিভিন্ন জায়গায় মতানৈক্য হয়েছে শ্রমিকদের মধ্যে। কোথাও কোথাও প্রশাসনের আশ্বাসে কাজে ফেরার ঘোষণা দিয়েছেন কয়েকটি বাগানের শ্রমিকরা। কোথাও কোথাও নেতাদের সিদ্ধান্ত উপেক্ষা করেই নিজেদের মতো কর্মসূচি ঘোষণা করেছেন শ্রমিকরা। তবে বেশিরভাগ বাগানের শ্রমিকরাই ন্যূনতম ৩০০ টাকা না হলে আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন।
চা শ্রমিকদের এই চলমান আন্দোলনের মধ্যে গত শনিবার রাতে প্রশাসনের মধ্যস্ততায় বাগান মালিক ও শ্রমিকদের মধ্যে বৈঠক হয়। সেই বৈঠকে শ্রমিকদের মজুরি ১২০ টাকা থেকে ১৪৫টাকা করার সিদ্ধান্ত হয়। তাৎক্ষণিকভাবে শ্রমিক নেতারা সেটি মেনে নিয়ে কাজে ফেরার ঘোষণা দেন। তবে কয়েক ঘণ্টা পরেই বিভিন্নস্থানে বিচ্ছিন্নভাবে ফের রাস্তায় নামেন শ্রমিকরা। বিভিন্ন স্থানে সড়কও অবরোধ করেন তারা। তবে রবিবার বিকেলে দাবি মানতে দুই দিনের সময় দিয়ে সড়ক থেকে অপরোধ তুলে নেন তারা। এরমধ্যে সোমবার সিলেট, মৌলভীবাজার ও হবিগঞ্জে চা ম্রমিকদের সঙ্গে দফায় দফায় বৈঠকের চেষ্টা চালায় স্থানীয় প্রসাশন। সেই প্রচেষ্টায় চা শ্রমিকদের মধ্যে তৈরি হয় মতানৈক্য।
দেশ রূপান্তরের নিজস্ব প্রতিবেদক, প্রতিনিধি ও সংবাদদাতাদের পাঠানো তথ্য মতে সিলেট ও হবিগঞ্জের প্রায় সব বাগানের শ্রমিকরাই দাবি আদায় না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন। তবে মৌলভীবাজারের কয়েকটি বাগানের শ্রমিকরা জেলা প্রশাসনের আশ্বাসে আজ থেকে কাজে ফেরার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন।
সিলেটে নেতাদের ভূমিকায় সাধারণ শ্রমিকদের অসন্তোষ:
দৈনিক মজুরি ১২০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ৩০০ টাকা করার দাবিতে চলমান আন্দোলনে চা শ্রমিক ইউনিয়নের শীর্ষ নেতাদের ভূমিকায় ক্ষোভ-অসন্তোষ বিরাজ করছে সাধারণ শ্রমিকদের মধ্যে। শীর্ষ নেতাদের কয়েকজন গত রবিবার শ্রীমঙ্গলে শ্রম অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠকের পর মজুরি ২৫ টাকা বাড়িয়ে ১৪৫ টাকা মেনে নেন এবং কাজে যোগ দেওয়ার কথা বলেন। কিন্তু সাধারণ শ্রমিকরা তা না মেনে আন্দোলন অব্যাহত রাখেন। এর পরদিন মৌলভীবাজারের জেলা প্রশাসকের উদ্যোগে আবার বৈঠক হয়। ওই বৈঠক শেষে আপাতত ১২০ টাকা মজুরিতেই কাজে যোগ দেবেন বলে যৌথ বিবৃতিতে সাক্ষর করেন শ্রমিক নেতারা। পরবর্তীতে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে আলোচনা করে শ্রমিকদের নতুন মজুরি ঘোষণা করা হবে বলে আশ্বাস দেওয়া হয়। কিন্তু এই সিদ্ধান্তও মেনে নেয়নি সাধারণ শ্রমিকরা। তারা বাগানে কাজে যোগ না দিয়ে অবস্থান ধর্মঘট, বিক্ষোভ চালিয়ে যায়। এ পরিস্থিতিতে মঙ্গলবার সিলেট ভ্যালির ২৩টি চা বাগানের পঞ্চায়েত প্রতিনিধিদের সঙ্গে বাংলাদেশ চা শ্রমিক ইউনিয়ন নেতাদের দিনভর আলোচনার পরও কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে কর্মবিরতি প্রত্যাহার না করে চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন চা শ্রমিকরা। গতকাল মঙ্গলবার দুপুরে সিলেট গলফ ক্লাবে সিলেট ভ্যালির ২৩টি বাগানের পঞ্চায়েত নেতাদের সাথে বৈঠকে বসেন শ্রমিক ইউনিয়ন নেতারা। এসময় গলফ ক্লাবের বাইরে অবস্থান নিয়ে শ্রমিকরা বিক্ষোভ করেন। তখন সিলেটের বিভিন্ন চা বাগান থেকে বিক্ষোভ মিছিল নিয়ে শ্রমিকরা গলফ ক্লাবের সামনে এসে অবস্থান করেন। দুই সপ্তাহ ধরে সিলেট ভ্যালির সবকটি চা বাগানে মজুরি বৃদ্ধির দাবিতে চা শ্রমিকরা তাদের কর্মবিরতি পালন করে যাচ্ছেন। এর আগে গত সোমবার সকাল থেকে সিলেট ভ্যালির ২৩টি চা বাগানের মধ্যে ৪টি বাগানে শ্রমিকরা কাজে যোগ দেন। আর ১৯টি বাগানের শ্রমিকরা কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করেন। তবে মঙ্গলবার থেকে আবার ২৩টি বাগানের শ্রমিকরা কাজে না গিয়ে কর্মবিরতি ও বিক্ষোভ করছেন।
হবিগঞ্জে নিস্ফল বৈঠক:
জেলা প্রশাসকের সঙ্গে চা শ্রমিকদের আড়াই ঘন্টা বৈঠকে ধর্মঘট প্রত্যাহারে কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি শ্রমিকরা। তারা বলেছেন ৩০০ টাকা মজুরি না পাওয়া পর্যন্ত তারা কাজে ফিরবেন না। গত সোমবার সোমবার বিকেল ৪টায় হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ইশরাত জাহান ও পুলিশ সুপার এস এম মুরাদ আলী চানপুর চা বাগানে শ্রমিকদের সাথে বৈঠক করেন। ওই দুই কর্মকর্তা কাজে যোগদানের অনুরোধ জানিয়ে বলেন,প্রধানমন্ত্রী ভারতে সফরের পর শ্রমিকদের সাথে কথা বলবেন। তারা আশা করছেন দুর্গাপূজার আগেই তা হবে। জেলা প্রশাসক বলেছেন পূজার আগেই শ্রমিকদের দাবি মেনে না নেয়া হলে তাদের সাথে তিনিও তাদের সাথে থাকবেন। শ্রমিক পঞ্জায়েত নেতাগন জানান, এখন চা পাতা তোলার ভরা মৌসুম। এ মুহুর্তে দাবি পূরন না হলে কিছুদিন পর আমাদেরকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখানো হবে। তারা আরো বলেন, ভিডিও বার্তায় প্রধানমন্ত্রী আমাদেরকে কাজে যোগদানের কথা বললে কালই কাজে যোগ দেব।
কাজে ফিরলেন শ্রীমঙ্গলের দুই বাগানের শ্রমিকরা:
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের আশ্বাসে বিশ্বাস করে কর্মবিরতি ভেঙে মৌলভীবাজার ও শ্রীমঙ্গলের ভাড়াউড়া ও ইস্পাহানি মালিকানাধীন জেরিন চা বাগানে শ্রমিকরা কাজে ফিরেছেন। জেলা প্রশাসন এবং পুলিশের পক্ষ থেকে তাদের পূর্ণ নিরাপত্তার আশ্বাস দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে বিকেলে প্রধানমন্ত্রীর মূখ্য সচিবের সঙ্গে জেলা প্রশসনের ভার্চুয়াল বৈঠকে চা শ্রমিকদের দাবি নিয়ে কথা বলবেন বলেও জানানো হয়েছে।
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসকের এমন আশ্বাসে মঙ্গলবার দুপুর ১টার দিকে কাজে ফিরছেন শ্রমিকরা। তবে এখনো অনেক শ্রমিক কর্মবিরতি পালন করছেন বলে জানা গেছে।
ভাড়াউড়া চা বাগানের পঞ্চায়েত কমিটির সভাপতি নুর মোহাম্মদ বলেন, ‘প্রশাসনের আশ্বাসে আমরা শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাগানে পাঠিয়েছি। এখন থেকে প্রতিদিন শ্রমিকরা কাজ করবে।’
ভাড়াউড়া চা বাগানের শ্রমিক সর্দার জয় নারায়ন হাজরা বলেন, ‘দীর্ঘ কর্মবিরতির কারণে শ্রমিকরা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেকের বাড়িতে খাবার নেই। তাই আমরা আজ থেকে কাজে নেমেছি। ’
এর আগে দুপুর ১২টার পর থেকে ভাড়াউড়া চা বাগানের দুর্গা মন্দির এলাকায় জড়ো হতে থাকেন শ্রমিকরা। পরে সেখানে আসেন জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান ও পুলিশ সুপার মোহাম্মদ জাকারিয়া। তারা শ্রমিকদের সঙ্গে কথা বলে তাদের নিরাপত্তার আশ্বাস দেন।
এ সময় উপস্থিত ছিলেন, বাংলাদেশীয় চা সংসদের সিলেট ব্রাঞ্চের চেয়ারম্যান ও ফিনলে টি কম্পানির ভাড়াউড়া ডিভিশনের মহাব্যবস্থাপক গোলাম মোহাম্মদ শিবলি, শ্রম দপ্তরের উপপরিচালক নাহিদুল ইসলাম প্রমুখ।
মৌলভীবাজার জেলা প্রশাসক মীর নাহিদ আহসান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা আশা রাখছি শ্রমিকরা কাজে ফিরবে। কোন ষড়যন্ত্রই তাদের রুখতে পারবে না। আমরা শ্রমিকদের সব ধরনের নিরাপত্তার বিষয়টি দেখব।’