চা শ্রমিকদের ঔপনিবেশিক বঞ্চনা

সকাল, বিকাল, কিংবা সন্ধ্যা এককাপ গরম চা ছাড়া আমাদের কিছুতে চলে না। স্বাভাবিকভাবেই চায়ের মতো একটি বহুল প্রচলিত পানীয়তে ঔপনিবেশিকতার আঁচড় খোঁজা বাহুল্য বা আপাতদৃষ্টিতে অপ্রয়োজনীয় মনে হতে পারে। কারণ ঔপনিবেশিক শব্দটার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সারা পৃথিবীতে স্থানীয় বা নেটিভদের ওপর কাঠামোগত বঞ্চনা ও অধস্তনতা। তাই চা ঔপনিবেশিক পানীয় কিনা তা বুঝতে কিছুটা ইতিহাসের দারস্থ হতে হয়।

সবারই জানা, ভারতীয় উপমহাদেশে চা পানের অভ্যাস ও এর উৎপাদন শুরু হয় ব্রিটিশ বেনিয়াদের হাত ধরে এবং অবশ্যই ঔপনিবেশিক ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে। তারও আগে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি ১৬৬৪ সালে ইংল্যান্ডে চায়ের আমদানি শুরু করে। তারপর থেকে চা ছিল ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির অন্যতম ব্যবসায়িক পণ্য। ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে কোম্পানি ইংল্যান্ডে চা সরবরাহে চীনের পাশাপাশি ভারতের দিকে মনোযোগ দেয়। ১৮৫৮ সালে শাসনব্যবস্থা ব্রিটিশ সরকারের হাতে হস্তান্তর হলেও কোম্পানিকে অনুসরণ নতুন প্রশাসন ভারতে চা চাষে প্রণোদনা অব্যাহত রাখে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৮৮৮ সালে প্রথমবারের মতো ইংল্যান্ডে চায়ের আমদানির উৎস বিবেচনায় চীনকে ছাড়িয়ে যায় ভারত। তবে সেই সময় চায়ের শুধু ব্যবসায়িক গুরুত্বই ছিল না রাজনৈতিকভাবে গুরুত্ব পেতে শুরু করে চা। ভারত ও শ্রীলঙ্কার সস্তা চায়ের প্রভাবে ধীরে ধীরে ইংল্যান্ডের নাগরিকদের জীবনযাত্রার অংশ হয়ে যায়, আরও আট-দশটা নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের মতো। যার প্রথম অফিশিয়াল স্বীকৃতি আসে প্রথম বিশ্বযুদ্ধের সময় যখন ব্রিটিশ সরকার চায়ের দাম ও সরবরাহ নিয়ন্ত্রণে রাখার জন্য নিজেই দায়িত্বভার গ্রহণ করে। অন্যদিকে প্রায় সমসাময়িক কালে আরও সস্তায় চায়ের সরবরাহ নিশ্চিত করতে ভারতে ব্রিটিশরাজ ও তার বেনিয়া গোষ্ঠী ভারতে চা শ্রমিক নিষ্পেষণ ও বঞ্চনার মাত্রা আরও বড়িয়ে দেয়।

ব্রিটিশ ভারতে আসাম ছিল শুরুর দিককার বৃহৎ পরিসরে চা উৎপাদন কেন্দ্র। সিলেটে প্রথম চা বাগান প্রতিষ্ঠিত হয় মালনিছড়াতে ঊনবিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি, আর এটাই বর্তমান বাংলাদেশের প্রথম বাণিজ্যিক চা বাগান।

ভারতে চা চাষের শুরুটাই হয় প্রতারণা ও বঞ্চনার হাত ধরে। এই অঞ্চলের জঙ্গল, ঝোপঝাড় পরিষ্কার করে বাগান সৃষ্টি করা ও তদারকির জন্য ভারতের বিহার, মধ্যপ্রদেশ, মাদ্রাজসহ বিভিন্ন অঞ্চলের নিম্নবর্গের জনগোষ্ঠীকে যুক্ত করে ব্রিটিশ কোম্পানিগুলো। যার পেছনে ছিল উন্নত জীবনের মিথ্যা আশ্বাস ও প্রলোভন। যদিও এই প্রলোভন দুঃস্বপ্নে পরিণত হতে বেশি সময় লাগেনি আর এখানেই ঔপনিবেশিক বঞ্চনা বেশি প্রাসঙ্গিক। ইতিহাস বলে, চা শ্রমিকদের প্রতি ইংরেজ মালিকদের অন্যায় ও নিগ্রহ চূড়ান্ত মাত্রায় পৌঁছায় প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শেষে। ব্রিটিশ নাগরিকদের স্বস্তি দেওয়ার বিপরীতে চা শ্রমিকদের প্রতি বঞ্চনা ও অন্যায় যেন বেড়ে গেল আরও একধাপ।

‘টি টোকেন’ ছিল চা শ্রমিকদের দাসত্বের একটি হাতিয়ার যে প্রথার কারণে চা শ্রমিকদের বাগান ছেড়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তারপরও ১৯২১ সালে প্রথম বিশ্বযুদ্ধোত্তর মন্দায় পড়ে শ্রমিকদের মজুরি আরও কমিয়ে দেওয়া হলো। আর এই বঞ্চনার ইতিহাসই হলো ‘মুল্লুক চলো’ আন্দোলনের প্রতিপাদ্য। যাতে বিক্ষুব্ধ শ্রমিকরা চা বাগানের বন্দিত্ব থেকে মুক্তির প্রত্যাশায় করিমগঞ্জ থেকে দল বেধে চাঁদপুরের মেঘনা ঘাটে পৌঁছে স্বদেশ প্রত্যাবর্তনের জাহাজ ধরার উদ্দেশ্যে। ঘটনাটি ১৯২১ সালের  মে মাসের। আর এতে চা বাগানের সাহেব মালিকরা যারপরনাই ক্ষুব্ধ হয়, ফলাফল বিদ্রোহ দমনে আসাম রাইফেলস নিরীহ শ্রমিকদের ওপর নির্বিচারে গুলি চালায়। নিরীহ শ্রমিকদের রক্তে রঞ্জিত হয় মেঘনার পানি। এই ঘটনার মধ্য দিয়ে অনেক চা শ্রমিকের জীবন গেল কিন্তু নিজ মুল্লুুকে আর ফেরা হলো না। আন্দোলনের হলো ট্রাজিক পরিসমাপ্তি।

এই ঘটনার মধ্যদিয়ে চা শ্রমিকরা যেন চিরদিনের জন্য দাসত্বে আটকে গেল। জোরপূর্বক তাদের শ্রম দিতে বাধ্য করা হলো যুগের পর যুগ। ব্রিটিশ গেল, পাকিস্তান গেল, এখন স্বাধীন বাংলাদেশ। কিন্তু চা বাগান পরিচালন কাঠামো যেন দাসত্বের ব্যবস্থা থেকে এতটুকুও বের হতে পারেনি। অনেকেই নানান রকমের হিসাব দেন যে চা শ্রমিকদের প্রকৃত মজুরি আরও অনেক বেশি। কিন্তু তাদের এই হিসাবের সঙ্গে বাস্তবের কোনো মিল নেই, যা আছে তা হলো নানা কৌশলে নিরীহ শ্রমিকদের প্রজন্মের পর প্রজন্ম শ্রমিক বানিয়ে রাখার চেষ্টা।

বর্তমান পদ্ধতিতে চা শ্রমিকদের পরবর্তী প্রজন্ম কখনো শিক্ষাদীক্ষা ও প্রযুক্তিতে দক্ষ হতে পারবে না। সেই ব্যবস্থাই রাখা হয়নি, এই ন্যূনতম মজুরি দিয়ে চা শ্রমিকরা জীবন চালাবে নাকি উত্তর প্রজন্মের জন্য বিনিয়োগ করবে। তাই দেখা যায় চা বাগান থেকে খুব কমসংখ্যক শিক্ষার্থী উচ্চশিক্ষার দোরগোড়ায় পৌঁছাতে পারে। আর এটাই হচ্ছে ঔপনিবেশিক রীতি। যে রীতি ভুক্তভোগী জনগোষ্ঠীকে বঞ্চনার চক্রে আটকিয়ে রেখে শুধু তার শ্রমটাকেই নিশ্চিত করতে চায়। নিজেদের প্রয়োজনে জোরপূর্বক শ্রম আদায়। এই প্রক্রিয়ায় চা বাগানের শ্রমিকদের সন্তানরা আবার চা বাগানের শ্রমিকই হয়। বর্তমান মজুরির জায়গায় আরও যদি কিছুটা বাড়ানোও হয় তাতেও চা শ্রমিকদের অদৃষ্ট পরিবর্তনের কোনো সুযোগ আছে বলে মনে হয় না। চা বাগানের বর্তমান পরিবেশ ও ব্যবস্থাপনাও যেন সেই সাক্ষ্যই দেয়।

চা চাষের মতো, ব্রিটিশরা এদেশে কৃষকদের ওপর নীল চাষ চাপিয়ে দিতে চেয়েছিল। ধান চাষ বাদ দিয়ে নিজেদের শিল্প বিপ্লবের চাহিদা মেটানোর জন্য এদেশের কৃষকদের বাধ্য করেছিল নীল চাষে। আর তাদের হাতিয়ার ছিল সীমাহীন অত্যাচার ও নির্যাতন। ব্রিটিশদের চলে যাওয়ার মাধ্যমে এদেশ থেকে নীল চাষ শেষ হয়েছে কিন্তু চা শ্রমিদের বঞ্চনা শেষ হয়নি। যদিও চা উৎপাদনের অন্য দৃষ্টান্তও আমাদের সামনে আছে। বর্তমানে সিলেট ও চট্টগ্রাম অঞ্চলেই শুধু চায়ের চাষ হয় না, দেশের পঞ্চগড় জেলায়ও চা চাষের প্রচলন শুরু হয়েছে। এখানে শ্রমিকদের মুক্ত পরিবেশ ও প্রতিযোগিতামূলক শ্রমের মূল্য নিশ্চিত করার পরও মালিকরা ব্যবসায়িকভাবে প্রতিযোগিতাপূর্ণ থাকতে পারছে। কিন্তু সিলেট অঞ্চলের চা বাগানের মালিকদের ভাষ্য অনুযায়ী ব্যবসা ভালো যাচ্ছে না! মালিকদের এই ধরনের অন্যায্য যুক্তি নতুন কিছু না, ভারত ও বাংলাদেশের চা শিল্পের ইতিহাসের ধাপে ধাপে এই একই প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হয়েছে সেই ঔপনিবেশিক কাল ধরে।

সেই বিচারে চা শ্রমিকদের এই বঞ্চনা একদিকে অর্থনৈতিক অন্যদিকে রাজনৈতিক। ব্রিটিশ ভারতে সাহেব মালিকরা চা বাগানে যেমন তাদের জমিদারি চালাত, চায়ের ব্যবসা করত এবং একই সঙ্গে চা পানের ক্ষেত্রে যাতে ব্রিটিশ নাগরিকদের কোনো কষ্ট না হয় তাও নিশ্চিত করতে চাইত। আর এতকিছুর নিশ্চয়তা দিতেই চা শ্রমিকদের প্রতি সীমাহীন বঞ্চনা ও এই দাসত্ব।

দেশ স্বাধীন করে আমরা ঔপনিবেশিক দাসত্ব ছিন্ন করেছি সেই কবে। কিন্তু চা শ্রমিকরা না পেরেছে চা বাগানের ঔপনিবেশিক কাঠামো ভাঙতে, না পেরেছে সেই জাল ছিন্ন করে স্বাধীন জীবনযাপন বেছে নিতে। আর না পেরেছে নিজেদের অর্থনেতিক সচ্ছলতা নিশ্চিত করতে। স্বাধীন বাংলাদেশ রাষ্ট্রের তাই দায়িত্ব আছে, এই চা শ্রমিকদের ঔপনিবেশিক বঞ্চনার নিগড় থেকে মুক্ত করার।

লেখক : উন্নয়নকর্মী

psmiraz@yahoo.com