প্রধানমন্ত্রীর ভারত সফর: প্রত্যাশা-প্রাপ্তির সমীকরণ

শেষ গিয়েছিলেন ২০১৯ সালে। প্রায় তিন বছর পর রাষ্ট্রীয় সফরে  আবার ভারত গেলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সেখানে তিনি আগামীকাল (মঙ্গলবার) ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সঙ্গে বৈঠকে বসবেন। আগেরবার কিছুটা অর্জন আর বেশ কিছু অপ্রাপ্তি নিয়ে দেশে ফিরেছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। যে কারণে এবার ভারত সফর নিয়ে বাংলাদেশে অভ্যন্তরে বেশ প্রত্যাশার চাপ তৈরি হয়েছে। সেটা রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে শুরু করে সর্বত্র। সেই প্রত্যাশার বিশাল চাপ কাঁধে নিয়েই দিল্লির প্লেনে ওঠেন প্রধানমন্ত্রী। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতারাও এ সফরকে দেখছেন বেশ গুরুত্ব দিয়ে। পাওয়া না পাওয়ার সমীকরণ রাজনীতির মাঠেও ছড়াবে উত্তাপ সেটা আগাম বলাই যেতে পারে।

দেশের মানুষের প্রত্যাশা এবার শেখ হাসিনা আগের অসম্পাদিত বিষয়গুলোর বড় অংশই সমাধান করতে সক্ষম হবেন। তবে তার এ সফরকে স্বাভাবিক ও নিয়মিত সফর হিসেবে দেখছেন বাংলাদেশের সাবেক কূটনৈতিক ও রাজনৈতিক সম্পর্ক বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা। প্রধানমন্ত্রীর এবারের সফরে পানি বণ্টনসহ জ্বালানি সহযোগিতা, স্থিতিশীল বাণিজ্যিক সম্পর্ক ও দুই দেশের আন্তসম্পর্ক উন্নয়নের মতো বিষয়গুলো প্রাধান্য পেতে পারে বলে ধারণা করছেন আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশেষজ্ঞসহ আন্তর্জাতিক মিডিয়া।

সাবেক পররাষ্ট্রসচিব তৌহিদ হোসেন সম্প্রতি এক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, এই ভিজিটে অনেক সমস্যা এবং সংকটের সমাধান হয়ে যাবে এ রকম প্রত্যাশা না করাই ভালো। পানি ভাগাভাগির বিষয়ে কিছু চুক্তি হবে সে বিষয়ে আগে থেকেই কথাবার্তা চলছে। এই সফরে কুশিয়ারা নদীর পানি বণ্টন এবং দ্বিপক্ষীয়  বাণিজ্য অগ্রগতির ক্ষেত্রে প্রাপ্তির সুযোগ রয়েছে। চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সখ্যর কারণে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ক নিয়ে ভূরাজনৈতিক ভুল প্রচারকে দূর করার সুযোগ নিতে পারেন প্রধানমন্ত্রী’।

‘প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তিস্তা নদীর পানিবণ্টন নিয়ে চাপ অব্যাহত রাখলেও তিস্তা নিয়ে কোনো বড় ঘোষণার সম্ভাবনা নেই’ বলে আগাম পূর্বাভাস এসেছে ওপার থেকেই।

ভারতের শীর্ষ কয়েকজন কুটনীতিকের  উদ্ধৃতি দিয়ে সরকার ঘনিষ্ঠ সংবাদপত্র দ্য হিন্দুর এক প্রতিবেদন এ ইঙ্গিত দিয়েছে আজ (রবিবার)।

ভারত সরকারের বিভিন্ন সূত্রের উদ্ধৃতি দিয়ে দ্য হিন্দু বলছে, ‘তবে আসাম থেকে বাংলাদেশে প্রবাহিত কুশিয়ারা নদীর পানিবণ্টন চুক্তি সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে’।

দ্য হিন্দুর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ‘এবার জ্বালানি সরবরাহ নিয়ে দ্বিপক্ষীয় চুক্তি হতে পারে বলে আমরা ধারণা করছি’। অপর একটি সূত্র জানিয়েছে, জ্বালানি চুক্তি না হলেও বাংলাদেশ যদি বর্তমান জ্বালানি সংকট নিয়ে ভারতের কাছে পরামর্শ চায় সে ক্ষেত্রেও ভারত ইতিবাচক সাড়া দিতে পারে।

বাংলাদেশ প্রয়োজনীয় কিছু পণ্যের জন্য ভারতের ওপর নির্ভরশীল। অতীতে সেসব পণ্যের সরবরাহে ব্যাঘাত নিয়েও  বাংলাদেশ নিয়মিত উদ্বেগ প্রকাশ করে আসছে। গত বছরও ভারত সাময়িক সময়ের জন্য পেঁয়াজ সরবরাহ বন্ধ করে দেওয়ায় দেশে ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছিল। এবারের সফরে ঢাকা ভারতের কাছে স্থিতিশীল বাণিজ্যিক সরবরাহের নিশ্চয়তা চাইতে পারে।

চীনের সঙ্গে বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও উন্নয়ন সম্পর্ক নিয়ে ভারতে অস্বস্তি আছে। কিন্তু বাস্তবে ভারতের সঙ্গে চীনের বাণিজ্য বাংলাদেশের তুলনায় অনেক অনেক বেশি।

তৌহিদ হোসেন বলেন, আমাদের দেশে চীনের যে অবকাঠামো বা উন্নয়ন প্রকল্প রয়েছে সেগুলোতে আমরা চীন থেকেই টাকা পেতে পারি। কিছু প্রকল্পে ইতিমধ্যে পেয়েছি এবং ভবিষ্যতেও পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। কিন্তু ভারতের তো সেই সামর্থ্য নেই। তবে আমাদের সঙ্গে ভারতের সম্পর্ক সব সময় ঘনিষ্ঠ। আর চীনের সঙ্গে আমাদের সম্পর্ক হচ্ছে অর্থনৈতিক স্বার্থের। এই সফরে এসব বিষয়গুলো প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট করতে পারবেন বলে মত প্রকাশ করেন তিনি।

এ বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ক অধ্যাপক ডক্টর দেলোয়ার হোসেন বলেন, প্রধানমন্ত্রীর এ সফরে পানির সংক্রান্ত যে কূটনীতি সেটাই একটা বড় ধরনের অগ্রগতি আশা করছি। বাংলাদেশের রপ্তানি আরো বৃদ্ধি করা এবং সে ক্ষেত্রে ভারতের সঙ্গে আমাদের একটি চুক্তি নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। যেটি হচ্ছে কমপ্রেসিভ ইকোনমিক অ্যাগ্রিমেন্ট। সেখানেও আমাদের কিছু অগ্রগতি আসবে।

তিনি আরো বলেন, আমার মনে হয় চীন নীতি, বাংলাদেশে সঙ্গে ভারতের নীতি কিম্বা বাংলাদেশের সঙ্গে আমেরিকার নীতি বা বিশ্ব রাজনীতি–সেখানে বাংলাদেশে কোথায় অবস্থান করে সে বিষয়ে খোলামেলা কথা বলার সুযোগ পাবেন প্রধানমন্ত্রী।

প্রত্যাশা বাড়লে প্রাপ্তির আকাঙ্ক্ষাও বাড়ে। প্রাপ্তি যদি আবার কম হয় সেখানে তৈরি হয় সম্পর্কের  নতুন জটিলতা। সেসব কথা মাথায় রেখে প্রতিবেশী এ দুই দেশ আন্তর্জাতিক রাজনৈতিক মেরুকরণ, ইউক্রেন যুদ্ধের বর্তমান বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আঞ্চলিক সহযোগিতা বাড়িয়ে নিজেদের অর্থনৈতিক ও আঞ্চলিক সম্ভাবনাকে কাজে লাগাতে এ সফরকে ব্যবহার করবে সেটাই আশা করছেন বিশেষজ্ঞরা।