নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রধান কাজ খাবারে ভেজাল প্রতিরোধের নিয়মকানুন নির্ধারণ ও বাস্তবায়ন করা। বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করাও এই নিয়ন্ত্রক সংস্থার অন্যতম কাজ। অথচ সমন্বয় না করে সেসব সংস্থার কাজের ক্ষমতা নিজেরাই পেতে চায় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ।
সংস্থাটিকে এ ক্ষমতা দেওয়া হলে খাদ্য খাতের ব্যবসায়ীদের একাধিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুসরণ করতে হবে। এতে ব্যবসায়ীরা হয়রানির শিকার হবেন। পাশাপাশি বিরূপ প্রভাব পড়বে দেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানি-বাণিজ্যে।
এ নিয়ে রেষারেষি মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ পর্যন্ত গড়িয়েছে। কিন্তু রেষারেষি নিষ্পত্তি না করেই কর্তৃত্ব লাভের বিধান অন্তর্ভুক্ত করে প্রণয়ন করা খসড়া সংশোধনী আইনের নীতিগত অনুমোদনের জন্য মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে পাঠানো হয়েছে। এ নিয়ে বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে দূরত্ব সৃষ্টি হয়েছে।
আইনটির খসড়া সম্পর্কে জানতে গত রবিবার নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের প্রধান কার্যালয়ে গেলে কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান মো. আবদুল কাইউম সরকার এই প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি। তিনি তার ব্যক্তিগত কর্মকর্তার মাধ্যমে প্রতিবেদককে বিষয়টি নিয়ে কর্তৃপক্ষের সদস্য মঞ্জুর মোর্শেদ আহমেদের সঙ্গে কথা বলার পরামর্শ দেন।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের এক কর্মকর্তা বলেছেন, কর্তৃপক্ষ মূলত চলছে প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণে। তারা কিছুদিনের জন্য সংস্থাটিতে যোগ দিয়ে কাজ রপ্ত করার আগেই বিদায় নেন। সাধারণত সচিব হতে পারছেন না এ ধরনের অতিরিক্ত সচিবদেরই নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান করে পাঠানো হয়। এ পদ থেকেই বেশিরভাগ চেয়ারম্যান অবসরে যান। নতুন কিছু করার আগেই তাদের মেয়াদ ফুরিয়ে যায়। বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আবদুল কাইয়ুম সরকার নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাজে গতি আনতে হিমশিম খাচ্ছেন। গত ৩ জুন নওগাঁর সাপাহার উপজেলায় আয়োজিত এক কর্মশালায় নিজের বক্তব্য শেষ করেছেন বাংলাদেশ জিন্দাবাদ বলে। অথচ সরকার উচ্চ আদালতের নির্দেশে জয় বাংলা বলে বক্তব্য শেষ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষে সদস্য মঞ্জুর মোর্শেদ আহমেদ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা কাজ করতে গিয়ে দেখেছি পুরোপুরিভাবে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে কার্যকর করতে হলে আরও কিছু ক্ষমতা দরকার। আমরা এসব ক্ষমতা চেয়েছি। এগুলো দেওয়ার এখতিয়ার সরকারের।’
খাদ্যে ভেজাল মেশানো বন্ধ করা সরকারের অন্যতম অঙ্গীকার। আর এজন্য ২০০৯ সালে ক্ষমতায় যাওয়ার পরই সরকার ভেজাল নির্মূলে যেসব সংস্থা কাজ করে সেগুলোকে একটি কর্তৃপক্ষের নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয়। বিভিন্ন দেশের খাদ্য নিরাপত্তা কীভাবে নিশ্চিত করা হয় তা পর্যালোচনা করে ২০১৩ সালে পাস করা হয় নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ আইন। এরপর ৯ বছর পার হয়ে গেলেও নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি কার্যকর কোনো ভূমিকা রাখতে ব্যর্থ হয়।
রাজধানীর রমনা এলাকার প্রবাসী কল্যাণ ভবনে কর্তৃপক্ষের কাজ শুরু হলেও বর্তমানে তা সরিয়ে নেওয়া হয়েছে হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালের কম্পাউন্ডে। হোটেলের পাশের একটি ভবনের তিনটি সুপরিসর ফ্লোরে কর্তৃপক্ষের অফিস করা হয়েছে। প্রতি মাসে অফিস ভাড়া দিতে হয় ৩৯ লাখ টাকা। সবগুলো বিভাগীয় শহর এবং জেলায় অফিস করা হলেও প্রতিষ্ঠানটি এখনো বিধিবিধান ঠিক করতেই ব্যস্ত রয়েছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে প্রতিষ্ঠানটির সাবেক একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, সরকার যে উদ্দেশ্য নিয়ে নিয়ন্ত্রক কর্তৃপক্ষটি গঠন করেছিল তা অর্জনে পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। কিছু লোকের চাকরির সংস্থান হয়েছে ঠিকই। কিছু অভিযানও চালানো হয়। কিন্তু সমন্বিত যে অভিযান পরিচালনা করে খাবারে ভেজাল মেশানো বন্ধ করা দরকার ছিল তা হয়নি। প্রশাসন ক্যাডারের বড় কিছু কর্মকর্তা পোস্টিং নিয়ে এখানে আসেন। কিছুদিন পর তারা চলে যান। কর্তৃপক্ষের নিজস্ব কর্মকর্তা যারা, তাদের তেমন কোনো প্রশিক্ষণ হয়নি। একটা প্রবাদ আছে যে, যা হয় না ৯ বছরে তা হয় না ৯০ বছরে। এ সংস্থায় যারা নিবেদিত হয়ে কাজ করেন, বৈরী পরিস্থিতি সৃষ্টি করে তাদের বাধ্য করা হয় চলে যেতে।
জনপ্রশাসন বিশেষজ্ঞ ফিরোজ মিয়া দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আমরা নামেই কর্তৃপক্ষ করছি। কোনো কর্তৃপক্ষকে কি স্বাধীনভাবে কাজ করার এখতিয়ার দিচ্ছি? সব যদি মন্ত্রণালয়ই নিয়ন্ত্রণ করে তাহলে কর্তৃপক্ষ গঠন করে কিছু হবে না।’
প্রস্তাবিত সংশোধনীতে কিছু নতুন বিধান সংযোজন করা হয়েছে। নতুন সংযোজিত একটি বিধান অনুযায়ী নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ থেকে লাইসেন্স বা নিবন্ধন ছাড়া কোনো খাদ্যদ্রব্য উৎপাদন, আমদানি, প্রক্রিয়াকরণ, মজুদ, সংরক্ষণ, সরবরাহ, বিক্রি বা ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না। অথচ বর্তমান আইনে আছে অন্য কোনো আইনের অধীনেও নিবন্ধন বা লাইসেন্স নেওয়া যাবে। বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ড অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশন (বিএসটিআই) এ বিধানটি বাদ দিয়ে বর্তমান বিধান বহাল রাখার সুপারিশ করেছে।
বিএসটিআই আইন অনুযায়ী সংস্থাটি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের উৎপাদন ও বিপণন পর্যায়ের ব্যবসার লাইসেন্স দিচ্ছে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের মোড়কে বিএসটিআইয়ের লোগো ব্যবহার করছে। কাজেই অন্য কোনো প্রতিষ্ঠানকে প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের নিবন্ধন দেওয়ার বিধান অন্তর্ভুক্ত করা ঠিক হবে না। অন্যদিকে অ্যালোকেশন অব বিজনেস অনুযায়ী খাদ্যপণ্যের অনুকূলে লাইসেন্স দেওয়ার দায়িত্ব বিএসটিআইয়েরই।
নতুন সংযোজিত আরেকটি ধারায় বলা হয়েছে, কোনো ব্যক্তি প্রবিধান দ্বারা নির্ধারিত পদ্ধতিতে নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষের লাইসেন্স ছাড়া কোনো ধরনের খাদ্য-ব্যবসা পরিচালনা করতে পারবে না। এ ধারাও বাদ দেওয়ার কথা বলেছে বিএসটিআই।
তা ছাড়া আরেকটি ধারায় খাদ্যের মান নিশ্চিত করে মোড়কে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের লোগো সংযোজন করার প্রস্তাব করা হয়েছে। বিএসটিআই এ ধারাটিও বাদ দেওয়ার প্রস্তাব করেছে। বিএসটিআই আইন অনুযায়ী স্থানীয়ভাবে উৎপাদিত ও আমদানি করা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের লাইসেন্স ও ছাড়পত্র দেওয়ার এখতিয়ার শুধু সংস্থাটিরই। নতুন ধারা সংযোজন করা হলে নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের লাইসেন্স ছাড়া কোনো খাদ্য-ব্যবসা পরিচালনা করা যাবে না। প্রস্তাবিত ধারাটি বিএসটিআই আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক।
নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষকে চিঠি দিয়ে বিএসটিআই জানিয়েছে, ‘বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউট আইন, ২০১৮’ অনুযায়ী সংস্থাটি প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের অনুকূলে লাইসেন্স দিচ্ছে। লাইসেন্সপ্রাপ্ত প্রতিষ্ঠান তাদের পণ্যের মোড়কে বিএসটিআইয়ের লোগো ব্যবহার করছে। কাজেই অন্য কোনো সংস্থা প্রক্রিয়াজাত খাদ্যপণ্যের লোগো সংযোজনের আদেশ জারি করলে তা বিএসটিআই আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক হবে।
অন্যদিকে বিএসটিআইয়ের ‘ওজন ও পরিমাপ মানদণ্ড আইন, ২০১৮’-এর অধীনে প্রণীত ‘পণ্য মোড়কজাতকরণ বিধিমালা, ২০২১’ অনুযায়ী বিএসটিআইতে নিবন্ধিত খাদ্যসহ সব মোড়কজাত পণ্যের লোগো ব্যবহার করা বাধ্যতামূলক।
কাজেই বিএসটিআই আইন অনুযায়ী অন্য কোনো কর্তৃপক্ষ খাদ্যপণ্যের মোড়কে মানদণ্ডের লোগো সংযোজনের আদেশ জারি করতে পারে না। একই প্রতিষ্ঠানকে একাধিক কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা অনুযায়ী মানদণ্ডের লোগো সংযোজন করতে হলে ব্যবসায়ীরা হয়রানি ও বিভ্রান্তির শিকার হবেন বলে মনে করে শিল্প মন্ত্রণালয়। এটা হলে দেশের শিল্পায়ন ও রপ্তানি-বাণিজ্যে বিরূপ প্রভাব পড়বে বলেও মনে করে মন্ত্রণালয়।
খসড়া আইনের সংশোধনী প্রস্তাবের ওপর গত ১৩ এপ্রিল আন্তঃমন্ত্রণালয় সভা করে খাদ্য মন্ত্রণালয়। ওই বৈঠকেই মানদণ্ড নির্ধারণ, লাইসেন্স ইস্যু, নিবন্ধন ও লোগো ব্যবহারের বিধান প্রস্তাবিত সংশোধনী থেকে বাদ দেওয়ার অনুরোধ জানান বিএসটিআইয়ের মহাপরিচালক মো. নজরুল আনোয়ার। ওই সভায় তাকে লিখিত মতামত পাঠানোর অনুরোধ করা হয়। এর পাঁচ দিন পরই তিনি লিখিত মতামত পাঠিয়ে এসব বিধান খসড়া আইন থেকে বাদ দেওয়ার সুপারিশ করেন।
বাংলাদেশ অ্যাক্রেডিটেশন বোর্ডও (বিএবি) প্রস্তাবিত আইনের কয়েকটি ধারা নিয়ে আপত্তি জানায়। এর মধ্যে অন্যতম হচ্ছে খাদ্য পরীক্ষাগার তালিকাভুক্তকরণ ও স্বীকৃতি দেওয়ার বিষয়। প্রস্তাবিত আইন অনুযায়ী নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ খাবারটি নিরাপদ কি না তা যাচাইয়ের জন্য অনুমোদিত পরীক্ষাগার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও তাদের নির্দেশিত (রেফারেল) খাদ্য পরীক্ষাগার তালিকাভুক্তকরণ ও স্বীকৃতি দেবে। কিন্তু বিএবির মত হচ্ছে, অ্যাক্রেডিটেশন সুনির্দিষ্ট আন্তর্জাতিক মানের ভিত্তিতে দেওয়া হয়। তাই অ্যাক্রেডিটেশনপ্রাপ্ত পরীক্ষাগার, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও রেফারেল খাদ্য পরীক্ষাগার বাছাইয়ে আদর্শ নীতিমালা এবং যাচাই পদ্ধতি সুনির্দিষ্ট করার প্রয়োজন রয়েছে।
আন্তঃমন্ত্রণালয় সভায় বাণিজ্য মন্ত্রণালয়ের প্রতিনিধি প্রস্তাবিত আমদানি ও রপ্তানি বিষয়ে আপত্তি তোলেন। তিনি শিল্প মন্ত্রণালয় ও বিএসটিআইয়ের আপত্তির বিষয়ে একমত পোষণ করেন। সভায় উপস্থিত অন্য প্রতিনিধিরাও এসব আপত্তির বিষয়ে একমত হন। সভায় ৩৭টি মন্ত্রণালয় ও বিভাগের প্রতিনিধি অংশ নেন।
শিল্প মন্ত্রণালয় খসড়া আইনের ১৪টি বিধান নিয়ে আপত্তি জানিয়েছে। এর মধ্যে একটি হচ্ছে খাদ্যের গুণগত বিষয় সম্পর্কে সমন্বয় করা। প্রস্তাবিত আইনে কোডেক্স, ইনফোশান, ডব্লিউটিও ও এসটিডিএফের মতো আন্তর্জাতিক সংস্থার কাজ সমন্বয়ের দায়িত্ব নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাছে রাখার প্রস্তাব করেছে। কিন্তু শিল্প মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য হচ্ছে, খাদ্যপণ্যের আন্তর্জাতিক মান সংস্থা কোডেক্স বিএসটিআইকে মান প্রণয়ন ও সংশোধনে কারিগরি সহায়তা দিয়ে আসছে। সংস্থাটি ১৯৭৫ সাল থেকে কোডেক্সের দায়িত্বপ্রাপ্ত সংস্থা (ফোকাল পয়েন্ট) হিসেবে কাজ করছে। বিশ^বাণিজ্য সংস্থার (ডব্লিউটিও) সহযোগী হিসেবে কাজ করছে বিএসটিআই। এসব কারণে আইনের সংশ্লিষ্ট ধারা সংশোধন না করার সুপারিশ করা হয়েছে।
খাদ্য মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘নিরাপদ খাদ্য কর্র্তৃপক্ষের কাজ হচ্ছে বিজ্ঞানভিত্তিক। এখানে আবেগতাড়িত হয়ে কিছু করার সুযোগ নেই। আমরা জানি, ভোক্তাকে খাদ্য ব্যবসায়ীরা ভেজাল খাওয়াচ্ছে। তাকে শাস্তি দিতে হবে। তবে তার আগে তো সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অভিযোগটা প্রমাণ করতে হবে। এ জন্য বিভিন্ন প্রবিধান তৈরি করা হচ্ছে। নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষের কাজ বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে সমন্বয় করা। আর এর জন্য ‘রুল অব দ্য গেম’ (নিয়ম) জানাতে হবে। এখন সংস্থাগুলোর সঙ্গে সহযোগিতার ক্ষেত্র প্রস্তুত করার পালা। তা না করে কর্তৃপক্ষ নিজেই সব দায়িত্ব নিতে চাচ্ছে।