রাজনীতি জীবনের সমস্ত দিক ছুঁয়ে যায় বা সবদিকে ছেয়ে আছে, এ কথা মানুন বা না মানুন। রাজনৈতিক আলোচনা এমন একটি আকর্ষণীয় বিষয় যেখানে সবাই অংশগ্রহণ করে। যারা বলতে পছন্দ করেন, আমি বিচার মানব তবে তালগাছটা কিন্তু আমাকেই দিতে হবে; কথাটি এত বহুল প্রচলিত যে তা এখন কোনো নতুন তাৎপর্য বহন করে না। মানুষ ভেবেই নিয়েছে ক্ষমতাসীনদের কাছে বিচার এবং বিবেচনা কোনো গুরুত্ব বহন করে না। আলোচনা তাদের কাছে সময়ক্ষেপণ করার কৌশল আর সিদ্ধান্ত সেটাই হবে, যেটা তারা আগেই ভেবে রেখেছেন। কোনো একটা বিষয়ে সব মতই কি গ্রহণযোগ্য বা সব মত কি অন্তঃসারশূন্য? না। কারণ যারা মত দেন তারা তো কিছু ভেবেই মত দিয়ে থাকেন। তাদের সবকিছুই ভুল বা সবটুকুই গ্রহণ করার মতো এমন তো নাও হতে পারে। ফলে নিজের বা নিজেদের মতের বাইরে আরও কোনো মত থাকতে পারে এবং তাকে বিবেচনা করতে গিয়ে নিজের মতটাকেও পাল্টে ফেলতে হতে পারে এমন মানসিকতা নিয়ে কোনো আলোচনায় বসলে তখন একটা আস্থার পরিবেশ তৈরি হয়। তখন প্রতিপক্ষের মত গৃহীত না হলেও মর্যাদা পায় এবং যে মতটা গৃহীত হলো তার যৌক্তিকতা বেশির ভাগ মানুষ বুঝতে পারে। আলোচনার পরিবেশ বলতে সাধারণত এ রকম পরিবেশকেই বোঝানো হয়ে থাকে।
দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচনের প্রাক্কালে বাংলাদেশ। নির্বাচন বাংলাদেশের জন্মের সঙ্গে যুক্ত। কারণ বাংলাদেশের সশস্ত্র স্বাধীনতা যুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠেছিল ৭০-এর নির্বাচনের পর। এই নির্বাচনের বিজয় যুদ্ধের যৌক্তিকতা প্রতিষ্ঠা করেছিল। সেই অর্থে বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের পটভূমি রচনায় নির্বাচন, গণরায় এবং সেই অনুযায়ী দেশ পরিচালনার আকাক্সক্ষা ওতপ্রোতভাবে যুক্ত। কিন্তু স্বাধীনতার ৫১ বছরেও আমরা একটি সুষ্ঠু, অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে না পারা কি এত দিনের ক্ষমতাসীনদের ব্যর্থতা নয়? এগারোটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের মধ্যে তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য নির্বাচন বলা হয় ১৯৯১, ১৯৯৬-এর জুন, ২০০১ এবং ২০০৮ সালের নির্বাচনকে। এই চারটি নির্বাচনের বৈশিষ্ট্য ছিল এই নির্বাচনকালীন যে সরকার ছিলেন তারা নিজেরা নির্বাচনে অংশ নেয়নি। তারা শুধু নির্বাচন পরিচালনা করেছে। ফলে ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন নিরপেক্ষ হয় না, গ্রহণযোগ্যতাও পায় না।
২০১৪ এবং ২০১৮ সালের নির্বাচনের পটভূমিতে ২০২৩ সালের নির্বাচন খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তাই নির্বাচন কমিশন গঠন এবং তাদের কাজ নিয়েও সন্দেহ ও বিতর্ক আছে প্রচুর। নির্বাচন কমিশনের প্রতি আস্থা স্থাপন করাও খুব গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের কিছু পরস্পরবিরোধী বক্তব্য, সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও বাস্তবায়নের ক্ষেত্রে দুর্বলতা এরই মধ্যে সবাই দেখেছে। ফলে ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ছাড়া বাকি রাজনৈতিক দলসমূহের কাছে কমিশনের মর্যাদা ও ভূমিকার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বলে মনে হয়নি।
এ রকম এক পরিস্থিতিতে জুলাই মাসে ইভিএম নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে মতবিনিময়ের উদ্যোগ নেয় ইসি। এতে আওয়ামী লীগ, জাতীয় পার্টিসহ ২৮টি দল অংশ নিয়েছিল। বাংলাদেশের সমাজতান্ত্রিক দল বাসদ এবং বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি কমিশনের সঙ্গে বসে সময় নষ্ট না করার কথা বলে তাদের মতামত লিখিতভাবে পাঠিয়ে দেয়। বিএনপিসহ ১১টি দল মতবিনিময় সভায় অংশগ্রহণ করেনি। জানা গেছে, আওয়ামী লীগ ও জাতীয় পার্টিসহ বাকি ২৮ দলের সংলাপে সব মিলিয়ে তিন শতাধিক প্রস্তাব আসে ইসির কাছে। সংলাপে অংশ নেওয়া ২৮টি দলের মধ্যে দুটি দল কোনো মতামত দেয়নি, ওয়ার্কার্স পার্টি, জাসদসহ ১২টি দল শর্তসাপেক্ষে ইভিএম ব্যবহারের কথা বলেছে, জাতীয় পার্টিসহ ১০টি দল সরাসরি ইভিএমের বিপক্ষে মত দিয়েছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বাংলাদেশের সাম্যবাদী দল, বিকল্পধারা ও তরিকত ফেডারেশন ইভিএমের পক্ষে মত দিয়েছে। সংলাপে আওয়ামী লীগ ৩০০ আসনে এবং তরিকত ফেডারেশন ১৫০ আসনে ইভিএম ব্যবহারের কথা বলেছিল।
যারা আলোচনায় অংশ নিয়েছে, তাদের মধ্যে ৪টি দল ইভিএমের পক্ষে, ১০টি দল বিপক্ষে, ১২টি দল শর্তসাপেক্ষে এবং ২টি দল ইভিএম নিয়ে কোনো মতামত দেয়নি। অন্যদিকে বিএনপি ও তার জোটের শরিকদের আলোচনায় যায়নি এবং তারা ইভিএম ব্যবহারেরও ঘোরবিরোধী। বাসদ, সিপিবি বলেছে নির্বাচনী ব্যবস্থা এবং নির্বাচনকালীন সরকারের নিরপেক্ষতা ছাড়া সুষ্ঠু নির্বাচন হবে না। যন্ত্র যতই আধুনিক হোক না কেন যন্ত্রের পেছনের মানুষ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইভিএম নিয়ে মতামতের প্রশ্নে দলের সংখ্যা বিবেচনায় ইভিএমের সমর্থনের চেয়ে বিরোধিতাকারীর সংখ্যাই বেশি।
সংলাপের একটি সারসংক্ষেপ তৈরি করে বিভিন্ন বিষয়ে ১০টি প্রস্তাব আমলে নিয়ে ইসি একটি মতামত তৈরি করে। সারসংক্ষেপটি নিবন্ধিত ২৮টি দল, আইন মন্ত্রণালয়, স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়, জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়, প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের পাঠানো হয়েছে।
এরই মধ্যে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী হাবিবুল আউয়াল সংবাদ সম্মেলন করে বলেন, আগামী জাতীয় নির্বাচনে ইলেকট্রনিক ভোটিং মেশিন (ইভিএম) ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে কোন দল কী বলেছে, তা কমিশনের কাছে মুখ্য ছিল না। কীভাবে ভোট করলে সুষ্ঠু হবে, সেটাই মুখ্য বিবেচনায় ছিল। কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘ইভিএমে যাওয়ার একটা বড় সিদ্ধান্ত আমাদের নিজেদের। ভোটটাকে হ্যান্ডল করবে রাজনৈতিক দল নয়, ভোটকে হ্যান্ডল করবে ইসি।’
এই সিদ্ধান্ত কীভাবে বা কোন বিবেচনায় নিলেন সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে সিইসি বলেন, ‘যারা ভোট দিতে আসবেন, সেটা আমাদের মুখ্য বিবেচনায় এসেছে। রাজনৈতিক দলগুলো কে কী বলেছে, সেটা আমাদের মুখ্য বিবেচনায় আসেনি। কিন্তু বক্তব্যগুলো বিবেচনায় নিয়েছি। একই সঙ্গে যেসব ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগে কেন্দ্রে আসেন, তারা যেন আরও ভালোভাবে ভোট দিতে পারেন, তা বিবেচনায় নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা করে এ সিদ্ধান্ত নিয়েছি।’
পাশাপাশি সিইসি কাজী হাবিবুল আউয়াল বলেন, ‘আমাদের পাঁচ মাসের বেশি সময় হয়ে গেল। আমরা ইভিএম নিয়ে চটজলদি কোনো সিদ্ধান্ত নিইনি। প্রথম থেকেই বলেছিলাম পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে, কতটা নির্ভরযোগ্য, পরখ করে দেখার চেষ্টা করেছি। বিভিন্ন দল, টেকনিক্যাল এক্সপার্টদের ডেকেছি, অনেকের মতামত নিয়েছি। এর ওপর নির্ভর করে, কমিশন সব দলের মতামত বিবেচনা করে শেষ পর্যন্ত ১৫০-১৫০ এভাবে ভাগ করে ইভিএম ব্যবহারের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।’
কিন্তু রাজনৈতিক বিতর্ক বাদ দিলেও ইভিএম ব্যবহারে ইসির সক্ষমতা কত সে প্রশ্নের জবাবে নির্বাচন কমিশন সচিব অশোক কুমার জানান, জানান বর্তমানে ইসির হাতে দেড় লাখ ইভিএম রয়েছে। তিনি বলেন, ‘আমাদের কাছে যা ইভিএম রয়েছে তা দিয়ে ৭০-৮০টি আসনে নির্বাচন করা সম্ভব। বাকি আসনগুলোর জন্য নতুন করে যন্ত্র কিনতে হবে ইসিকে। প্রয়োজনে ইভিএম কেনার জন্য নতুন প্রকল্প নেওয়া হবে।’ তার মানে আবার কেনাকাটা? গতবারের কেনাকাটা নিয়ে অর্থাৎ যন্ত্রের মান ও দাম নিয়ে স্বচ্ছতার অভিযোগ ছিল, এবার কী হবে? এই আশঙ্কাও থাকছে।
বিষয়টা গোলমেলে হয়ে গেল না কি? অতীতের মতো আবার বিতর্কের জন্ম দিলেন সিইসি। তার বক্তব্য অনুযায়ী রাজনৈতিক দলগুলোর মতামত মুখ্য নয়, তাহলে প্রশ্ন আসে, রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে সংলাপ করলেন কেন? বলছেন, যারা ভোট দিতে আসবেন তাদের মতটাই মুখ্য। তাহলে ১০ কোটি ৯১ লাখ ভোটারের মধ্যে কতজনের সঙ্গে মতবিনিময় করেছেন ইসি? নির্বাচন কমিশন গঠনের পর শিক্ষাবিদ, সাংবাদিক, নাগরিক ও বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে মতবিনিময় করেছে ইসি। পত্রিকায় যতটুকু খবর এসেছে তাতে তাদের বেশির ভাগই ইভিএম নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছিলেন। তাদের সংশয় দূর করার কি পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে?
ইভিএম নিয়ে আলোচনা চলছে অনেক দিন ধরে। অতীতের কিছু ঘটনা নিশ্চয়ই আমাদের স্মৃতি থেকে হারিয়ে যায়নি। ইভিএম-বিষয়ক কারিগরি উপদেষ্টা কমিটির সভাপতি ছিলেন প্রয়াত অধ্যাপক জামিলুর রেজা চৌধুরী। তিনি কারিগরি ত্রুটির কথা উল্লেখ করে ইভিএম কেনায় সম্মতি দেননি। কারণ এই ইভিএমে ভোটার ভেরিফায়েড পেপার অডিট ট্রেইল নেই। ফলে একবার ফল প্রকাশ হলে তা যাচাইয়ের আর সুযোগ থাকে না। কোনো প্রার্থী যদি ফলাফল চ্যালেঞ্জ করতে চান, নির্বাচন কমিশন তাহলে কীভাবে প্রমাণ করবেন যে ভুল হয়নি? কোনো উপায় নেই। অর্থাৎ ইভিএমকে বিশ্বাস করতে হবে। আর ইভিএমকে বিশ্বাস করতে হলে নির্বাচন কমিশনকে বিশ্বাস করতে হবে। কিন্তু নির্বাচন কমিশনের ওপর আস্থার সংকট না দূর হলে ইভিএম নিয়ে সংশয় কাটবে কীভাবে? ইভিএমে দুটি অংশ থাকে। একটি ভোটার আইডেনটিফিকেশন ইউনিট আর একটি ব্যালট ইউনিট। ফলে ইভিএমে একজন ভোটার আইডেনটিফাই হওয়ার পর অন্য কেউ ব্যালট ইউনিটে চাপ দিয়ে ভোট দেওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এসব আশঙ্কার কথা বলেছেন নাগরিক এবং বিশেষজ্ঞদের অনেকে। রাজনৈতিক দলের কথা বিবেচনায় নিলেন না, সাংবাদিক, নাগরিক, শিক্ষাবিদদের আশঙ্কাকে আমলে নিলেন না, নিজেরা যা ভেবেছেন সেই অনুযায়ী সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। তাহলে কি গ্রামীণ সেই প্রবাদটি নির্বাচন কমিশন মেনে চললেন? আমার কথা আমিই কই, তোরে শুধু জিগায়া লই। মতামতকে না হয় উপেক্ষা করলেন কিন্তু নির্বাচনী পরিবেশ সৃষ্টি এবং ইভিএম ব্যবহার করার ক্ষেত্রে বাস্তবে সক্ষমতার প্রমাণ এবং প্রাতিষ্ঠানিক আয়োজন কি নির্বাচন কমিশনের আছে?॥
লেখক রাজনৈতিক সংগঠক ও কলামিস্ট
Rratan.spb@gmail.com