দক্ষিণ এশিয়ায় মুরগি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান এখন তৃতীয়। গত অর্থবছরে দেশের খামারে উৎপাদিত মুরগির সংখ্যা ছিল ৩৭ কোটি ৫৬ লাখ। আমিষের চাহিদার প্রায় পুরোটাই আসে এই মুরগি থেকে। এই খাতে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রায় ৬০ লাখ লোক যুক্ত রয়েছে। পোলট্রি খাত দেশের কর্মসংস্থান ছাড়াও পুষ্টি নিরাপত্তায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে।
প্রাণিজসম্পদ অধিদপ্তরে তথ্য বলছে, কয়েক বছর ধরে দেশে পোলট্রি খাতের উৎপাদন বাড়ছে। ২০১৬-১৭ অর্থবছরে উৎপাদন ছিল ৩২ কোটি ৯২ লাখ মুরগি। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে ৩৬ কোটি ৫৮ লাখ ৫২ হাজার এবং ২০২১-২২ অর্থবছরে ৩৭ কোটি ৫৬ লাখ ৪৫ হাজারে দাঁড়িয়েছে। মুরগির উৎপাদন বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে দেশে বেড়েছে ডিমের উৎপাদন। ২০২১-২২ অর্থবছরে দেশে ২৩৩৫.৩৫ কোটি পিস ডিম উৎপাদিত হয়েছে। ১০ বছরের মধ্যে এ উৎপাদন বেড়েছে তিন গুণেরও বেশি। বাংলাদেশে বাণিজ্যিকভাবে মুরগির খামার স্থাপন শুরু হয় নব্বইয়ের দশকে। দুই হাজার সালের পর তা ব্যাপকভাবে সম্প্রসারিত হয়েছে। বর্তমানে বাংলাদেশে প্রায় ৭০ হাজারের মতো বাণিজ্যিক ব্রয়লার ও লেয়ার খামার রয়েছে।
উদ্যোক্তাদের হিসাবে, প্রতি মাসে সোয়া ৫ লাখ থেকে সাড়ে ৫ লাখ টন পোলট্রি খাবারের চাহিদা রয়েছে দেশে। চাহিদার শতভাগই আসে দেশি ফিডমিল থেকে। কাঁচামালের দাম বাড়ায় গত এক বছরে প্রাণিজ খাবারে উৎপাদন খরচ প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। চাপ বাড়ছে ডলারের দাম বাড়াতেও। তার পরও বাড়তি বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে লোডশেডিং ও জ্বালানি তেলের অত্যধিক মূল্যবৃদ্ধি।
ব্রিডার অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের তথ্য অনুসারে, দেশে প্রতি সপ্তাহে ১ কোটি ৩০ লাখ ব্রয়লার বাচ্চার চাহিদা রয়েছে, যার পুরোটাই সরবরাহ করেন স্থানীয় হ্যাচারি মালিকরা। ডিম থেকে বাচ্চা তৈরিতে ইনকিউবেটরসহ তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণ কক্ষে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুতের প্রয়োজন হয়। চলমান লোডশেডিংয়ের কারণে ব্রয়লারের বাচ্চা উৎপাদন ব্যাহত হচ্ছে। জেনারেটর চালিয়ে উৎপাদন অব্যাহত রাখা হলেও জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার কারণে বেড়েছে উৎপাদন খরচ। জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার ফলে বাচ্চার উৎপাদন খরচ বেড়েছে ২ থেকে ৩ টাকা। আর শুধু ডিজেল খরচ বেড়ে যাওয়ায় প্রতি পিস ডিমের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে ২৫ থেকে ৫০ পয়সা। উদ্যোক্তাদের হিসাবে, ব্রয়লার মুরগির প্রতি কেজি মাংস উৎপাদনের খরচ ১০ টাকা পর্যন্ত বেড়েছে। এর সঙ্গে পরিবহনসহ অন্য খরচ মিলিয়ে ঢাকার আড়তে এখন ব্রয়লার মুরগির কেজি বিক্রি হচ্ছে ১৬০ টাকা, যা খুচরা বাজারে ১৯০ থেকে ২০০ টাকা দিয়ে কিনতে হচ্ছে ভোক্তাকে। করোনার আগে খামারপর্যায়ে প্রতি কেজি ব্রয়লার মাংস উৎপাদনে খরচ হতো ৯০ থেকে ১০০ টাকা, সম্প্রতি এটি ১৪০ থেকে ১৫০ টাকায় গিয়ে ঠেকেছে। ট্রেডিং করপোরেশন অব বাংলাদেশের বাজার বিশ্লেষণ তথ্য বলছে, এক মাসের ব্যবধানে ব্রয়লার মুরগির দাম কেজিতে ৩৯.২৯ শতাংশ এবং ডিমের দাম হালিতে ২৮.৫ শতাংশ বেড়েছে।
এই বাস্তবতায়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির অজুহাতে সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ডিম, ব্রয়লার ও লেয়ার মুরগির দাম বাড়িয়ে ১৫ দিনের ব্যবধানে ভোক্তা ও ক্ষুদ্র খামারিদের কাছ থেকে লুটে নেওয়া হয়েছে ৫২০ কোটি টাকা। এই সিন্ডিকেটের সঙ্গে জড়িত রয়েছে পোলট্রি খাতের ১০ থেকে ১২টি দেশি-বিদেশি কোম্পানি। সম্প্রতি (২০.৮.২০২২) ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির সাগর-রুনি মিলনায়তনে এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান দেশের ক্ষুদ্র খামারিদের সংগঠন বাংলাদেশ পোলট্রি অ্যাসোসিয়েশনের নেতারা। জানা গেছে, কোম্পানিগুলো গত ১৫ দিনে ডিমের দাম বাড়িয়ে ১১২ কোটি, বাচ্চার দাম বাড়িয়ে ২৩৪ কোটি এবং ব্রয়লার মুরগির দাম বাড়িয়ে লুটে নিয়েছে ১৭২ কোটি টাকা।
সম্প্রতি হঠাৎ করে ব্রয়লার মুরগি ও ডিমের দাম বেড়ে যাওয়ায় কয়েক দিন ধরে ব্যাপক ক্ষোভ সৃষ্টি হয় ভোক্তাদের মধ্যে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অনেকেই ডিম খাওয়া বন্ধ রাখার ঘোষণা দেন। দেশে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিমের দাম বেড়ে যায়। রাজধানী ঢাকাসহ সারা দেশের খুচরা বাজারে প্রতিটি ডিমের দাম হঠাৎ ১০ টাকা থেকে বেড়ে দাঁড়ায় সাড়ে ১২ টাকায়। তবে কয়েক দিনের ব্যবধানে ডিমের দাম আবার কমতে শুরু করে।
খামারিদের কথা, মুরগির খাবার ও ওষুধের দাম বেড়েছে প্রায় দ্বিগুণ। এতে উৎপাদন খরচ বেড়েছে। লোকসানে পড়ে অনেকে খামারে মুরগির সংখ্যা কমিয়ে দিয়েছেন। ফলে চাহিদার তুলনায় ডিমের সরবরাহে ঘাটতি পড়েছে। যদিও জ¦ালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে ডিমের দাম বাড়ার কোনো সম্পর্ক নেই। কিন্তু কয়েকটি সিন্ডিকেটের হাতে পড়ে পোলট্রি খাত এখন ধ্বংসের মুখোমুখি। আগামীতে মধ্যস্বত্বভোগী কোম্পানির হাতে চলে যাবে ডিমের বাজার। তখন ভোক্তা তাদের নির্ধারিত দামেই ডিম কিনতে বাধ্য হবেন।
রাজশাহীর ডিম আড়ত সমিতির সূত্র বলছে, গত ৬ থেকে ৭ মাসে ৫০ কেজি ওজনের প্রতি বস্তা মুরগির খাবারের দাম প্রায় ১ হাজার টাকা বেড়েছে। এরপর থেকে খামারিরা মুরগি বিক্রি করে দিচ্ছেন। তাদের কথা, এই অঞ্চলে প্রায় ১৭ লাখ ডিম পাড়া মুরগি ছিল। এখন তা কমে এসেছে ৮ থেকে ৯ লাখে। বছরখানেক আগে ৭০ হাজার মুরগি ছিল পবা উপজেলার পারিলা গ্রামের এক খামারির। এখন তার মুরগি আছে ২০ থেকে ২৫ হাজার। ওই খামারি আক্ষেপ করে বলেন, ২০১৭ সালে ৩ টাকা ১০ পয়সা করে তাদের ডিম বিক্রি করতে হয়েছিল। তারা রাস্তায় ডিম ভেঙে প্রতিবাদ করেছিলেন। কিন্তু গণমাধ্যমে সেভাবে সংবাদটি আসেনি। অথচ ডিমের দাম ২ টাকা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে হইচই পড়ে গেল সারা দেশে। ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান, প্রশাসন থেকে চাপ ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ডিমবিরোধী প্রচারণা শুরু হয়ে গেল।
দেশে ডিম উৎপাদনের শীর্ষে রয়েছে গাজীপুরের শ্রীপুর। সেখানকার খামারিরাও বলছেন, গত ৬ থেকে ৭ মাসে পোলট্রি খাবারের দাম ৪০ শতাংশের বেশি বেড়েছে। বেড়েছে ওষুধের দাম। বড় শিল্পপতিরা সিন্ডিকেট করে বাজার নিয়ন্ত্রণ করছেন। অন্যদিকে, টাঙ্গাইলের ঘাটাইল উপজেলার একজন প্রান্তিক খামারি বলেন, গত ডিসেম্বরে তার খামারে ১৪ হাজার মুরগি ছিল। ডিম বিক্রি করে লোকসানের কারণে এরই মধ্যে তিনি ১১ হাজার মুরগি বিক্রি করে দিয়েছেন। এখন রয়েছে মাত্র তিন হাজার মুরগি। কিছুদিন আগে সাদা ডিম ১০ টাকা ৬০ পয়সা এবং লাল ডিম ১১ টাকা দরে বিক্রি করেছেন। এতে উৎপাদন খরচও উঠছে না তার।
এই বাস্তবতায়, পোলট্রি খাতে সরকারের তদারকি বাড়ানোর দাবি জানিয়েছেন দেশের ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক খামারিরা। তাদের দাবি, এই খাত এখন কয়েকটি বড় কোম্পানির নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। এ কারণে তারা উৎপাদন খরচের তুলনায় বাজারে ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। ফলে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে ক্ষুদ্র খামারিদের সুরক্ষায় সরকারিভাবে পোলট্রি খাদ্য, ডিম, ব্রয়লার, লেয়ার ও সোনালি মুরগির দাম নির্ধারণ; নিয়মিত বাজার তদারকি এবং সহজ শর্তে ঋণ দিতে হবে।
লেখক : সাবেক মহাব্যবস্থাপক (কৃষি) বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশন
netairoy18@yahoo.com