আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও তা পাচারের দায়ে অভিযুক্ত প্রশান্ত কুমার (পি কে) হালদারের এক সহযোগীর দুই মেয়েকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। গতকাল বুধবার ভোরে রাজধানীর ধানমন্ডি ও শ্যামলী থেকে র্যাব তাদের গ্রেপ্তার করে।
গ্রেপ্তার হওয়া দুজন হলেন পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানির সাবেক পরিচালক খবির উদ্দিনের মেয়ে শারমিন আহমেদ ও তানিয়া আহমেদ। দুজনের পাসপোর্ট গতকাল হাইকোর্টে দাখিল করা হয়েছে।
র্যাবের জিজ্ঞাসাবাদে শারমিন ও তানিয়া জানান, তাদের বাবা খবির উদ্দিন পরিচালক থাকার সময় তার মাধ্যমে পিপলস লিজিং থেকে ঋণ নিয়েছেন বলে জানান। শারমিন ৩১ কোটি ও তানিয়া ৩৩ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে গ্রাহকের অর্থ আত্মসাৎ করেছেন। প্রায় দেড় যুগ ধরে তারা কানাডায় অবস্থান করছেন।
গত ২৮ জুলাই কানাডা থেকে বাংলাদেশে আসেন শারমিন ও তানিয়া। গতকাল গোপনে কানাডার উদ্দেশ্যে তাদের দেশত্যাগের পরিকল্পনা ছিল বলে জানায় র্যাব।
পিপলস লিজিংসহ বেশ কিছু আর্থিক প্রতিষ্ঠান থেকে কয়েক হাজার কোটি টাকা আত্মসাৎ ও পাচারের অভিযোগ রয়েছে পি কে হালদারসহ তার সহযোগীদের বিরুদ্ধে। গত ১৪ মে ভারতে গ্রেপ্তার হন পি কে হালদার।
গতকাল দুপুরে কারওয়ান বাজার র্যাব মিডিয়া সেন্টারে এক সংবাদ সম্মেলনে র্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, পি কে হালদার দেশের আর্থিক খাতের শীর্ষ দখলদার ও খেলাপিদের মধ্যে অন্যতম একজন। ১৯৯৭ সালের ২৪ নভেম্বর আর্থিক প্রতিষ্ঠান হিসেবে পিপলস লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানিকে অনুমোদন দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। পরে নানা অনিয়ম ও আর্থিক দুর্নীতির কারণে ২০১৯ সালে কোম্পানিটির সার্বিক কার্যক্রম বন্ধ ঘোষণা করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। প্রতিষ্ঠানটিতে প্রায় ছয় হাজার আমানত হিসাব রয়েছে। বিভিন্ন প্রাতিষ্ঠানিক আমানতকারীর প্রায় ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকা আটকা পড়েছে। এ টাকার পুরোটাই পিপলস্ ঋণ হিসেবে বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে পাওনা। এ অর্থের একটি বড় অংশ প্রতিষ্ঠানটির পরিচালকরা বিভিন্ন নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেছেন।
র্যাব কর্মকর্তা আরও বলেন, পি কে হালদারের অন্যতম সহযোগী প্রতিষ্ঠানটির পরিচালক খবির উদ্দিন। তিনি প্রতিষ্ঠালগ্ন থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত পরিচালক হিসেবে কর্মরত ছিলেন। এ সময় খবির উদ্দিন ২০০ কোটি টাকা পরিবারের বিভিন্ন সদস্যের নামে-বেনামে ঋণ নিয়ে আত্মসাৎ করেন। পরে ২০১০ সালে বাংলাদেশ ব্যাংকের তদন্তে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে এই পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তিনি বর্তমানে জামিনে রয়েছেন। চলতি বছরের ৭ মার্চ প্রতিষ্ঠানটির ঋণখেলাপিদের আদালতে হাজির হওয়ার নির্দেশ দেয় হাইকোর্ট। আদালতে উপস্থিত না হওয়ায় গত ১৯ এপ্রিল আদালত তাদের গ্রেপ্তার করতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে নির্দেশনা দেয়।
এরই ধারাবাহিকতায় গতকাল ভোরে র্যাব সদর দপ্তরের গোয়েন্দা শাখা ও র্যাব-৩ অভিযান চালিয়ে শারমিন আহমেদ ও তানিয়া আহমেদকে গ্রেপ্তার করে।
গতকাল দুপুরে বিচারপতি মুহাম্মদ খুরশীদ আলম সরকারের একক হাইকোর্ট বেঞ্চে দুই বোনকে হাজির করার পর তাদের আইনজীবী পাসপোর্ট দাখিল করেন। আদালত দুই বোনকে র্যাবের হেফাজতে পাঠানোর আদেশ দেয়। হাইকোর্ট খবির উদ্দিনের পরিবারের অন্য সদস্যদের পাসপোর্ট দাখিল করতে নির্দেশ দেয়। আর যাদের পাসপোর্ট নেই তাদের জাতীয় পরিচয়পত্র দাখিল করতে বলা হয়। এছাড়া খবির উদ্দিনের পরিবারের ১১ সদস্যের কাছে পিপলস্ লিজিংয়ের পাওনা টাকার মধ্যে ঋণের ৫ শতাংশ হারে সমপরিমাণ টাকা আদেশের ৩০ দিনের মধ্যে জমা দিতে বলেছে আদালত।
হাইকোর্টে দুই বোনের পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মো. আবু তালেব। পিপলস্ লিজিং অ্যান্ড ফাইন্যান্স কোম্পানির পক্ষে ছিলেন আইনজীবী মেজবাহুর রহমান চৌধুরী।
ব্যারিস্টার মেজবাহুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘দুজনের পাসপোর্ট জমা দেওয়া হয়েছে। তাদের পরিবারের ১১ জনের কাছে পিপলস্ লিজিংয়ের পাওনা ১৯৬ কোটি টাকা। এই ঋণের ৫ শতাংশ টাকা তাদের জমা দিতে বলেছে হাইকোর্ট। তাদের পরিবারের আরও যে ৯ জন ঋণখেলাপি আছেন তাদের মধ্যে যাদের পাসপোর্ট আছে তা জমা নিয়ে তাদের ছেড়ে দিতে বলেছে আদালত। আর যাদের পাসপোর্ট নেই তাদের হলফনামা আকারে বিষয়টি হাইকোর্টকে অবহিত করতে বলা হয়েছে।’
হাইকোর্টের আদেশের বরাতে অ্যাডভোকেট আবু তালেব দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সুপ্রিম কোর্টের রেজিস্ট্রার জেনারেলের কাছে পাসপোর্ট রক্ষিত থাকবে। ১৯৬ কোটি টাকার ঋণের বিষয়টি সুরাহা না হওয়া পর্যন্ত তাদের পাসপোর্ট জমা থাকবে।’