নরসিংদীতে ৮ জন গুলিবিদ্ধ যশোরে গাড়ি-বাড়িতে হামলা

বিএনপির বিক্ষোভ কর্মসূচিতে চার জেলায় হামলা-সংঘর্ষ ও বাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এক জায়গায় বিএনপির কর্মসূচিতে বাধা দেওয়া এবং অন্য দুই স্থানে পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি দেওয়ায় ১৪৪ ধারা জারি করা হয়। গতকাল রবিবার এসব ঘটনার ঘটে। হামলা-সংঘর্ষে অন্তত ৫২ জন আহত হয়েছে। এর মধ্যে গুলিবিদ্ধ হয়েছে আটজন।

নরসিংদীর মনোহরদীতে বিএনপি, পুলিশ ও আওয়ামী লীগের নেতাদের মধ্যে ত্রিমুখী সংঘর্ষ হয়েছে। এ সময় পুলিশ শতাধিক রাউন্ড গুলি ছোড়ে। এতে আটজন গুলিবিদ্ধ ও সংঘর্ষে আহত হয়েছে আরও ১২ জন। এছাড়া জেলার পুলিশ সুপারসহ ১০ পুলিশ সদস্য আহত হয়েছেন। বিএনপির পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, তাদের ৩৮ নেতাকর্মী আহত হয়েছেন। এর মধ্যে ২৭ জন গুলিবিদ্ধ।

টাঙ্গাইলের কালিহাতী বিএনপির সমাবেশে আওয়ামী লীগ, যুবলীগ ও ছাত্রলীগের হামলায় ১০ জন আহত হয়েছে। মুন্সীগঞ্জের গজারিয়ায় হামলা-সংঘর্ষে আহত হয়েছে ১২ জন। যশোরে বিএনপির বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের ওপর হামলা হয়েছে। তার গাড়ি ভাঙচুর করা হয়েছে। এ ঘটনার পর বাড়িতে গিয়ে আরেক দফা হামলা চালানো হয়। এ হামলার জন্য যুবলীগ ও ছাত্রলীগকে দায়ী করা হয়েছে।

লোডশেডিং, জ¦ালানি তেল ও দ্রব্যমূল্য বৃদ্ধিসহ আরও কয়েকটি ঘটনার প্রতিবাদে বিএনপি তৃণমূল পর্যায়ে ২২ আগস্ট থেকে বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করে আসছে। শুরুর দিন থেকে গত কয়েক দিন ধারাবাহিকভাবে কর্মসূচি ঘিরে হামলা-সংঘর্ষের ঘটনা ঘটছে।

গতকাল দুপুরে নরসিংদীর মনোহরদী উপজেলার হেতেমদী এলাকায় বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে বিএনপি। একই সময় জাতীয় শোক দিবস উপলক্ষে চন্দনবাড়ি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে দোয়া, মিলাদ ও গণভোজের আয়োজন করে ইউনিয়ন আওয়ামী লীগ। দুপুর ১টার দিকে হাফিজপুর গ্রাম থেকে বিএনপির সাবেক সংসদ সদস্য ও উপজেলা বিএনপির আহ্বায়ক সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুলের নেতৃত্বে একটি বিক্ষোভ মিছিল বের হয়। মিছিলটি কিছুদূর এগোলে পুলিশের সঙ্গে তাদের সংঘর্ষ বাধে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ লাঠিচার্জ শুরু করে। পরে রাবার বুলেট ও শটগানের গুলি ছোড়ে পুলিশ। একপর্যায়ে আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা বিএনপি নেতাকর্মীদের সঙ্গে সংঘর্ষে জড়ায়। সংঘর্ষে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাহেব আলী পাঠানসহ ১০ পুলিশ সদস্যসহ কমপক্ষে ৩০ জন আহত হন। তাদের মধ্যে আটজন গুলিবিদ্ধ হয়।

বিএনপি নেতা সরদার সাখাওয়াত হোসেন বকুল অভিযোগ করেন, মিছিল নিয়ে বের হওয়ার পরই পুলিশ অতর্কিত তাদের ওপর হামলা চালায়।

তবে অভিযোগ অস্বীকার করে অতিরিক্ত পুলিশ সুপার সাহেব আলী পাঠান জানান, বিএনপি নেতাকর্মীরা লাঠিসোঁটা ও দা-সহ মিছিল বের করে। তাদের বাধা দিলে তারা পুলিশের ওপর চড়াও হয়। তাদের হামলায় পুলিশের ১০ জন সদস্য আহত হয়েছেন। এ ব্যাপারে থানায় মামলার প্রস্তুতি চলছে।

গুলিবিদ্ধদের মধ্যে আছেন যুবদলের সদস্য সচিব মাসুদুর রহমান সোহাগ, জেলা ছাত্রদলের সদস্য মনিরুজ্জামান ছোটন, ছাত্রদল নেতা মাহবুব ও মনির।

টাঙ্গাইল প্রতিনিধি জানান, কালিহাতী উপজেলা বিএনপির কার্যালয় চত্বরে ও চারানবাজারে বিএনপির বিক্ষোভ সমাবেশ ও মিছিলে হামলার ঘটনা ঘটে।

উপজেলা বিএনপি ও স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, যুবলীগ, ছাত্রলীগ ও স্বেচ্ছাসেবকলীগ কর্মীরা টাঙ্গাইল-ময়মনসিংহ মহাসড়কের কালিহাতী বাসস্ট্যান্ড এলাকায় লাঠিসোঁটা নিয়ে দুই দফা মিছিল করে মহড়া দেয়। তারা চারানের সমাবেশগামী চারটি বাস ও উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সংসদের পুরাতন কার্যালয়ের সামনে একটি বাস ভাঙচুর করে। একপর্যায়ে উপজেলা বিএনপির কার্যালয়ের সামনের সমাবেশস্থলে এসে হামলা চালায়। বিএনপির অভিযোগ, উপজেলা আওয়ামী লীগ সভাপতি মোজাহারুল ইসলাম তালুকদার ঠা-ুর নেতৃত্বে হামলা হয়েছে। এতে তাদের পাঁচজন আহত হয়েছে। তবে মোজাহারুল ইসলাম হামলা-ভাঙচুরের অভিযোগ অস্বীকার করেছেন।

চারানবাজারের সমাবেশ শেষ হওয়ার পর বিক্ষোভ মিছিল বের করে বিএনপি। এ সময় রামদা, রড ও লাঠিসোঁটা নিয়ে তাদের ওপর হামলা চালায় ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা। ভাঙচুর করা হয় তিনটি বাস ও দুটি পিকআপ। হামলায় বিএনপির পাঁচজন আহত হয়। কোকডহরা আওয়ামী লীগ নেতা লুৎফর রহমান খান আরিফসহ ছাত্রলীগ ও যুবলীগের কয়েকজন নেতার নেতৃত্বে হামলা হয় বলে অভিযোগ করেছে বিএনপি।

কালিহাতী সার্কেলের সহকারী পুলিশ সুপার (এএসপি) মো. শরীফুল হক বলেন, ‘বিএনপির সমাবেশে ছাত্রলীগ-যুবলীগ বাধা দিয়েছে কি না তা আমরা দেখিনি। বিএনপির নিজেদের কোনো হামলা হয়েছে কি না তা পরে খতিয়ে দেখা যাবে।’

প্রত্যক্ষদর্শী সূত্রে জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জের গজারিয়া উপজেলার বাউশিয়া ইউনিয়নের পূর্ব নয়াকান্দি গ্রাম থেকে বিএনপির নেতাকর্মীরা মিছিল বের করে। মিছিলটি দাসকান্দি বাজারে গিয়ে শেষ হয়। নেতাকর্মীরা বাড়ি ফেরার সময় দড়ি বাউশিয়া এলাকায় আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীদের হামলার শিকার হয়। দুপক্ষের মধ্যে ধাওয়া-পাল্টাধাওয়া ও ইটপাটকেল নিক্ষেপের ঘটনা ঘটে। আহতদের মধ্যে উপজেলা ছাত্রদলের যুগ্ম আহ্বায়ক মানিক প্রধান সাদ্দামকে উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে চিকিৎসা দেওয়া হয়েছে।

গজারিয়া থানার ওসি রইছ উদ্দিন জানান, খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থলে পৌঁছে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।

গতকাল বিকেল ৪টার দিকে আদালত থেকে ফেরার পথে যশোর শহরের প্রাণকেন্দ্র দড়াটানা এলাকায় বিএনপির খুলনা বিভাগীয় ভারপ্রাপ্ত সাংগঠনিক সম্পাদক অনিন্দ্য ইসলাম অমিতের ওপর হামলা ও গাড়ি ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। বিকেল পৌনে ৫টার দিকে তার বাড়িতে হামলা চালানো হয়। একই সময় তছনছ করা হয়েছে জেলা বিএনপির কার্যালয়। এর আগে শুক্রবার মধ্যরাতে জেলা বিএনপির শীর্ষ চার নেতার বাড়িতে হামলার ঘটনা ঘটে।

যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি তাজুল ইসলাম বলেছেন, আওয়ামী লীগ ও বিএনপির সংঘর্ষ থেকে এ ঘটনা ঘটেছে।

বিএনপি নেতা অনিন্দ্য ইসলাম অমিত জানান, শনিবার রাতে পুলিশ যশোরের বিভিন্ন স্থানে অভিযান চালিয়ে তার দলের ২৮ জন নেতাকর্মীকে আটক করে। গতকাল আদালতে তিনি ওই নেতাকর্মীদের সঙ্গে দেখা করে বাড়িতে ফেরার পথে হামলার শিকার হন। তিনি অভিযোগ করেন, পুলিশ উপস্থিত থাকলেও তারা নিষ্ক্রিয় ছিল।

জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সভাপতি রবিউল ইসলাম জানান, অমিত বাড়ি ফেরার কিছু সময় পর তার বাড়িতে আবার হামলা হয়। হামলাকারীরা দুই রাউন্ড গুলি ছোড়ে।

অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য সাবেক মন্ত্রী তরিকুল ইসলামের ছেলে। তার মা অধ্যাপক নার্গিস বেগম জেলা বিএনপির আহ্বায়ক। হামলাকালে তিনি বাড়িতে ছিলেন।

রবিউল আরও জানান, এর আগে হামলাকারীরা মিছিলসহ জেলা বিএনপি কার্যালয়ে গিয়ে ব্যাপক ভাঙচুর করে। স্বেচ্ছাসেবক দলের এ নেতাসহ একাধিক প্রত্যক্ষদর্শী বলেছেন, যে মিছিল থেকে হামলাগুলো চালানো হয়েছে তার নেতৃত্বে ছিলেন যশোর সদর উপজেলা পরিষদের ভাইস চেয়ারম্যান জেলা ছাত্রলীগের সাবেক সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন বিপুল ও যুবলীগ নেতা যশোর পৌরসভার কাউন্সিলর জাহিদ হোসেন মিলন।

এ বিষয়ে জানতে আনোয়ার হোসেন বিপুলের সঙ্গে মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি বলেন, ‘একটি মিটিংয়ে আছেন, পরে যোগাযোগ করবেন।’ আর ফোন ধরেননি জাহিদ হোসেন মিলন।

এর আগে গত শুক্রবার রাত দেড়টা থেকে আড়াইটা পর্যন্ত যশোর জেলা বিএনপির চার নেতার বাড়িতে হামলা হয়।

ভোলার বোরহানউদ্দিনে বিএনপির ডাকা বিক্ষোভ কর্মসূচিতে যাওয়ার পথে দলীয় নেতাকর্মীদের পুলিশ বাধা দিয়েছে। শহরের যুগীরগোল এলাকায় ভোলা-২ আসনের সাবেক সংসদ সদস্য বিএনপি নেতা হাফিজ ইব্রাহিমসহ দলীয় নেতাকর্মীদের ৮-১০টি গাড়িবহরকে পুলিশ বাধা দেয়। তবে পুলিশ বলছে, বোরহানউদ্দিনে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির আশঙ্কায় তাদের যেতে দেওয়া হয়নি।

সিরাজগঞ্জের শাহজাদপুরে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি পাল্টাপাল্টি বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশ করেছে। এর মধ্যে শাহজাদপুর উপজেলার শ্রীফলতলা গ্রামে শাহজাদপুর উপজেলা বিএনপি বিক্ষোভ সমাবেশের আয়োজন করে। অন্যদিকে বিএনপি-জামায়াতের নৈরাজ্যের প্রতিবাদে শাহজাদপুর উপজেলা আওয়ামী লীগ পৌর শহরে এক বিক্ষোভ মিছিল ও সমাবেশের আয়োজন করে।

বিএনপি এবং আওয়ামী লীগ একই সময়ে একই স্থানে কর্মসূচি ডাকায় ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে গতকাল সকালে ১৪৪ ধারা জারি করে প্রশাসন। বিকেলে দুই দলই সংবাদ সম্মেলন করে নিষেধাজ্ঞার প্রতিবাদ জানায়। পীরগঞ্জ থানার ওসি জাহাঙ্গীর আলম জানান, মুন্সিপাড়া মাইক্রোস্ট্যান্ড এলাকায় দুই দল পাল্টাপাল্টি কর্মসূচি ঘোষণা করায় সংঘাত এড়াতে রাত ৮টা পর্যন্ত মিছিল-সমাবেশের ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শাহরিয়ার নজির।

কক্সবাজারের পেকুয়া উপজেলা সদরে একই স্থানে বিএনপি এবং আওয়ামী লীগের সমাবেশ আহ্বানকে কেন্দ্র করে প্রশাসন ১৪৪ ধারা জারি করে। শনিবার ভোর ৬টা থেকে গতকাল রাত ৯টা পর্যন্ত নিষেধাজ্ঞা দেওয়া হয়। পেকুয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা পূর্বিতা চাকমা এ তথ্য নিশ্চিত করেছেন।

(প্রতিবেদনে তথ্য দিয়েছেন নরসিংদী, মুন্সীগঞ্জ, যশোর, ভোলা, সিরাজগঞ্জ, কক্সবাজার ও ঠাকুরগাঁও প্রতিনিধি)