হাসিনা-মোদি বৈঠক আজ

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির আমন্ত্রণে চার দিনের রাষ্ট্রীয় সফরে গতকাল সোমবার দুপুরে নয়াদিল্লিতে পৌঁছেছেন। সেখানে তাকে লালগালিচা অভ্যর্থনা জানানো হয়। বিমানবন্দরে প্রধানমন্ত্রীকে অভ্যর্থনা জানান ভারতের রেল ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী দর্শনা বিক্রম এবং ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মুহাম্মদ ইমরান।

আজ মঙ্গলবার হায়দরাবাদ হাউজে শেখ হাসিনা ও নরেন্দ্র মোদির ৩০ মিনিটের একান্ত বৈঠক হবে।

ঢাকা ও দিল্লির কূটনৈতিক সূত্রগুলো বলছে, এ সফরের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণক্ষণ হলো হায়দরাবাদ হাউজে শেখ হাসিনা ও মোদির ৩০ মিনিটের একান্ত বৈঠকের সময়। দুই দেশের দুই সরকারপ্রধানের বৈঠকের আলোচনাই হবে মূল বিষয়। যদিও দ্বিপক্ষীয় বৈঠকের বিষয়টি অনেকটাই থাকবে অজানা।

দুই দেশের কূটনৈতিক সূত্রের দাবি, দুই সরকারপ্রধানের একান্ত বৈঠকে অভ্যন্তরীণ এবং আন্তর্জাতিক বিষয়গুলো নিয়ে দিকনির্দেশনামূলক আলোচনা হবে। গত দুই বছর ধরে চীন ও বিভিন্ন ইস্যুতে দুই দেশের মধ্যে যে শীতল সম্পর্ক যাচ্ছে সেটি কমে আসতে পারে এ বৈঠকে। হায়দরাবাদ হাউজের কালকের (আজ) সেই আধঘণ্টা হবে এ সফরের মূল প্রাণ।

এদিকে রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের কারণে বিশ্ব রাজনীতির নতুন মেরুকরণ, বাংলাদেশের দ্বাদশ সংসদ নির্বাচন, বৈশ্বিক মন্দাসহ বিভিন্ন কারণে সরকারপ্রধানের এ সফর এখন দুই দেশের রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক মহলের আগ্রহের কেন্দ্র। ফলে শেখ হাসিনার ভারত সফরে দুই দেশের যৌথ বিবৃতি এবং দুই দেশের প্রত্যাশা ও প্রাপ্তির দিকে নজর সবার।

প্রথম দিনের সফর সম্পর্কে প্রধানমন্ত্রীর প্রেস সচিব ইহসানুল করিম সংবাদমাধ্যমকে জানান, প্রধানমন্ত্রী ও তার সফরসঙ্গীদের বহনকারী বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনসের একটি ভিভিআইপি চার্টার্ড ফ্লাইট আজ (গতকাল) স্থানীয় সময় সকাল ১১টা ৪০ মিনিটে নয়াদিল্লির পালাম বিমানবন্দরে অবতরণ করে।

প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইং থেকে পাঠানো তথ্য থেকে জানা যায়, শেখ হাসিনার সম্মানে বিমানবন্দরে লালগালিচা বিছানোর পাশাপাশি ছয়-সাত সদস্যের একটি সাংস্কৃতিক দল স্বাগত নৃত্য ও বাদ্যযন্ত্র পরিবেশন করে। এর আগে সকাল ১০টা ১৭ মিনিটে তার ফ্লাইট ঢাকার হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর ছেড়ে যায়।

এদিকে গতকাল সন্ধ্যায় প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রীর ড. এস জয়শঙ্কর সাক্ষাৎ করেন। সাক্ষাৎকালে তারা রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ও আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধিসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা করেছেন। বৈঠকের পর ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এক টুইটে লিখেছেন, আজ সন্ধ্যায় (গতকাল) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে পেরে আনন্দিত। আমাদের নেতৃত্বস্তরের যোগাযোগের উষ্ণতা ও পুনরাবৃত্তি ঘনিষ্ঠ প্রতিবেশীর অংশীদারিত্বের একটি সাক্ষ্য।

পরে সাংবাদিকদের বাংলাদেশের পররাষ্ট্র সচিব মাসুদ বিন মোমেন বলেন, সফরের প্রথম দিনে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন, আঞ্চলিক যোগাযোগ বৃদ্ধি এবং ভারত, ভুটান ও নেপাল থেকে বিদ্যুৎ আমদানির বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। আজ (গতকাল) প্রাথমিক আলোচনা হয়েছে। আগামীকাল (আজ) মঙ্গলবার চূড়ান্ত আলোচনা হবে এবং কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হবে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর, দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক স্বাক্ষরিত হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে এবং পরে একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়া হবে। হায়দরাবাদ হাউজে শেখ হাসিনাকে অভ্যর্থনা জানাবেন নরেন্দ্র মোদি। সেখানে শেখ হাসিনাকে আনুষ্ঠানিক গার্ড অব অনার দেওয়া হবে। পরে প্রধানমন্ত্রী তার সম্মানে ভারতের প্রধানমন্ত্রী আয়োজিত মধ্যাহ্নভোজে যোগ দেবেন।

ভারত সফরের প্রথম দিন গতকাল মৌর্য হোটেলে প্রধানমন্ত্রীর স্যুইটের সম্মেলন কক্ষে শেখ হাসিনার সঙ্গে দেখা করেন দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. এস জয়শংকর। পরে একই স্থানে প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন আদানি গ্রুপের চেয়ারম্যান গৌতম আদানি।

প্রধানমন্ত্রীর উপ-প্রেস সচিব কেএম সাখাওয়াত মুন সাংবাদিকদের জানান, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গতকাল মুসলমানদের কাছে অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগাহ জিয়ারতের মাধ্যমে ভারতে তার চার দিনের সফর শুরু করেন। তিনি সেখানে কিছু সময় অতিবাহিত এবং ফাতেহা পাঠ ও মোনাজাত করেন। তিনি সেখানে নফল নামাজ আদায় এবং মোনাজাতকালে দেশ, জাতি, মুসলিম উম্মাহর উন্নয়ন, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করেন।

সাখাওয়াত মুন বলেন, প্রধানমন্ত্রী পরে নিজামউদ্দিন আউলিয়ার দরগাহর বিভিন্ন অংশ ঘুরে দেখেন। ভারতে সুফি সংস্কৃতির অন্যতম পবিত্র স্থান এ দরগাহটি প্রায় ৭০০ বছরের পুরনো। বাংলাদেশের জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকা-ের পর ১৯৭৫ থেকে ’৮১ সাল পর্যন্ত দিল্লিতে অবস্থানকালে শেখ হাসিনা নিয়মিত নিজামউদ্দিন দরগাহে জিয়ারতে যেতেন। প্রধানমন্ত্রী ৮ সেপ্টেম্বর ভারত সফরের শেষ দিনে রাজস্থানে আজমির শরিফ জিয়ারত করবেন।

রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থা বাসস জানায়, শেখ হাসিনা ২০১৭ সালে আজমির শরিফ জিয়ারত করেন। এর আগে ২০১০ সালে যখন তিনি দ্বিতীয়বারের মতো প্রধানমন্ত্রী হন তখনো আজমির শরিফ জিয়ারত করেন। প্রধানমন্ত্রী গতকাল সন্ধ্যায় ভারতে নিযুক্ত বাংলাদেশের হাইকমিশনার মুহাম্মদ ইমরান ও মিসেস জাকিয়া হাসনাত ইমরান আয়োজিত এক রিসেপশন কাম ডিনারে যোগ দেন।

সফরসূচি অনুযায়ী সফরের দ্বিতীয় দিনে আজ শেখ হাসিনা হায়দরাবাদ হাউজে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক ও একান্ত আলোচনা করবেন। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পর দুই প্রতিবেশী দেশের মধ্যে বেশ কয়েকটি সমঝোতা স্মারক সই হওয়ার কথা রয়েছে এবং পরে একটি যৌথ বিবৃতি দেওয়া হবে। একই দিন শেখ হাসিনা ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদি মুর্মু ও উপরাষ্ট্রপতি জগদীপ ধনখাড়ের সঙ্গে পৃথক সৌজন্য সাক্ষাৎ করবেন বলে আশা করা হচ্ছে। এদিন শেখ হাসিনার রাজঘাটে মহাত্মা গান্ধীর প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করার কথা।

পরদিন বুধবার ভারতের উত্তর-পূর্ব অঞ্চলের উন্নয়নমন্ত্রী জি কিষান রেড্ডি এবং নোবেলজয়ী কৈলাশ সত্যার্থী তার সঙ্গে পৃথকভাবে সাক্ষাৎ করবেন। একই দিন ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর দেখা করার কথা রয়েছে। এদিন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতের শীর্ষস্থানীয় ব্যবসায়ী নেতাদের সভায় এবং ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় শহীদ বা গুরুতর আহত ভারতীয় প্রতিরক্ষা বাহিনীর অফিসারদের বংশধরদের ‘মুজিব বৃত্তি’ প্রদানের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

আগামী বৃহস্পতিবার ঢাকায় ফেরার আগে রাজস্থানের খাজা গরিব নওয়াজ দরগাহ শরিফ, আজমির (আজমির শরিফ দরগাহ) জিয়ারত করবেন।

তিন বছর পর ভারত সফরে গেলেন প্রধানমন্ত্রী। ২০১৯ সালের অক্টোবরে সর্বশেষ ভারত সফর করেন। পরে কভিড মহামারীর ফলে ২০২০ সালে বাংলাদেশ ও ভারতের প্রধানমন্ত্রী এক ভার্চুয়াল সামিটে অংশগ্রহণ করেন। ২০২১ সালের মার্চে ভারতের প্রধানমন্ত্রী এবং ডিসেম্বরে দেশটির রাষ্ট্রপতি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর শততম জন্মবার্ষিকী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতা সুবর্ণজয়ন্তী এবং ভারত-বাংলাদশ কূটনৈতিক সম্পর্ক স্থাপনের সুবর্ণজয়ন্তীতে বাংলাদেশ সফর করেন।

হাসিনাকে মমতার অভিনন্দন : প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভারতে পৌঁছানোর পর তাকে অভিনন্দন জানিয়েছেন দেশটির পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গতকাল দেশটির শিক্ষক দিবস উপলক্ষে কলকাতার বিশ্ব বঙ্গমেলা প্রাঙ্গণে ‘শিক্ষক রতœ’ প্রদান অনুষ্ঠান মঞ্চ থেকে এ অভিনন্দন জানান তিনি। মমতা বলেন, আজ (গতকাল) বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী এসেছেন। আমরা পশ্চিমবঙ্গের মানুষের তরফ থেকে বাংলাদেশের মানুষকে অভিনন্দন জানাই। ওখানকার শিক্ষকদের সম্মান জানাই।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে এর আগে একাধিকবার কেন্দ্রের আমন্ত্রণে উপস্থিত ছিলেন পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। তবে এবার কেন্দ্রীয় সরকার তাকে আমন্ত্রণ জানায়নি বলে ভারতীয় গণমাধ্যমে খবর বেরিয়েছে।