আন্তর্জাতিকমানের হেলিপোর্ট নির্মাণ সম্ভব হচ্ছে না অর্থের অভাবে। প্রস্তাবিত হেলিপোর্ট নিয়ে নানা জায়গায় টাকা পাওয়ার চেষ্টা করেছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষ (বেবিচক), কিন্তু পায়নি। বিভিন্ন এয়ারলাইনস কোম্পানির কাছে পাওনা প্রায় ৬ হাজার কোটি টাকা। এ টাকা আদায় করতে পারছে না সংস্থাটি। চিঠির পর চিঠি দেওয়া হয়েছে, কিন্তু টাকা আদায় করতে পারছে না বেবিচক। করোনা মহামারীর কারণেও বেশ সমস্যা হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীকে সংশ্লিষ্ট প্রকল্পের বিষয়ে অবহিত করা হয়েছিল। শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের পূর্বপাশে কাওলায় প্রায় ১০০ বিঘা জমির ওপর হেলিপোর্ট নির্মাণের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল। এ জন্য ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৫০০ কোটি টাকা। হেলিপোর্টটি নির্মিত হলে অন্তত ৮০টি হেলিকপ্টার একসঙ্গে অবস্থান করতে পারবে।
এভিয়েশন-বিশেষজ্ঞরা দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ক্রমবর্ধমান এবং অসহনীয় যানজট এড়াতে সমর্থ ব্যবসায়ী, বিদেশি বিনিয়োগকারীরা বিকল্প পথ খুঁজছে। করপোরেট লেভেলেও বাড়ছে হেলিকপ্টারের ব্যবহার। সিনেমার শ্যুটিং, রাজনৈতিক সভা-সমাবেশ, রোগী আনা-নেওয়া, বিভিন্ন কোম্পানির বোর্ড মিটিংয়ে যোগদান প্রভৃতি কাজেও এবং এসবের কাভারেজ দেওয়ার প্রয়োজনেও হেলিকপ্টার ব্যবহারের আবশ্যকতা তৈরি হয়েছে। অনেকে বিমানবন্দর থেকে ঢাকায় আসা-যাওয়ায় হেলিকপ্টার ব্যবহার করেন। প্রতিবার উড্ডয়নের জন্য সিভিল এভিয়েশনের অনুমতি নিতে হয়। জ¦ালানি-সংকটের কারণে বন্ধ রাখতে হচ্ছে ফ্লাইট। তারপরও সরকার বিকল্প উপায় বের করার চেষ্টা করছে। হেলিপোর্ট নির্মাণে বেবিচকের উদ্যোগ প্রশংসনীয়। এ উদ্যোগে সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। প্রকল্পটি হলে দেশের জন্যই লাভ, বলেছেন এভিয়েশন-বিশেষজ্ঞরা।
জানতে চাইলে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান এয়ার ভাইস মার্শাল মফিদুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সবার সহযোগিতা পেলে হেলিপোর্ট নির্মাণ করা সম্ভব হবে। নানা কারণে নির্মাণকাজ বিলম্বিত হচ্ছে। নানা জটিলতা সত্ত্বে¡ও প্রকল্প শুরু করার পরিকল্পনা আছে।’ সংশ্লিষ্টরা দেশ রূপান্তরকে জানায়, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের গোল চত্বর-লাগোয়া এলাকায় রেললাইনের পূর্বপাশে বেবিচকের নিজস্ব জমিতেই হেলিপোর্ট নির্মাণের সিদ্ধান্ত হয়। প্রকল্পের প্রধান তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করবেন বেবিচকের পরিচালনা পর্ষদের এক সদস্য।
দেশে হেলিকপ্টারের বাণিজ্যিক ব্যবহার বাড়ছে। যাত্রীসংখ্যাও বাড়ছে। আগে সাধারণত করপোরেট কোম্পানিগুলোর শীর্ষ কর্মকর্তা এবং তাদের বায়াররা এ সেবা নিলেও এখন সমাজের উচ্চবিত্তদের মধ্যেও হেলিকপ্টার-ভ্রমণ বেড়েছে। চড়া দামে টিকিট কেটে মানুষ হেলিকপ্টার ব্যবহার করছে।
বেবিচকের পৃষ্ঠপোষকতায় হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে বেসরকারি হেলিকপ্টার চালনাকারী সংস্থাগুলো নিজস্ব উদ্যোগে স্থাপনা তৈরি করে কপ্টার-অপারেশন চালাচ্ছিল। থার্ড টার্মিনাল তৈরির কারণে এটি সরিয়ে নেওয়া হয়, তবে শাহজালাল বিমানবন্দরেই আছে। যেভাবে হেলিকপ্টার-নেটওয়ার্ক ও ব্যবসা বাড়ছে তাতে ভবিষ্যতে এ সেবার অপারেশনাল কাজের আরও বিস্তৃতি ঘটবে। তখন পরিস্থিতি সামাল দেওয়া বেশ কঠিন হবে।
সম্ভাব্য এ বাস্তবতার নিরিখে বেবিচক চেয়ারম্যান পূর্ণাঙ্গ হেলিপোর্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে একটি প্রস্তাব প্রধানমন্ত্রীর কাছে উত্থাপন করেন। তার অনুমতি ও সর্বাত্মক সহায়তার আশ্বাস মিলেছে। তারপর হেলিপোর্ট নির্মাণ প্রকল্পের কাজে তোড়জোড় শুরু হয়।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে বেবিচকের এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, বেবিচক চেয়ারম্যান খুবই আন্তরিক হেলিকপ্টার পোর্টটি নির্মাণ করার ব্যাপারে। কিন্তু নানা কারণে তা সম্ভব হচ্ছে না। তিনি বলেন, ‘আমাদের টার্গেট ছিল বিভিন্ন এয়ারলাইনসের কাছে পাওনা অর্থ দিয়ে কাজ করার। টাকা পরিশোধের জন্য বারবার তাগাদা দেওয়ার পরও সায় দিচ্ছে না এয়ারলাইনসগুলো। অর্থের অভাবেই হেলিপোর্ট তৈরি আপাতত সম্ভব হচ্ছে না। তারপরও চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি।’
জানা গেছে, বারবার তাগাদা দিয়েও বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) পাওনা মেটাচ্ছে না রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠান বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস এবং অন্যান্য এয়ারলাইনস। বছরের পর বছর পাওনা আটকে আছে। বিমানের কাছে বেবিচক পাবে প্রায় সাড়ে তিন হাজার কোটি টাকা। এ টাকার জন্য বেবিচক নিয়মিত চিঠি দিয়ে যাচ্ছে। কবে নাগাদ তা পরিশোধ করা হবে তার নিশ্চয়তা পাওয়া যাচ্ছে না।
বেসরকারি এয়ারলাইনসের কাছে পাওনা প্রায় আড়াইশ কোটি টাকা। তাদেরও চিঠি দেওয়া হয়েছে। বেবিচকের অর্থ বিভাগ থেকে জানানো হয়েছে, ২০১২ সাল থেকে এ পাওনা বকেয়া রয়েছে। সর্বশেষ চিঠিতে এক বছরের মধ্যে পাওনা পরিশোধ করতে বলা হয়েছে। সারচার্জ বাবদ তাদের কাছে বকেয়া ২ হাজার ৩৯৫ কোটি ১০ লাখ ৭৯ হাজার টাকা।
এয়ারলাইনসগুলোর কাছে হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বকেয়ার পরিমাণ ২ হাজার ৬৩২ কোটি ৬ লাখ ৮৬ হাজার টাকা। চট্টগ্রামের শাহ আমানত বিমানবন্দরের বকেয়া ৫২৩ কোটি ৪ লাখ ৪০ হাজার টাকা। সিলেট ওসমানী আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর পাবে ৩৮৮ কোটি ৭২ লাখ ৫৯ হাজার টাকা। যশোর বিমানবন্দরের পাওনা ১৯ লাখ ৮৭ হাজার, বরিশাল বিমানবন্দরের পাওনা ৫ লাখ ৬৮ হাজার, কক্সবাজার বিমানবন্দরের পাওনা ১ কোটি ৪৬ লাখ ৪১ হাজার, সৈয়দপুর বিমানবন্দরের পাওনা ১৫ লাখ ৩৪ হাজার ও রাজশাহীর শাহ মখদুম বিমানবন্দরের পাওনা ১৫ লাখ ৮৫ হাজার টাকা।
বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী আবদুল মালেক দেশ রূপান্তরকে বলেছেন, ‘হেলিপোর্টটি নির্মাণ করতে আমরা নানাভাবে চেষ্টা করছি। আইকাও গাইডলাইন অনুযায়ী সব ধরনের শর্ত মেনেই তা নির্মাণ করতে হবে। পরামর্শক নিয়োগের ক্ষেত্রে বিদেশি কোম্পানির সহযোগিতা নেওয়া হবে। হেলিপোর্টটি নির্মাণ করতে পারলে অনেক সুবিধা। দেখা যাক কীভাবে নির্মাণ করা যায়।’
বেবিচকের অন্য এক কর্মকর্তা দেশ রূপান্তরকে বলেন, ‘সর্বপ্রথম সাউথ এশিয়ান এয়ারলাইনস বাণিজ্যিক লাইসেন্স নিয়ে কপ্টার-ব্যবসা চালু করে। এখন ৯টি কোম্পানির ২৭টি হেলিকপ্টার রয়েছে। কোম্পানিগুলো আরও হেলিকপ্টার আনার জন্য বেবিচকে আবেদন করেছে। হেলিপোর্ট নির্মাণ করতে আমরা আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছি।’