বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের ইসলাম ধর্মবিষয়ক অনুষ্ঠানের উপস্থাপক মাওলানা নুরুল ইসলাম ফারুকী হত্যাকাণ্ডের মূল পরিকল্পনাকারী একাধিক নেতা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। তাদের ধরতে না পারায় আট বছরেও তদন্ত শেষ করতে পারেনি সংশ্লিষ্ট সংস্থা।
যদিও পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ-সিআইডির কর্মকর্তারা বলছেন, মামলার তদন্তে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি আছে। শিগগিরই এ মামলার অভিযোগপত্র আদালতে দাখিল করা হবে। যদিও তদন্ত প্রতিবেদন দাখিলের জন্য এখন পর্যন্ত ৫৩ বার সময় নিয়েছেন তদন্তকারী কর্মকর্তা।
গতকাল শুক্রবার মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা সিআইডির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার জিসানুল হক দেশ রূপান্তরকে বলেন, গ্রেপ্তার হওয়া একাধিক জঙ্গি সদস্যদের স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে ফারুকী খুনে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশের (জেএমবি) পুরনো ও নব্য অংশের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। কী কারণে হত্যা করেছে সবই জানা গেছে।
তিনি বলেন, বিভিন্ন সময়ে এ হত্যাকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে ১০ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়। তবে ফারুকী খুনের মূল পরিকল্পনাকারী একাধিক জঙ্গি নেতার তথ্য পাওয়া গেলেও তাদের গ্রেপ্তার করা সম্ভব না হওয়ায় তদন্ত প্রতিবেদন জমা দিতে পারিনি।
নিহত নুরুল ইসলাম ফারুকীর বড় ছেলে আহমেদ রেজা ফারুকী দেশ রূপান্তরকে জানান, আট বছরেও তার বাবার খুনে জড়িতদের অধিকাংশই গ্রেপ্তার না হওয়ায় পরিবারের সদস্যরা আতঙ্কের মধ্যে দিন কাটাচ্ছেন।
নুরুল ইসলাম ফারুকী চ্যানেল আইয়ের ধর্মীয় অনুষ্ঠান ‘কাফেলা’ ও ‘শান্তির পথে’ এবং মাই টিভির লাইভ অনুষ্ঠান ‘সত্যের সন্ধান’ উপস্থাপনা করতেন। এছাড়া তিনি আহলে সুন্নাত ওয়াল জামায়াত বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পাদক ছিলেন। ফারুকী সুন্নি মতবাদে বিশ্বাসী ছিলেন। এছাড়া মৃত্যুর আগপর্যন্ত তিনি হাইকোর্ট মাজার মসজিদের খতিব ছিলেন।
২০১৪ সালের ২৭ আগস্ট রাতে রাজধানীর ১৭৪/পূর্ব রাজাবাজারের বাসায় স্ত্রী ও স্বজনদের আটকে রেখে নুরুল ইসলাম ফারুকীকে গলা কেটে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় শেরেবাংলা নগর থানায় হত্যা মামলা করা হয়। প্রথমদিকে মামলার তদন্তভার পায় ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) গোয়েন্দা শাখা (ডিবি)। পরে সিআইডির কাছে তদন্তভার ন্যস্ত করা হয়।
এখন পর্যন্ত গ্রেপ্তার ১০ জন হলো হাদিসুর রহমান সাগর, আবু রায়হান, আবদুল গফ্ফার, মিঠু প্রধান, খোরশেদ আলম, রিয়াজ ওরফে ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজ, তারিকুল ইসলাম ওরফে মিঠু, আবদুল্লাহ আল তাসনিম ওরফে নাহিদ, খালেক ব্যাপারী ও মোজাফ্ফর হোসেন ওরফে সাঈদ। এদের মধ্যে জামিন নিয়ে পালিয়েছে খোরশেদ আলম, রিয়াজ ওরফে ইঞ্জিনিয়ার রিয়াজ, তারিকুল ইসলাম ওরফে মিঠু, খালেক ব্যাপারী ও মোজাফ্ফর হোসেন ওরফে সাঈদ।
তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, হত্যাকাণ্ডের চার বছরের মাথায় ২০১৮ সালের ৩০ মে গ্রেপ্তারদের মধ্যে প্রথম স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দেয় হাদিসুর রহমান সাগর। তার জবানবন্দির মধ্য দিয়েই মূলত এ হত্যা মামলার জট খুলতে শুরু করে। সাগর ছিল হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার মামলার রায়ে ফাঁসির দন্ডপ্রাপ্ত আসামি। তার জবানবন্দিতে ফারুকী হত্যার সঙ্গে জড়িত বেশ কয়েকজন জঙ্গি নেতার তথ্য বেরিয়ে আসে।
আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে সাগর জানায়, ফারুকী হত্যায় জেএমবির দুটি গ্রুপ অংশ নেয়। জেএমবির এক সময়ের ভারপ্রাপ্ত আমির মাওলানা সাঈদুর রহমানের একটি গ্রুপ এবং আবদুর রহমান ওরফে সারওয়ার জাহান মানিক ও ডা. নজরুল ইসলামের আরেকটি গ্রুপ এ হত্যার পরিকল্পনা ও বাস্তবায়নে অংশ নেয়।
সাগর আরও জানায়, হত্যাকান্ডে মূল নেতৃত্বে ছিল আনোয়ার হোসেন ফারুক ওরফে জামাই ফারুক। হত্যার আগে রাজধানী ঢাকার পাশে আশুলিয়ায় একটি বৈঠক করে ফারুকী হত্যার ছক চূড়ান্ত করা হয়।
ইসলাম সম্পর্কে ব্যাখ্যা নিয়ে বিরোধ থেকে এ হত্যাকাণ্ড ঘটায় জঙ্গিরা। হত্যাকারীরা মনে করছিল, ফারুকী বিভিন্ন মাধ্যমে ইসলাম ধর্ম ও আল্লাহ সম্পর্কে ভুল ব্যাখ্যা দিতেন। তাছাড়া আল্লাহ এবং হাদিস সম্পর্কে নতুন নতুন তথ্য দিতেন, যা কোনোভাবেই কোরআন-হাদিস সমর্থন করে না বলে তাদের মত। এজন্য জঙ্গি সংগঠন জেএমবি তার ওপর ক্ষিপ্ত ছিল।
সিআইডির একাধিক কর্মকর্তা জানান, সাগর জেএমবির রাজশাহী অঞ্চলের নেতা ছিল। ফারুকী হত্যাকাণ্ডে ১০ থেকে ১২ জন জড়িত ছিল বলে সে জানিয়েছে।
সিআইডি আরও জানায়, আদালতে দেওয়া জবানবন্দিতে হাদিসুর রহমান সাগর বলে, ফারুকী হত্যায় তাদের দুটি টিমের মধ্যে তাসনিমের নেতৃত্বে একটি টিম ফারুকীর বাসায় ঢুকে হত্যাকাণ্ড চালায়। আরেকটি টিম তার (হাদিসুর রহমান সাগর) নেতৃত্বে ব্যাকআপ হিসেবে বাসার নিচে দাঁড়িয়ে থাকে।
জঙ্গি কর্মকাণ্ড অনুসরণকারী র্যাবের একাধিক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে জানান, ২০১৬ সালের ৮ অক্টোবর র্যাবের অভিযানের মুখে পালাতে গিয়ে নিহত হয় নিষিদ্ধঘোষিত জঙ্গি সংগঠন নব্য জেএমবির সারোয়ার-তামিম গ্রুপের তৎকালীন আমির ফারুকী হত্যাকাণ্ডের অন্যতম সহযোগী সারোয়ার জাহান মানিক। অন্য জঙ্গি জামাই ফারুক ২০১৫ সালে ভারতে গ্রেপ্তার হয়।
যেভাবে খুনের পরিকল্পনা : ফারুকী হত্যাকান্ডের আগের দিন ২০১৪ সালের ২৬ আগস্ট সন্ধ্যায় আশুলিয়ায় একটি বেসরকারি মেডিকেল কলেজের পাশে জেএমবির মানিক, জামাই ফারুক, সাগর, আবদুল্লাহ আল তাসনিম ওরফে নাহিদ, আশফাকসহ অন্তত নয়জন একত্রিত হয়। মূলত দুই জেএমবির দুই গ্রুপের এ জঙ্গিরা সমঝোতার জন্য একত্র হয়েছিল। মানিক ও নজরুল গ্রুপের সদস্য হিসেবে সাগর ঘটনার দিন আবদুল্লাহপুর থেকে আশুলিয়ার বৈঠকে যায়। তবে সমঝোতা আলোচনার বাইরে ওই বৈঠকে ফারুকীকে হত্যার ব্যাপারে আলোচনা হয়।
ফারুকীকে হত্যার ছক চূড়ান্ত করে পরদিন তার ফার্মগেটের বাসায় চলে যেতে বলা হয় সবাইকে। সাগর ছাড়াও তাসনিমের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতেও একই ধরনের তথ্য পাওয়া গেছে।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ফারুকী হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী ছিল জেএমবির ঢাকা অঞ্চলের আমির তাসনিম। তবে হত্যাকান্ডে নেতৃত্ব দেয় জামাই ফারুক।
ফারুকী হত্যা ছাড়াও ২০১৪ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি পুলিশ হত্যা করে ত্রিশালে জঙ্গি ছিনিয়ে নেওয়ার অন্যতম পরিকল্পনাকারী ছিল ফারুক। ২০১৪ সালের শেষের দিকে পুলিশ তাসনিমকে গ্রেপ্তার করে। আর মানিক সাভারে র্যাবের একটি অভিযানে নিহত হয়। এছাড়া হত্যায় জড়িত আশফাক নামে আরেকজন কারাগারে রয়েছে।