বিআইডিএসের গবেষণা

কখনই প্রশিক্ষণ পায়নি ৯২ শতাংশ কর্মী

দেশের শ্রম বাজারের চাহিদা ও জোগানের মধ্যে ব্যাপক দক্ষতার ঘাটতি রয়েছে। মূলত অদক্ষ কর্মী দিয়েই দেশের উৎপাদন ও সেবা খাত চলছে। এমনকি কর্মস্থলেও প্রশিক্ষণ খুবই সীমিত। দেশের উৎপাদন ও সেবা খাতে ৯৩ শতাংশেরও বেশি কর্মী নিজ কর্মস্থলে কখনই প্রশিক্ষণ পাননি। এ তালিকায় শ্রমিক, কেরানি, প্রযুক্তিবিদ থেকে শুরু করে প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকও রয়েছেন। এমনকি দেশের বিভিন্ন পেশার প্রায় ৯২ শতাংশ কর্মী কোনো ধরনের প্রশিক্ষণ ছাড়াই কাজ করে যাচ্ছেন।  

বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (বিআইডিএস) গবেষণায় এসব তথ্য উঠে এসেছে। গতকাল রবিবার ‘লেবার মার্কেট স্টাডিজ ফর এসইআইপি অন স্কিল ডিমান্ড, সাপ্লাই অ্যান্ড মিসম্যাচ’ শীর্ষক গবেষণা প্রতিবেদনটি প্রকাশ করা হয়েছে। রাজধানীর একটি হোটেলে আয়োজিত অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি ছিলেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান। গবেষণায় উঠে এসেছে, পেশাজীবীদের দক্ষতা বিবেচনায় এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তলানিতে, চতুর্থ সর্বনিম্ন। দক্ষতার বিবেচনায় এ উপমহাদেশে বাংলাদেশ থেকে পিছিয়ে শুধুমাত্র পাকিস্তান। ভারত, শ্রীলঙ্কার মতো দেশগুলো দক্ষ শ্রমিক তৈরির দিক থেকে অনেক ওপরে।

বিআইডিএসের গবেষণায় বলা হয়, দেশের শ্রমিকদের মধ্যে কিছু ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণ থাকলেও তা মানসম্মত বা বর্তমান চাহিদাকে পূরণ করে না। বিশেষ করে মধ্যম ও উচ্চ পর্যায়ের কর্মের ক্ষেত্রে এই তফাৎ আরও অনেক বেশি। ফলে পোশাক শিল্পে এদেশ থেকে প্রচুর বৈদেশিক মুদ্রা বিদেশি শ্রমিকদের পেছনে চলে যাচ্ছে। এজন্য শিক্ষা ও প্রশিক্ষণের মানোন্নয়নের বিকল্প নেই। একইসঙ্গে শ্রমিকদের কর্ম সক্ষমতা বৃদ্ধি করতে হবে। আগামী ১০ বছরে দেশের ৫টি নতুন খাতে ব্যাপক কর্মসংস্থানের চাহিদা সৃষ্টি হবে। এর মধ্যে পাট, ফার্নিচার এবং ফার্মাসিউটিক্যালস অন্যতম।

গবেষণা প্রতিষ্ঠানটি জানায়, বিআইডিএস মোট ১৪টি গবেষণা প্রতিবেদন প্রস্তুত করেছে। এর মধ্যে আছে ১০টি খাতভিত্তিক প্রতিবেদন, ম্যাক্রো ফ্রেমওয়ার্ক, ক্রমবর্ধমান প্রশিক্ষণের চাহিদা সংবলিত পাঁচটি অতিরিক্ত খাত শনাক্তকরণ, টিভিইটি এবং আন্তর্জাতিক শ্রমবাজার সম্পর্কে আলোচনা। প্রতিবেদন প্রস্তুতে মোট ২৩ জন অর্থনীতিবিদ কাজ করেছেন। খাতভিত্তিক স্টাডির জন্য মোট ১ হাজার ১৩৮টি প্রতিষ্ঠান এবং ৭ হাজার ১৮ জন শ্রমিকের ওপর গবেষণা করেছে বিআইডিএস।

বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেনের সভাপতিত্বে এ অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথি ছিলেন পরিকল্পনা কমিশনের সদস্য ড. মোহাম্মদ এমদাদ উল্লাহ মিয়ান এবং ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট অথরিটির (এনএসডিএ) নির্বাহী চেয়ারম্যান নাসরিন আফরোজ। আলোচক হিসেবে ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রফেসর ড. সায়মা হক বিদিশা, নির্বাহী প্রকল্প পরিচালক ইখলাসুর রহমান, ওয়ালটন হাইটেক ইন্ডাস্ট্রিজের চিফ ইনোভেশন অফিসার তাপস কুমার মজুমদার প্রমুখ। অনুষ্ঠানে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন বিআইডিএসের সিনিয়র রিসার্স ফেলো ড. কাজী ইকবাল।

মূল প্রবন্ধে ড. কাজী ইকবাল বলেন, গবেষণায় শ্রম বজারে মিসম্যাচ অর্থাৎ যে পরিমাণ দক্ষ শ্রমিক দরকার তা পাওয়া যাচ্ছে না। বিশেষ করে ম্যানেজার ও প্রফেশনালদের মধ্যে এই ঘাটতি সবচেয়ে বেশি। কৃষি প্রক্রিয়াকরণ, তৈরি পোশাক শিল্প এবং লাইট ইঞ্জিনিয়ারিং শিল্পে উচ্চ পর্যায়ে দক্ষ লোকের ব্যাপক ঘাটতি আছে। কোথাও অষ্টম শ্রেণি পাস কর্মীর দরকার হলে দরখাস্ত আসছে মাস্টার্স পাসের। আবার কোথাও বিজ্ঞানের শিক্ষার্থী দরকার হলে সেখানে পাওয়া যাচ্ছে না। কোনো কোনো ক্ষেত্রে আন্ডার কোয়ালিটি গ্যাপ আছে ৭১ শতাংশ। আবার ভার্টিক্যাল মিসম্যাচ বা চাকরি প্রার্থীদের অযোগ্যতা আছে ৮৩ শতাংশ। চাকরিপ্রার্থীরা এসব আবেদন করছেন শুধুমাত্র প্রতিযোগিতায় টিকে থাকার জন্য। তবে নিম্ন পর্যায়ের শ্রমিকদের মধ্যে দক্ষতার ঘাটতি কম। যত ওপরের দিকে ওঠা যায় ততই দক্ষতার ঘাটতি বেশি হচ্ছে। গত এক বছরে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পেয়েছেন ৩ দশমিক ৬ শতাংশ শ্রমিক।

তিনি আরও বলেন, এদেশের শ্রমিকদের মধ্যে কর্মক্ষমতা কম। এক্ষেত্রে সবার ওপরে অবস্থানে সিঙ্গাপুর আর বাংলাদেশের অবস্থান নিচ থেকে চতুর্থ। অর্থাৎ কম্বোডিয়া, ভিয়েতনাম এবং পাকিস্তানের অবস্থান বাংলাদেশের পরে। এছাড়া ভারত, শ্রীলঙ্কা, মঙ্গোলিয়াসহ অনেক দেশই বাংলাদেশের ওপরে অবস্থান করছে।

ড. ইকবাল বলেন, পেশাগত কাজে প্রাতিষ্ঠানিক প্রশিক্ষণ পান মাত্র ৮ দশমিক ২৮ শতাংশ কর্মকর্তা ও শ্রমিক। এমনকি একটি কারিগরি প্রতিষ্ঠানে কাজ করেও ম্যানেজার থেকে শুরু করে শ্রমিক পর্যন্ত ওই প্রতিষ্ঠানের প্রশিক্ষণের বাইরে থাকেন ৯৩ দশমিক ২৩ শতাংশ।

বিআইডিএসের মহাপরিচালক ড. বিনায়ক সেন বলেন, শ্রম বাজারে সঠিক মজুরি প্রশিক্ষণের আকাক্সক্ষাকে বাড়িয়ে দেয়। শ্রম বাজারে মজুরির সঙ্গে প্রশিক্ষণ মেলাতে হবে। আগামী ১০ বছরে শ্রমিকের যে চাহিদা হবে সে অনুযায়ী এখন থেকে ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। এছাড়া বিদেশে শ্রমিকদের আরও দক্ষ করে পাঠাতে হবে। তা না হলে অদক্ষ শ্রমিক দিয়ে টেকসই উন্নয়নে পিছিয়ে পড়বে দেশ।

পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান বলেন, ‘আমি মনে করি সুশাসনের আগে উন্নয়ন জরুরি। কেননা দেশের প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর একটি বড় অংশ দু’বেলা খাবার, বিশুদ্ধ পানি এবং সঠিক বিচার চায়। এগুলো থাকলেই তারা খুশি। এজন্য আগে উন্নয়ন করতে হবে। পাশাপাশি সুশাসনের বিষয়টি নিশ্চিত করা দরকার।’

বিআইডিএসের গবেষণা বলছে, দক্ষ কর্মীর অভাবের কারণে বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চতর পদগুলো যেমন ম্যানেজার এবং পেশাদার পদগুলো দক্ষ জনবল দিয়ে পূরণ করা কঠিন। এতে বুঝা যায়, উচ্চপদে দক্ষ জনবল সৃষ্টি করা কঠিন।

নিম্নস্তরের প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতাসম্পন্ন শিল্পে কম যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী বেশি। বড়  প্রযুক্তিনির্ভর অত্যাধুনিক শিল্পে অত্যধিক শিক্ষাগত যোগ্যতাসম্পন্ন কর্মী বেশি রয়েছে। দেখা যাচ্ছে, বড় শিল্পপ্রতিষ্ঠানগুলো তাদের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি শিক্ষিত কর্মী পাচ্ছে, অন্যদিকে ছোট ফার্মগুলো শিক্ষিত কর্মী পাচ্ছে কম।

এছাড়া, শিক্ষার ক্ষেত্রে অমিল শুধুমাত্র উচ্চ পদের চাকরির ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ। নিয়োগকর্তারা একটি বড় অংশের জন্য শিক্ষার ক্ষেত্র বিবেচনা করেন না। কোনো সুনির্দিষ্ট পছন্দ না থাকাটা কম উৎপাদনশীলতা এবং কম প্রবৃদ্ধির দিকে পরিচালিত করতে পারে।