বিরোধী রাজনীতির বর্তমান ও ভবিষ্যৎ

যারা পাবলিক ল’, পলিসি বা গভর্নেন্স নিয়ে গবেষণা করেন, তারা জানেন যে, একটা রাষ্ট্রে বা আরও পরিষ্কার করে বললে, একটা গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে বিরোধী দল কতটা গুরুত্বপূর্ণ। দেশের গণতন্ত্র, আইনের শাসন, ন্যায়বিচার, প্রায় সবকিছুই নির্ভর করে, বিরোধী দলগুলোর সফল ও যথেষ্ট রাজনৈতিক সক্রিয়তার ওপর। তৃতীয় বিশ্বের রাজনীতিতে সরকার বা সরকারি দলগুলো দলীয় সুবিধাকে প্রাধান্য দিতে গিয়ে অনেক গণতান্ত্রিক মূল্যবোধ নষ্ট করতে চায়। সেটা থেকে সরকারকে পিছু হটতে বাধ্য করে বিরোধী দল। বিরোধী দলগুলোর দায়িত্ব থাকে পিপলস ভয়েস হয়ে কাজ করার। এমনকি, না চাইতেও সরকারেরও অনেক সুবিধা করে দেয় বিরোধী দলগুলো। ক্ষমতাসীন দল জনগুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিতে কোনো ভুল করলে, বিরোধী দল তা শুধরে দেয়। এজন্য, বিরোধী দলকে সরকারের সেফটি-ভাল্ভও ভাবা হয়। তাই তো, সরকার চালানো যত না কঠিন, তার চেয়ে বিরোধী রাজনীতি করা ঢের চ্যালেঞ্জের এবং পরিশ্রমের। রাজনীতিক নন এমন একদল ব্যক্তিকেও যদি আপনি সরকারে বসান, কিছু বড় ক্ষতি করা বাদ দিয়ে, তারা মোটামুটি সরকার চালিয়ে নিয়ে যাবে বিগত সরকারের রুটিন ফলো করে। কিন্তু, বিরোধী শিবির চালানো এত সহজ নয়। কোনো বিশেষ নিয়মকানুন বা ফর্মুলা দিয়ে বিরোধীদলীয় রাজনীতি চালানো সম্ভব হয় না। এখানে লাগে মেধা, বলিষ্ঠ নেতৃত্ব, দূরদর্শিতা, ঝুঁকি নেওয়ার সাহস, ত্যাগী সংগঠকের ভূমিকা আরও কত কি! স্বাধীনতা-পরবর্তীকালে বাংলাদেশের বিরোধীদলীয় রাজনীতি একটা ধুন্ধুমার ক্রান্তিকাল কাটিয়েছিল এরশাদের শাসনামলে। কিন্তু সেই কঠিন রাজনীতির পথও শিথিল হতে বাধ্য হতে হয়েছিল আশির দশকের শেষের দিকে। এরশাদ সরকারের পতন হলো, গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা খানিকটা মুক্তি পেল। এটা সম্ভব হয়েছিল, এরশাদ সরকারের উপলব্ধির কারণে। তারাও বিরোধী রাজনীতিকে তাই তখন স্পেস দিতে বাধ্য হয়েছিল।

ওয়ান-ইলেভেনের আগ পর্যন্ত বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতি খুব একটা ভোগেনি। ভুগেছে, কিন্তু ভেঙে পড়েনি, বর্তমান সময়ের মতো। বর্তমান সময় সাক্ষী হয়ে থাকল, বিরোধীদলীয় রাজনীতির মৃত্যুশয্যার। বিরোধী দলের মধ্যে একটা চমৎকার শ্রেণিভাগ তৈরি হলো। বাংলাদেশ প্রথম দেখল গৃহপালিত বিরোধী দল; আবার দেখল বিপর্যস্ত, বিধ্বস্ত, নেতৃত্বহীন বিরোধী দল। জাতীয় পার্টি হয়ে গেল গৃহপালিত বিরোধী দল; আর মূলস্রোতের বিএনপি, জামায়াত হয়ে থাকল বিধ্বস্ত আর নেতৃত্ব সংকটের রাজনৈতিক সংগঠন। ২০০৭ সালের পর থেকে এ দেশে বিরোধী রাজনীতি খুব একটা চাঙা হতে পারেনি। কারণ, ওই ক্রান্তিকালের পর থেকে বাংলাদেশের রাজনীতি অনেকটাই ক্ষমতা-ক্ষুধার আর প্রতিহিংসার রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে। বিএনপি ও জামায়াতে ইসলামী তাদের অনেক নেতা হারিয়েছে। বাংলাদেশের বিরোধী রাজনীতিক দলগুলো একটা সময় যে চূড়ান্ত পরিণতি দেখত, তার মধ্যে ছিল রাজপথে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত বা রক্তাক্ত হওয়া বা কারাবরণ। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর প্রথম ভাগ থেকে এ দেশের রাজনীতি বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড আর গুমের সংস্কৃতির সঙ্গে ব্যাপক পরিচিত হলো। যার ফলে, অনেক রাজনীতিবিদই রাজপথের রাজনীতি থেকে পিছু হটলেন। সাহসী রাজনীতিবিদরাও রাজপথ ছাড়া শুরু করেন, শুধু ঘরোয়া প্রোগ্রাম আর প্রেস-কনফারেন্সে নিজেদের আবদ্ধ করা শুরু করলেন। কে চান জীবন হারাতে? একবিংশ শতাব্দীতে এসে রাজনৈতিক দলগুলোর কর্মীরা বুঝতে শুরু করলেন, যেকোনো রাজনৈতিক দলই কোনো মৌলিক আদর্শের চর্চা করে না। অর্থাৎ, রাজনীতি দিনে দিনে যে বুর্জোয়া রাজনীতিতে পরিণত হয়েছে, তা স্পষ্ট হওয়া শুরু করল। বিরোধী দলের রাজনীতিক এলিটরা যে

তৃণমূলের কর্মীদের খাটিয়ে নিজেদের সুবিধাগুলো আদায় করতে সরকারের উচ্চমহলের সঙ্গে হরহামেশাই গোপন আঁতাত করে, এটা অনেক ত্যাগী আর আপসহীন বিরোধী কর্মীদের মধ্যে আর গোপন থাকল না। রাজপথের বিরোধী রাজনীতি মূলত করেন তৃণমূল আর মধ্যমসারির নেতাকর্মীরা। দিনের পর দিন, নির্যাতিত এসব নেতাকর্মী নিজেদের জীবন বাজি রেখে তাদের ওপরের সারির নেতাদের মসনদ তৈরি করে দিয়েছেন। দিগভ্রান্ত হয়ে, এমন আদর্শহীন রাজনীতির বলি হতে তৃণমূলের ত্যাগী নেতাকর্মীরা আজ খানিকটা নারাজ। রাজনীতিতে যদি আদর্শই না থাকে, তাহলে সেটা আর রাজনীতি থাকে না। রাজনৈতিক কর্মীদের মধ্যে এই সত্য আজ অনেকটাই অনুভূত।

বহুল প্রচলিত ছিল যে, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় যতটা শক্তিশালী আর পারঙ্গম থাকে, তার চেয়ে বেশি শক্তিশালী আর তৎপর থাকে যখন তারা বিরোধী দলে থাকে। কিন্তু এমন শক্ত ধারণার পরিবর্তন সামনে আসা অসম্ভব নয়। আওয়ামী লীগ যদি ভবিষ্যতে বিরোধী রাজনীতিতে যায়, তাহলে তারা আগের মতো শক্তিশালী থাকবে কি না সন্দেহ! গত প্রায় চৌদ্দ বছর ধরে একচেটিয়া ক্ষমতায় থাকার কারণে, আওয়ামী লীগের মধ্যে হাইব্রিড আর সুবিধাবাদীদের দাপট চূড়ান্ত। আওয়ামী আদর্শ আর বঙ্গবন্ধুর দিকনির্দেশনায় যারা আওয়ামী লীগের রাজনীতি করতেন তারা খানিকটা কোণঠাসা। তাই, এক অপ্রকাশ্য রাজনৈতিক টেনশন খোদ আওয়ামী লীগের মধ্যে বিরাজমান। কিন্তু মনে রাখা দরকার, যারা বিরোধী দলের রাজনীতিতে রাজপথ কাঁপান তারা মূলত ত্যাগী আর আদর্শিক নেতাকর্মীরা। কিন্তু সরকারে থেকেই অনেক অমূল্যায়িত পুরনো, ত্যাগী রাজনীতিক নেতাকর্মীরা দিনের পর দিন বঞ্চিত থাকার কারণে বিরোধীদলীয় রাজনীতিতে আগের মতো আর বিপ্লবী উন্মাদনা দেখাবেন কি না, সেটা নিশ্চিত করে বলা যায় না। অন্যদিকে, সুবিধাবাদী, হাইব্রিডরা, যে ক্ষমতার পালাবদলের সঙ্গে সঙ্গে দল পাল্টাতে দেরি করবেন না, তা মোটামুটি নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব।

একবিংশ শতাব্দীতে রাজনীতিতে এবং রাষ্ট্র পরিচালনায় যে পরিমাণ টেকনোলজির ব্যবহার বৃদ্ধি পেয়েছে, তাতে প্রতিহিংসাপ্রবণ রাজনৈতিক অঙ্গনে, বিরোধীদলীয় রাজনীতি করে টিকে থাকা দুরূহ। বিভিন্ন ধরনের টেকনোলজিক্যাল আইন এবং ডিভাইসের ব্যবহারের কারণে, বিরোধীদলীয় রাজনীতিবিদরা খুব একটা নিরাপদ আর স্বস্তিতে থাকেন না। সারাক্ষণ গ্রেপ্তারের ভয়, নিবর্তনমূলক আটকের ভয়, কথোপকথন রেকর্ডিংয়ের মাধ্যমে মানহানির সংশয় তাদের তাড়া করে বেড়ায়। যেহেতু, ব্যক্তির সঙ্গে, তার পরিবার এবং স্বজনরা জড়িত থাকেন, তাই অনেকেই আজ আর বিরোধী দলে থেকে সক্রিয় রাজনীতি করতে সাহস করেন না। তা ছাড়া, ক্ষমতাসীন দলের সঙ্গে নির্বাহী বিভাগের এমন ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাজনৈতিক জীবনে বিরোধী দলদের আজ আর একটুও স্পেস দিচ্ছে না। বাংলাদেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের দেশে, বিরোধী রাজনীতির অন্ধকারাচ্ছন্ন ভবিষ্যতের আর একটা কারণ অর্থনৈতিক। খেটে খাওয়া দরিদ্র শ্রেণির আর মধ্যবিত্ত ঘরের সন্তানরাই বিরোধী দলের রাজনীতির ময়দান কাঁপাত একসময়। পরিবারের বাবা বা বড় ভাই ছিল কর্মক্ষম, তাই পরিবারের ছোট ছেলেটা রাজনীতির ময়দান কাঁপিয়ে বেড়াত আগে। কিন্তু বাংলাদেশের ব্যাষ্টিক অর্থনীতির ভয়াল দশা, মানুষের জীবন-জীবিকাকে সাংঘাতিক ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে। দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন বৃদ্ধির সঙ্গে তাল মেলাতে পরিবারের প্রায় সব সদস্যকেই কিছু না কিছু করতে হয়। তাই, জীবনের প্রায়োরিটি মানুষের আজ পরিবর্তিত হয়ে গেছে। আজ আর ফ্রি রাজনৈতিক কর্মী মেলে না। মানুষ তার জীবন-সংগ্রামে এতই আজ ব্যস্ত যে, সে রাজনীতির জন্য সময় আর এনার্জি বের করতে পারে না। এ দেশে বিরোধীদলীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ বেশ অন্ধকার। সময় বলে দেবে, এ দেশে বিরোধী রাজনীতি আর কোনো দিনও আগের মতো চাঙা হতে পারবে কি না!

লেখক: শিক্ষক, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়