ঝুঁকি গবেষণায় আ.লীগ

অন্তত দেড় বছর আগে থেকেই দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন নিয়ে সতর্ক থাকতে হচ্ছে সরকারি দল আওয়ামী লীগকে। দলটির শীর্ষস্থানীয় ও বিভিন্ন স্তরের একাধিক নেতা বলেছেন, কোনোভাবেই গত দুবারের মতো আগামী নির্বাচন হবে না। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। তাই আগামী নির্বাচনের প্রস্তুতিও অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি নিতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে। এরই অংশ হিসেবে দলের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ আসনগুলো চিহ্নিত করার কাজ শুরু করে দিয়েছে ক্ষমতাসীনরা। পর্যালোচনা-পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার কাজটি করছেন দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে বিভাগীয় টিমগুলো।

আওয়ামী লীগ সূত্রগুলো বলছে, এখন পর্যন্ত দলের বিবেচনায় ঝুঁকিপূর্ণ আসনের সংখ্যা একশর নিচে নয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ সভাপতিম-লীর সদস্য ফারুক খান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘আওয়ামী লীগ মনে করে দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। কারণ বিএনপিও নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে। সেই প্রস্তুতিও নিতে শুরু করেছে দলটি। তিনি বলেন, ‘দ্বাদশ সংসদ নির্বাচনকে ঘিরে কতগুলো আসনে আওয়ামী লীগের ভালো অবস্থা, কতগুলোতে খারাপ ও কতগুলো আসনে ফিফটি-ফিফটি চান্স তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি খারাপ অবস্থা কীভাবে ভালো করা সম্ভব সেই উদ্যোগও নেওয়া হবে।’

একাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে ২৫৮ আসনে জয়লাভ করে টানা তৃতীয়বার সরকার গঠন করে আওয়ামী লীগ। পরে উপনির্বাচনে ক্ষমতাসীনদের আসন আরেকটি বাড়ে। এর আগে ২০১৪ সালে ২৩৪ আসনে জয় পায় দলটি। সেই নির্বাচনে ১৫৪ আসনে আওয়ামী লীগের প্রার্থীরা বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় বিজয়ী হন। অবশ্য ওই নির্বাচন ছিল বিএনপিবিহীন। ২০১৮ সালের নির্বাচনে বিএনপি অংশ নিলেও ভোটের মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বিতায় আসতে না পারায় সহজে জয় পায় আওয়ামী লীগ। আগামী সংসদ নির্বাচন হতে পারে আগামী বছরের ডিসেম্বরে অথবা ২০২৪ সালের জানুয়ারিতে।

আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের নীতিনির্ধারণী মহল মনে করছে, নির্বাচনে নানাভাবেই শক্ত প্রতিদ্বন্দ্বিতার মুখে পড়তে হবে তাদের। তাই প্রস্তুতিও অন্য যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি নিতে হচ্ছে আওয়ামী লীগকে। এরই অংশ হিসেবে সারা দেশের ৩০০ সংসদীয় আসনের মধ্যে কোন কোন আসনে দলের ভালো অবস্থা, কোন আসন ঝুঁকিপূর্ণ তা গুরুত্ব সহকারে পর্যালোচনা করছে আওয়ামী লীগ। টানা তিন মেয়াদে ক্ষমতায় থাকার পরও কেন ঝুঁকিতে থাকতে হবে এ প্রশ্নেও গবেষণা চলছে। কেন ঝুঁকিমুক্ত করা সম্ভব হয়নি সে ক্ষেত্রে অন্তরায়গুলো কী তা চিহ্নিত করা হচ্ছে। পাশাপাশি নির্বাচনের আগে ঝুঁকিপূর্ণ আসনগুলো ঝুঁকিমুক্ত করতে করণীয় কী তাও ঠিক করার কাজ করছে ক্ষমতাসীনরা।

আওয়ামী লীগের একাধিক সূত্র দেশ রূপান্তরকে জানায়, দলের কেন্দ্রীয় নেতাদের সমন্বয়ে বিভাগীয় টিমগুলো সংসদীয় আসনগুলো নিয়ে পর্যবেক্ষণ-পর্যালোচনা ও গবেষণার কাজ চালিয়ে যাচ্ছে। দলীয় ওই টিমগুলো সারা দেশ সফরে নেমে সর্বস্তরের নেতাকর্মীদের সঙ্গে মতবিনিময় করছে। এর মধ্য দিয়ে কোথায় দলীয় কোন্দল আর এ কোন্দলের কারণে নির্বাচনে ভরাডুবি হতে পারে, কোন সংসদ সদস্য নেতাকর্মী বিচ্ছিন্ন বা ঠিকঠাকভাবে তাদের অবমূল্যায়ন করেন, সাধারণ মানুষের কাছে অজনপ্রিয় কোন সংসদ সদস্য এসব নিয়ে গবেষণা চলছে। প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটেও কারা নিশ্চিত বিজয়ী হয়ে আসতে পারেন তাদের তালিকা করার কাজও চলছে। একই সঙ্গে কারা পরাজিত হতে পারেন তাদের তালিকাও হচ্ছে। পাশাপাশি পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাদের তালিকা করার কাজ এগিয়ে চলেছে। মনোনয়ন কাকে দিলে ঝুঁকিপূর্ণ আসনগুলা ঝুঁকিমুক্ত করা সম্ভব হবে তা নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা চলছে।

একাদশ সংসদে আওয়ামী লীগের বিভাগওয়ারি আসনসংখ্যা হলো ঢাকায় ৬৯, চট্টগ্রামে ৫৩, রাজশাহীতে ৩১, খুলনায় ৩৪, বরিশালে ১৭, রংপুরে ২৫, সিলেটে ১৬ ও ময়মনসিংহে ১৭।

খুলনা, রাজশাহী ও চট্টগ্রাম বিভাগের ১১৭টি আসনেই ঝুঁকি আছে বলে মনে করছে আওয়ামী লীগ। খুলনা বিভাগে ৩৬, রাজশাহীতে ৩৯ ও চট্টগ্রামে ৫৮টি আসন রয়েছে।

আওয়ামী লীগ দলীয় সূত্রগুলো জানায়, অন্যান্য বিভাগের মতো ঢাকা বিভাগেও কয়েকটি জেলার সংসদীয় আসন ঝুঁকিপূর্ণ মনে করা হচ্ছে। আসনগুলো চিহ্নিত করার পর ঝুঁকিমুক্ত করতে বাড়তি তদারক করা হবে। হতদরিদ্র জনগণকে সাহায্য-সহযোগিতা, রাস্তা-ঘাট, পুল কালভার্ট, সামাজিক-সাংস্কৃতিক কর্মকা-ে বেশি সম্পৃক্ত হওয়া ও মসজিদ-মাদ্রাসা কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে দলীয় প্রার্থীর ভাবমূর্তি ফিরিয়ে আনার চেষ্টা চালানো হবে। ঝুঁকিমুক্ত করার জন্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ গ্রহণ করা হবে।

ঝুঁকিপূর্ণ আসন চিহ্নিত করার কাজে যুক্ত থাকা আওয়ামী লীগের এক সাংগঠনিক সম্পাদক দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংসদ সদস্যদের মধ্যে কে বা কারা প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ভোটে বিজয়ী হবেন না এবং ৫-১০ বছর সংসদ সদস্য থাকার পরও জনপ্রিয় নন, কেন জনপ্রিয় হতে পারেননি তা অনুসন্ধান করা হচ্ছে। সবিস্তারে লিখিত এ প্রতিবেদন দলীয় সভাপতি শেখ হাসিনার হাতে তুলে দেবেন দায়িত্বপ্রাপ্ত নেতারা।

আওয়ামী লীগের সম্পাদকমন্ডলীর আরেক নেতা দেশ রূপান্তরকে বলেন, দলীয় টিমের বাইরেও বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাকেও আগামী নির্বাচনে আওয়ামী লীগের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ আসন কোনগুলো তা চিহ্নিত করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে। প্রত্যেক জেলায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর শীর্ষ কর্মকর্তাকেও রাজনৈতিক পরিস্থিতি ও দলীয় সংসদ সদস্যদের নিজ এলাকায় অবস্থান কতটা শক্তিশালী বা দুর্বল তার ওপর নজর রাখার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।

ওই নেতা বলেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দলীয় সভায় একাধিকবার জানিয়ে দিয়েছেন আগামী নির্বাচন প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ হবে। আর সেই ভোটে জিতে আসার লক্ষ্যে কাজ করতে হবে দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যদের। সম্পাদকমন্ডলীর ওই সদস্য আরও বলেন, যে সংসদ সদস্যরা ক্ষমতায় থেকেও জনপ্রিয় বা অজনপ্রিয়ও হয়েছেন কোনো বিবেচনায়ই তাদের মনোনয়ন দিয়ে ‘ঝুঁকি’ নিতে চান না আওয়ামী লীগ সভাপতি।

এ বিষয়ে আওয়ামী লীগের সভাপতিমন্ডলীর সদস্য কাজী জাফরউল্যাহ দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘যেকোনো রাজনৈতিক দলের কিছু রুটিন কাজ থাকে। কোথায় উন্নতি ঘটল, কোথায় অবনতি এবং কেন? এগুলো পার্টির নিয়মিত কাজের অংশ।’