আধুনিক মানুষসত্তা নভেরাকে খুঁজি

স্বয়ংসম্পন্ন আধুনিক মানুষের জীবনযাপন করে গেছেন ভাস্কর নভেরা আহমেদ। অসম সমাজব্যবস্থা আর ছায়া সুনিবিড় ব-দ্বীপ অঞ্চলে নভেরা আহমেদের জন্ম। নামের মতোই ব্যতিক্রম তার জীবন, দর্শন, কর্মচেতনা। পঞ্চাশের দশক সে সময় একজন নারী শিল্পীর আত্ম-প্রতিষ্ঠার বিদ্রোহ, দৃঢ়তা, সৃজনশীল স্বাধীন অস্তিত্ব ছিল অনেকটাই সংকটাপন্ন। অথচ নভেরা আহমেদ একজন ব্যতিক্রম ব্যক্তিত্ব। তিনি ছিলেন বাংলা ভাষা আন্দোলনের স্মৃতির স্মারক ঢাকার কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের অন্যতম ভাস্কর। চল্লিশের দশকে জন্ম নভেরা আহমেদের। শৈশব, কৈশোর আর তারুণ্য কাটিয়েছেন চট্টগ্রাম, কুমিল্লা ও কলকাতায়। পঞ্চাশের দশকের শুরুতে লন্ডনে চলে যান। সেখানে ক্যাম্বারওয়েল স্কুল অব আর্টস অ্যান্ড ক্র্যাফটসের মডেলিং ও স্ক্যাল্পচার বিভাগে ভর্তি হন, দেশে ফিরে এসে ১৯৫৭ সালে হামিদুর রহমানের সঙ্গে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারের নির্মাণকাজ, ১৯৫৮ সালে ঢাকায় প্রথম ‘মুক্তাঙ্গন ভাস্কর্য’ তৈরি এবং হামিদুর রহমানের সঙ্গে যৌথ প্রদর্শনী, ১৯৬০ সালে ঢাকায় প্রথম একক প্রদর্শনী, ১৯৬১ সালে লাহোরে জাতীয় চিত্রকলা, ভাস্কর্য ও ছাপচিত্র প্রদর্শনীতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পুরস্কৃত হওয়া, শাস্ত্রীয় নৃত্যে তালিম লাভ করেন।

যুদ্ধের ভয়াবহতা নভেরাকে ভাবিয়েছে। যুদ্ধের ধ্বংসাবশেষ সংগ্রহ করে তৈরি করেছেন ভাস্কর্য। কখনো ভিয়েতনাম যুদ্ধে ক্ষতবিক্ষত বিমানের অংশবিশেষ আবার কখনো টুইন টাওয়ারে ধ্বংসের দিনে মানুষকে বাঁচাতে এগিয়ে আসা ফায়ার সার্ভিসের কর্মীদের করুণ, ধূসর আর সুন্দরের প্রতিচ্ছবি। নভেরা বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ঘুরেছেন। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেননি। কেন ফিরে আসেননি নভেরা? তা অনেকটা অজানা। তার কর্মচেতনা আমাদের চর্চার বাইরে। তার দর্শন আমাদের কাছে পৌঁছানোর ঠিকঠাক আনুষ্ঠানিক পরিবেশ পেয়ে ওঠেনি। নভেরা আধুনিক স্বাধীন মানুষসত্তা, শিল্পীসত্তা ও নারীসত্তা। অথচ আমরা যেন তার থেকে যোজন যোজন দূরে। আজ যে আধুনিক মানুষ হওয়ার কথা বলা হচ্ছে, সেখানে নভেরা অনাদৃত উদাহরণ।

কলাতাত্ত্বিক শিকোয়া নাজনীন ‘আলোকচিত্রের নভেরা’ প্রবন্ধে লিখেছেন ‘মানুষ যেমন করে প্রভু হয় দাস-সম্পত্তির, শিল্প-সম্পত্তির, নভেরাও এক রকম সম্পত্তি হিসেবে সামাজিক এবং রাজনৈতিক অবরুদ্ধতার প্রতীক হয়ে ওঠেন এ বাংলায়। নভেরার স্বাধীন জীবনযাপন, তার ব্যক্তিগত পোশাকপরিচ্ছদ, তার শিল্প অন্বেষণ, তার ভাস্কর্য আমরা আজ স্নিগ্ধ দৃষ্টিতে দেখলেও পঞ্চাশের দশকে একজন নারী শিল্পীর আত্ম-প্রতিষ্ঠার বিদ্রোহ, দৃঢ়তা, সৃজনশীল পৃথিবী কিছুতেই মানব-স্বভাব বলে বিধৃত হয়নি। এসবকে কেউ তার জৈবিক বা সাংস্কৃতিক উত্তরাধিকারও ভাবতে পারেনি। তিনি ছিলেন বিপ্রতীপ শক্তির বিপরীতে ক্রুদ্ধ দাবানল। তার সত্য অন্বেষণ, স্বয়ংসম্পূর্ণ আধুনিক মানুষের মতো আপসহীন জীবনযাপন, যা অন্যদের কাছে রোমাঞ্চকর হিসেবে প্রতিপন্ন হয়েছিল। একজন সুন্দর নারী শিল্পীর জীবন-সংগ্রাম শুধু আখ্যানের পুঁজি হয় এ বাংলায়।’

কেবল সেই অখ্যানের ভেতরে থাকে না নভেরার সংগ্রামের ইতিহাস। পাকিস্তান আমলে ‘আইয়ুব খানের শাসনামলে’ নভেরার ভাস্কর্য ভেঙে দেওয়া হয়েছিল। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের খোলা জায়গায় ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়েছিল তার ভাস্কর্য। এখন সেসব কথা স্মরণ করতে গেলে মনে হতে পারে সেসব কীর্তি কি কালের অনাচারের দিকে আঙুল তুলেছিল? সিলভিয়া নাজনীনের তথ্যচিত্র ‘ভাস্কর নভেরা আহমেদের শিল্প, জীবন, মূল্যায়ন ও অবমূল্যায়নের গল্প’-এ প্রথম আলোর সম্পাদক বলেন, ষাটের দশকে ছাত্র আন্দোলনের যে পটভূমি তৈরি হয়েছিল। ১৯৬৩ সালে যে সময় আমি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরিতে যাই, তার পেছনে ছোট একটা খাবারের দোকান ছিল (শরীফ মিয়ার ক্যান্টিন) সেখানে দেখতাম উন্মুক্ত জায়গায় এলোমেলোভাবে পড়ে আছে নভেরার ভাস্কর্য। অবহেলিত-অনাদৃত।’

নভেরার ভাস্কর্যে প্রাধান্য পেত পরিবার, গোষ্ঠী, মানুষে মানুষে বন্ধনের চিরচেনা রূপ। প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন এনেছিলেন নিজস্ব চিন্তায়। সিলভিয়া নাজনীনের তথ্যচিত্রে স্থপতি শামসুল ওয়ারেস বলেন, ‘স্ক্যাল্পচার কীভাবে করতে হয়, টেকনিক, সেটা তিনি শিখেছেন কার্ল ভোগলের কাছ থেকে। কিন্তু আইডিয়া অর্থাৎ এক্সপ্রেশনিজমের ভেতরে তিনি কী নিয়ে কাজ করবেন, তার স্ক্যাল্পচারের ফরমাল যে ধরন সেটা হেনরি মুরের কাছ থেকে এসেছে। মুর যে কাজটি করছিলেন কার্ল ভোগলদের চেয়ে অনেকটা অ্যাডভান্সড হয়ে তিনিও নির্যাতিত মানুষের কথাই বলছিলেন। আরেকটা বিষয় ছিল প্রান্তিক মানুষ। যেমন দুর্ভিক্ষের সময় জয়নুল আবেদীন যে ছবিগুলো এঁকেছিলেন সেটা। এগুলোর সব ইনফ্লুয়েন্স নভেরা আহমেদের মধ্যে ছিল।

তিনি আরও বলেন, নভেরা আহমেদ, ১৯৫৬ থেকে ৬০ পর্যন্ত তিনি একশটি স্ক্যাল্পচার করেছেন। স্ক্যাল্পচারের গঠন এবং এর ম্যাটেরিয়াল আস্তে আস্তে তিনি একটা নিজস্বতা আনেন। কোনো একটা বড় শিল্পীর কাজে প্রথমে একটা ইনফ্লুয়েন্স থাকে, পরে আস্তে আস্তে সেটাকে নিজের একটা স্টাইল, স্বকীয়তা আসে। এরপর তিনি ইনফ্লুয়েন্স নিয়েছেন গ্রামবাংলা থেকে। সিমেন্টে স্ক্যাল্পচার করা যায় এটা নভেরার একটা আবিষ্কার। একই তথ্যচিত্রে প্রথম আলো সম্পাদক ও শিল্পসংগ্রাহক মতিউর রহমান বলেন, ‘নভেরা আহমেদের কথা যখন ভাবি আমার খুব মনে পড়ে অমৃতা শেরগিলের কথা। ভারতে জাতীয়ভাবে স্বীকৃত অন্যতম প্রধান শিল্পী অমৃতা শেরগিল। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তার দ্বারা প্রভাবিত হয়েছিলেন। ম্যাক্সিকান শিল্পী ফ্রিদা কাহালোর কথা মনে পড়ে। ফ্রিদা কাহালো পোলিও রোগে আক্রান্ত ছিলেন। আঠারো বছর বয়সে ভয়ংকর সড়ক দুর্ঘটনায় তার পিঠ, কোমর এবং পা ভীষণভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। প্রায় সারাজীবন পঙ্গু জীবনযাপন করেন। ফ্রিদা কাহালো বামপন্থি ছিলেন, কমিউনিস্ট ছিলেন। আমৃত্যু তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য ছিলেন। সব কাজের পেছনে তার উৎসাহ ছিল শ্রমজীবী মানুষের মুক্তি। আমরা যদি একটা বিশ্ব প্রেক্ষাপটে দেখি, নভেরার সময়, নভেরার কাজ এবং সেখানে অমৃতা শেরগিল, ফ্রিদা কাহালোর শিল্পমূল্য যাচাই করে যদি দেখি তাহলে দেখব নভেরার নিজের কাজের প্রতি তার বিশ্বাস, আস্থা, স্বাধীনতা, উদ্যোগ, সাহস এসব ক্ষেত্রে তুলনা করা যায়।’

নভেরা এখানে যেটুকু উচ্চারিত হন তিনি তার ব্যক্তিজীবনের কারণে অনেকটা তুচ্ছ, তাচ্ছিল্য আর সমাজের সঙ্গে খাপ খাওয়াতে না পারা এক রূপ ধারণ করেন সেসব আলোচনায়। আড়ালেই থেকে যায় নভেরার জীবনোচ্ছ্বাস, স্রোত, গন্তব্য আর গতিপথ। কতদূর গেল যে, কেন গেল, কেন আর ফিরল না তা আড়ালেই পড়ে থাকে। নভেরা দেশে ফেরেননি এ কথা যেমন সত্য, তিনি সারাজীবন বাংলাদেশের পাসপোর্ট বহন করেছেন এ কথাও সত্য। সম্প্রতি লালমাটিয়ার শিল্পাঙ্গন গ্যালারিতে ১৫ নারী শিল্পীর ‘নভেরার খোঁজে’ প্রদর্শনী হয়েছে। এ প্রদর্শনীর বাছাই-বিন্যাসের দায়িত্বে ছিলেন শিকোয়া নাজনীন। ভাস্কর নভেরার জীবনযন্ত্রণাকে তিনি প্রদর্শনীর দেয়ালে চিত্রায়িত করেছেন। এই প্রদর্শনী আমাদের সামনে নিয়ে এসেছে সাহসে, সৌন্দর্যে, প্রথা ভাঙায় মূর্ত হয়ে ওঠা বাংলার এক সাহসী-স্বাধীনসত্তা নভেরা আহমেদকে। বলা যায়, নভেরা আমাদের কাছে সেই বৈশিষ্ট্য, যা নিজের কাজের প্রতি বিশ্বাস, আস্থা, স্বাধীনতা, উদ্যোগ আর সাহস ধরে রাখার প্রেরণা জোগায়। এই প্রদর্শনী আমাদের আরও একটি বার্তা দিয়ে যায়, ‘নভেরাকে জানো, নিজেকে প্রশ্ন করো’।

লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক

swarolipi2011@gmail.com