কক্সবাজারের আশ্রয়শিবিরগুলোতে অবস্থানরত রোহিঙ্গারা জাতিসংঘের তত্ত্বাবধানে দ্রুত তাদের জন্মভূমি মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ফিরতে চায়। অল্প অল্প করে নিলে হবে না, একসঙ্গে পুরো একটি গ্রামের বাসিন্দাদের নিয়ে যেতে হবে। রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে দ্বিপক্ষীয় কূটনৈতিক প্রচেষ্টার পাশাপাশি ত্রিপক্ষীয়, বহুপক্ষীয় ও আন্তর্জাতিক প্ল্যাটফর্মে সব চেষ্টাই অব্যাহত রেখেছে বাংলাদেশ। রোহিঙ্গাদের ছোট একটি গ্রুপ হলেও প্রত্যাবাসন শুরু করা নিয়ে আশাবাদী পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এ কে আবদুল মোমেন।
গতকাল বৃহস্পতিবার বাংলাদেশে রোহিঙ্গা ঢলের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে রোহিঙ্গারা মানববন্ধন ও সমাবেশ করে প্রত্যাবাসনের দাবি জানিয়েছে। আর ঢাকায় এক সেমিনারে পররাষ্ট্রমন্ত্রী মোমেন রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন নিয়ে কথা বলেন। এই সেমিনারে জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত নয়েলিন হেইজারও বক্তব্য রাখেন। এদিকে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমার সরকারের ওপর বিভিন্ন দেশের চাপ প্রয়োগ করা প্রয়োজন বলে চাঁদপুর সফরে গিয়ে মন্তব্য করেছেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন।
কক্সবাজার ও উখিয়া প্রতিনিধি জানান, উখিয়া-টেকনাফের ২০টি আশ্রয় শিবিরে ‘গণহত্যা দিবস’ উপলক্ষে আলাদা আলাদা মানববন্ধন ও সমাবেশ কর্মসূচি পালন করে রোহিঙ্গারা। এসব কর্মসূচিতে রোহিঙ্গা নেতারা বলেন, রাখাইনের যে গ্রাম থেকে অস্ত্রের মুখে রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশে ঠেলে দেওয়া হয়েছিল, সেই গ্রামেই তাদের পুনর্বাসন করতে হবে। ফিরিয়ে দিতে হবে নাগরিকত্বসহ রাখাইনে স্বাধীনভাবে চলাফেরার অধিকার। এসব শর্ত না মানলে কোনো রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফিরে যাবে না।
রাখাইন থেকে মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর নিপীড়নের মুখে বাংলাদেশে পালিয়ে আসার পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে এই ‘গণহত্যা দিবস’ পালন করে রোহিঙ্গারা। করোনা মহামারীর কারণে গত দুই বছর রোহিঙ্গারা দিবসটি পালনের অনুমতি পায়নি। তবে এবারের সমাবেশ আয়োজনে বাধা দেয়নি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সকাল ১০টায় শুরু হয়ে প্রায় দুই ঘণ্টা ধরে চলে এসব কর্মসূচি।
‘গো বেক হোম’ প্রতিপাদ্যে আয়োজিত মানববন্ধন ও সমাবেশে নানা দাবি নিয়ে বক্তব্য দেন ক্যাম্প ও ব্লকভিত্তিক কমিউনিটি রোহিঙ্গা নেতারা। এ সময় সেখানে উপস্থিত সাধারণ রোহিঙ্গাদের হাতে ‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’ লেখাসহ বিভিন্ন প্ল্যাকার্ড দেখা যায়।
মিয়ানমার সরকার একাধিকবার রোহিঙ্গাদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছে। তবে ২০১৭ সালের নির্যাতন ছিল সবচেয়ে ভয়াবহ। দিনটি স্মরণ করে উখিয়া ও টেকনাফের রোহিঙ্গা আশ্রয় শিবিরগুলোতে মোনাজাতও হয়।
রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনে আশাবাদী মোমেন : রোহিঙ্গা সংকটের পাঁচ বছর পূর্তি উপলক্ষে রাজধানীর ফরেন সার্ভিস অ্যাকাডেমিতে সেন্টার ফর জেনোসাইড স্টাডিজ ‘রোহিঙ্গা সংকট : প্রত্যাবাসনের উপায়’ শীর্ষক সেমিনারের আয়োজন করে। সেখানে পররাষ্ট্রমন্ত্রী আবদুল মোমেন বলেন, ‘রোহিঙ্গা ইস্যু আমাদের কোনো দ্বিপক্ষীয় বিষয় নয়, এটা মিয়ানমারের অভ্যন্তরীণ বিষয়। তবে মিয়ানমার এখনো পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাকে ফেরত নেয়নি।’
তিনি বলেন, ‘রোহিঙ্গারা মিয়ানমারের ওপর আস্থা রাখতে পারছে না। রোহিঙ্গাদের আস্থা তৈরি করতে আসিয়ান ভূমিকা নিতে পারে। মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছে। আশা করি ছোট গ্রুপ হলেও প্রত্যাবাসন শুরু হবে।’
রোহিঙ্গা সংকটের শুরু মিয়ানমারে এবং এর সমাধানও মিয়ানমারে উল্লেখ করে মোমেন বলেন, ‘বাংলাদেশ রোহিঙ্গাদের ভার বহন করে চলেছে। তবে রোহিঙ্গাদের জন্য নিরাপত্তা ঝুঁকি শুধু বাংলাদেশ নয়, এই অঞ্চলেও পড়বে।’
পররাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ২০১৭ সালে এই নির্যাতিত মানুষদের আশ্রয় দিয়ে বিশ্বকে একটি মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষা করেছিলেন। রোহিঙ্গাদের বসবাসকারী এলাকায় মানবিক সহায়তা প্রদান এবং পরিবেশ ও সামাজিক ভারসাম্যহীনতার পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশ ভার বহন করছে। যদি এ সংকট দ্রুত সমাধান না করা হয়, তবে এটি এই অঞ্চল এবং এর বাইরে নিরাপত্তা সমস্যা তৈরি করতে পারে।’
তিনি বলেন, যত তাড়াতাড়ি সম্ভব তাদের স্বদেশ রাখাইন রাজ্যে নিরাপদ, টেকসই, স্বেচ্ছায় প্রত্যাবাসন শুরু করা সংলাপ এবং আলোচনার মাধ্যমে অগ্রাধিকার হওয়া উচিত। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত উত্তর রাখাইনের মাটিতে একটি নিরাপদ ও অনুকূল পরিস্থিতি তৈরি করা এবং রোহিঙ্গাদের জন্য মিয়ানমারের সমাজে প্রত্যাবাসন ও পুনরেকত্রীকরণের মসৃণ আচরণের দিকে মনোনিবেশ করা। সংঘটিত নৃশংসতার অপরাধীদের জবাবদিহি নিশ্চিত করে প্রত্যাবাসনের জন্য রোহিঙ্গাদের মধ্যে আস্থা তৈরি ও সমর্থনে জোর প্রচেষ্টা অব্যাহত রাখা প্রয়োজন। জাতিসংঘ এবং অংশীদারদের অবশ্যই নিরাপত্তা এবং নিরাপত্তাসহ একটি অনুকূল পরিবেশ তৈরি করতে বাস্তব পদক্ষেপ এবং প্রকল্প গ্রহণ করতে হবে। আসিয়ান এই ক্ষেত্রে প্রধান ভূমিকা নিতে পারে।
রাখাইন রাজ্যে এবং আন্তর্জাতিক উপস্থিতি রোহিঙ্গা এবং মিয়ানমারের মধ্যে আস্থার ঘাটতি কমাতে এবং মসৃণ প্রত্যাবাসনের জন্য প্রয়োজনীয় আত্মবিশ্বাস তৈরিতে সহায়তা করবে।
সেমিনারে পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, ‘পাঁচ বছরে কোনো রোহিঙ্গাকে পাঠানো সম্ভব হয়নি। তাদের ফেরত পাঠাতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা ও সমর্থন চাই। ২০১৭ সালের ২৫ আগস্ট থেকে বাংলাদেশে আশ্রয় নেওয়া শুরু করে রোহিঙ্গারা। এরপর গত পাঁচ বছরে ১১ লাখেরও বেশি রোহিঙ্গা শরণার্থী বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছে।’
জাতিসংঘের মিয়ানমারবিষয়ক বিশেষ দূত নয়েলিন হেইজার বলেন, ‘রোহিঙ্গাদের নিয়ে যেকোনো উদ্যোগে তাদের (রোহিঙ্গাদের) যুক্ত করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে টেকসই সমাধান চায় বাংলাদেশ। তবে আমি শরণার্থীদের সঙ্গে কথা বলেছি। তারা ফিরতে চায়। তবে তাদের এই প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছায়, মর্যাদার ভিত্তিতে। আর সেই পরিস্থিতি মিয়ানমারকেই তৈরি করতে হবে। রোহিঙ্গা সংকটের মূল কারণ খুঁজে বের করতে হবে।’
তিনি বলেন, রোহিঙ্গাদের শিক্ষা ও ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ নিশ্চিত করতে হবে। তাদের জীবনমান নিশ্চিত করাও জরুরি। কেননা তাদেরও অন্যদের মতো ভালোভাবে বেঁচে থাকার অধিকার রয়েছে।
ঢাকায় নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি বলেন, ‘জাপান রোহিঙ্গাদের জন্য মানবিক সহায়তা অব্যাহত রেখেছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাপান সমর্থন করে। রোহিঙ্গাদের দ্রুত ও টেকসই প্রত্যাবাসন চাই।’
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ইমতিয়াজ আহমেদ বলেন, রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে নানা পথ ও উপায় রয়েছে। এসব উপায়ের মধ্যে রয়েছে বহুপক্ষীয় উদ্যোগ, ত্রিপক্ষীয় উদ্যোগ, জবাবদিহি নিশ্চিত করা, নিষেধাজ্ঞা দেওয়া, পৃথককরণ নীতি, ডিকাপলিং পলিসি, অর্থনৈতিক প্রণোদনা ইত্যাদি।
ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের শরণার্থীবিষয়ক আঞ্চলিক সমন্বয়ক ম্যাকেঞ্জি রো বলেন, রোহিঙ্গা সংকটের উৎপত্তি মিয়ানমারে, এর সমাধানও মিয়ানমারে। রোহিঙ্গাদের ওপর যে নিপীড়ন ও নৃশংসতা হয়েছে, তার স্বাধীনভাবে তদন্ত করতে হবে। বাংলাদেশের সঙ্গে রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে কাজ করবে যুক্তরাষ্ট্র।
রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে চাপ বৃদ্ধির তাগিদ ডিকসনের : রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে মিয়ানমার সরকারের ওপর বিভিন্ন দেশের চাপ প্রয়োগ করা প্রয়োজন বলে মন্তব্য করেছেন ব্রিটিশ হাইকমিশনার রবার্ট চ্যাটারটন ডিকসন। গতকাল দুপুরে চাঁদপুর পৌরসভায় শহুরে দরিদ্র জনগোষ্ঠীর জীবনমান উন্নয়ন (ইউএনডিপি) প্রকল্প পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের তিনি এ কথা বলেন বলে জানান চাঁদপুর প্রতিনিধি।
ডিকসন বলেন, ‘আজ রোহিঙ্গা ট্র্যাজেডির পঞ্চম বর্ষপূর্তি। রোহিঙ্গারা অনেক ভাগ্যবান, যখন লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে এসেছিল, তখন এদেশের সরকারের কাছ থেকে অভূতপূর্ণ সহযোগিতা পেয়েছে। রোহিঙ্গাদের রাখাইনে ফেরত পাঠাতে মিয়ানমার সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছে।’
তিনি আরও বলেন, ‘এটি খুব সহজ নয় যে এত তাড়াতাড়ি বিষয়টির সমাধান হবে। এজন্য আমাদের সঙ্গে অন্যান্য দেশের হস্তক্ষেপ প্রয়োজন। রোহিঙ্গারা যদি চায়, তাদের নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে দিতে চাই। আমরা যখনই তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারব, তখনই তাদের দেশে ফেরত পাঠানোর ব্যবস্থা করা হবে। তারা যদি এ দেশেই থাকতে চায় তাহলে স্বেচ্ছাসেবীর মাধ্যমে ক্যাম্পে অবশ্যই তাদের স্বাভাবিক জীবনমান, রোহিঙ্গা শিশুদের লেখাপড়া ও সার্বিক বিষয় নিশ্চিত করা প্রয়োজন।’