আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস ও বাংলাদেশ প্রসঙ্গ

চীনের উপকথা অনুসারে ড্রাগনমুখো লোক সা-চিয়েন প্রাচীন চীনা ক্যারেক্টারগুলো (অক্ষর) তৈরি করেছিলেন। পাখির মতো মাথা ও মানুষের মতো দেহবিশিষ্ট দেবতা থথ্ কর্র্তৃক মিসরীয় লিপিসমূহের সৃষ্টির কথাও প্রচলিত আছে। প্রাচীন ফিনিশীয় লিপি, হায়ারোগ্লিফিক, কিউনিফর্ম ও ব্রাহ্মী প্রভৃতি লিপির উদ্ভাবনই আধুনিক সভ্যতার লিখন পদ্ধতির ভিত্তিভূমি। ব্রাহ্মী, কুষাণ, কুটিল, নাগরি লিপিসমূহ বাংলা লিপির আধুনিকায়নে বিভিন্ন স্তর হিসেবে কাজ করেছে। লিখন পদ্ধতির উদ্ভাবন এবং তার পরবর্তী চর্চাই সাক্ষরতা প্রত্যয়টিকে আমাদের সামনে নিয়ে আসে, যার সরলীকৃত অর্থ পড়া ও লেখার সক্ষমতা। জাতিসংঘ শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতি সংস্থা (ইউনেসকো) ১৯৯৩ সালে সাক্ষরতার সংজ্ঞা নির্ধারণ করে। সেখানে বলা হয় মাতৃভাষায় ছোট বাক্য পড়া, লেখা ও দৈনন্দিন হিসাব-নিকাশের জ্ঞানই সাক্ষরতা। বর্তমান পৃথিবীতে প্রযুক্তির আধুনিকায়ন মানুষের শিক্ষিত হওয়ার সুযোগকে বাড়িয়ে দিয়েছে অনেকাংশেই। ১৯৪৮ সালে ঘোষিত জাতিসংঘের মানবাধিকার ঘোষণার ২৬ নম্বর ধারায় সুস্পষ্টভাবে সাক্ষরতার কথাটি উল্লেখ করা হয়েছে। এ ছাড়া জাতিসংঘ ঘোষিত টেকসই উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রার (এসডিজি) ৪ নম্বর লক্ষ্যমাত্রায় ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের সব পূর্ণবয়স্ক নারী-পুরুষ এবং প্রবীণ জনগোষ্ঠীর একটি উল্লেখযোগ্য অংশের সাক্ষরতা ও হিসাব-নিকাশে দক্ষতা অর্জনের কথা বলা হয়েছে।

খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসার মতো শিক্ষাও মৌলিক চাহিদাগুলোর মধ্যে একটি, যা মানুষের সুকোমল বৃত্তিগুলোকে বিকশিত করে প্রস্ফুটিত করে। শিক্ষা গ্রহণের প্রাথমিক পর্যায় হলো সাক্ষরতা, যা ব্যক্তির ক্ষমতায়ন, সামাজিক ও মানবীয় উন্নয়নের অন্যতম হাতিয়ারও বটে। জাতিসংঘের শিক্ষা, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতিবিষয়ক সংস্থা ইউনেসকোর উদ্যোগে ১৯৬৫ সালে ইরানের রাজধানী তেহরানে অনুষ্ঠিত হয় বিশ্ব সাক্ষরতা সম্মেলন। পরে ১৯৬৫ সালে ইউনেসকো প্রতি বছরের ৮ সেপ্টেম্বরকে বিশ্ব সাক্ষরতা দিবস হিসেবে পালনের ঘোষণা দেয় এবং ১৯৬৬ সালে ইউনেসকো প্রথমবারের মতো বিশ্বে দিবসটি পালন করে। স্বাধীনতা লাভের পর ১৯৭২ সাল থেকে বাংলাদেশও দিবসটি যথাযোগ্য মর্যাদায় পালন করছে। আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস শুধু তার প্রতিপাদ্য বিষয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ না, এর সঙ্গে জড়িত বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিক্ষাব্যবস্থার স্বরূপ বিশ্লেষণ এবং পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর এগিয়ে যাওয়ার অদম্য আকাক্সক্ষা।

বিশ্বায়নের এ যুগে জনসংখ্যা বৃদ্ধির সঙ্গে পাল্লা দিয়ে সাক্ষরতা এবং শিক্ষার হার বাড়ছে। বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী ১৯৭৬ সালে পৃথিবীতে সাক্ষরতার হার ছিল ৬৭%, যা ২০০১ সালে ৮১%-এ উন্নীত হয়। সর্বশেষ ২০২০ সালে বিশ্বের সাক্ষরতার হার এসে দাঁড়িয়েছে ৮৭%, যেখানে বিশ্বে পুরুষের সাক্ষরতার হার ৯০% এবং নারী সাক্ষরতার হার ৮৩%। ২০২০ সাল পর্যন্ত বিশ্বে ১৫ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের সাক্ষরতার হার ৯৮%, যার মধ্যে পুরুষদের সাক্ষরতার হার ৯৩% এবং নারীদের সাক্ষরতার হার ৯১%। সিআইএর ওয়ার্ল্ড ফ্যাক্টবুক অনুসারে ২০১৬ সাল পর্যন্ত ৭৫০ মিলিয়ন পূর্ণবয়স্ক নিরক্ষর মানুষ দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার সাব-সাহারান এলাকায় বাস করছে, যা বিশ্বের মোট পূর্ণবয়স্ক নিরক্ষর জনসংখ্যার তিন-চতুর্থাংশ। জনশুমারি ও গৃহগণনা ২০২২ অনুযায়ী দেশে সাক্ষরতার হার ৭৪.৬৬%।

একটি দেশের ধারাবাহিক উন্নয়নের মূল প্রভাবক হিসেবে কাজ করে সাক্ষরতা। উন্নয়ন ও সাক্ষরতা কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে এগিয়ে চলে। যে দেশে সাক্ষরতার হার বেশি, সে দেশ তত উন্নত। ফিনল্যান্ড, নরওয়ে, লুক্সেমবার্গের মতো ইউরোপের দেশগুলো আয়তনে ছোট হলেও সাক্ষরতার হার শতভাগ হওয়ায় তাদের জনগণ উন্নয়নের সুফল ভোগ করছে। অন্যদিকে মালি, নাইজার, সোমালিয়ার মতো তুলনামূলক বৃহদায়তনের আফ্রিকান দেশগুলোতে সাক্ষরতার হার অনেক কম হওয়ায় তারা ক্ষুধা, দারিদ্র্যসহ বিভিন্ন সামাজিক সমস্যায় জর্জরিত। অর্থনীতি ও জনসংখ্যায় বৃহৎ দেশগুলো তাদের সাক্ষরতার হার বৃদ্ধির জন্য নানামুখী কর্মসূচি গ্রহণ করছে। বৃহৎ জনসংখ্যার দেশ ভারত ২০২২ সালের মধ্যে দেশে সাক্ষরতার হার শতভাগে উন্নীত করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তার সুদূরপ্রসারী চিন্তার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পেরেছিলেন দেশকে গড়তে সাক্ষরতা তথা শিক্ষার কোনো বিকল্প নেই। এরই পরিপ্রেক্ষিতে স্বাধীনতা লাভের পরপরই ১৯৭২ সালে তিনি বাংলাদেশে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা দিবস পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন। ১৯৭৩ সালে জাতির পিতা সবার জন্য প্রাথমিক শিক্ষাকে জাতীয়করণ ও অবৈতনিক ঘোষণা করেন। ১৯৭৪ সালে প্রকাশিত ড. কুদরত-ই খুদা শিক্ষা কমিশন রিপোর্টে দেশে সাক্ষরতা কার্যক্রমের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জীবদ্দশায় ১৯৭৪ সালে বাংলাদেশের সাক্ষরতার হার ছিল ২৬.৮৩%। এর আগে যখন দেশে এ দিবসটি পালনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় তখন সাক্ষরতার হার ছিল আরও কম। ১৯৭৫ সালে ‘বাংলাদেশ সাক্ষরতা সমিতি’ গঠনের মাধ্যমে ১৮টি জেলার ৬৮টি থানার ৩২৫টি গ্রামে গণশিক্ষা কেন্দ্র চালু করা হয় এবং এর মাধ্যমে প্রায় ১৮ হাজার নিরক্ষর মানুষকে সাক্ষরতা দেওয়া হয়। সময়ের সঙ্গে দেশের শিক্ষার হার বাড়তে থাকে। ১৯৮১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ২৫.৯৯%, ১৯৯১ সালে সাক্ষরতার হার বেড়ে দাঁড়ায় ৩২.৪০%, ২০০১ সালে সাক্ষরতার হার ছিল ৪৫.৩২%। সর্বশেষ ২০২২ সালে দেশের সাক্ষরতার হার ৭৪.৬৬%-এ উন্নীত হয়।

বঙ্গবন্ধুকন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বে বর্তমান সরকার ২০৪১ সালের মধ্যে বাংলাদেশকে উন্নত ও সমৃদ্ধ বাংলাদেশ হিসেবে গড়ে তোলার লক্ষ্যে কাজ করছে, যেখানে শিক্ষার হার হবে শতভাগ। উন্নত দেশে রূপান্তরিত হতে হলে জাতিসংঘের নির্ধারিত সূচক ‘দ্য হিউম্যান ইন্ডিকেটর’-সমূহ পূরণ করতে হবে, যার অন্যতম হচ্ছে শতভাগ সাক্ষরতা। ১৯৯৬ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত আনুষ্ঠানিক, উপানুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষা কর্মসূচির মাধ্যমে ১ কোটি ৮০ লাখ নিরক্ষরকে সাক্ষরতা দেওয়া হয়েছে। সাক্ষরতা অর্জনের স্বীকৃতিস্বরূপ ১৯৯৮ সালে ইউনেসকো বাংলাদেশ সরকারকে আন্তর্জাতিক সাক্ষরতা পুরস্কার দেয়। নারী ও কন্যাশিশুদের সাক্ষরতা নিশ্চিতকরণ ও এমডিজি লক্ষ্যমাত্রা পূরণে অসামান্য অবদানের জন্য ২০১৪ সালে ইউনেসকো প্রধানমন্ত্রীকে ‘পিস অব ট্রি’ বা ‘শান্তিবৃক্ষ’ পদকে ভূষিত করে।

শিক্ষার সুযোগবঞ্চিত জনগোষ্ঠীকে সাক্ষরতা দান, জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিকরণ, কারিগরি ও বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে কর্মসংস্থান, দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর প্রভৃতি লক্ষ্যে ২০১৪ সালে উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা আইন প্রণীত হয়েছে এবং উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা বোর্ড গঠন করা হয়েছে। উপানুষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যুরো দেশে নিরক্ষরতা দূরীকরণে ১৫ থেকে ৪৫ বছর বয়সী প্রায় ৪৫ লাখ লোককে সাক্ষরতাজ্ঞান প্রদান করছে। প্রাক-প্রাথমিক ও প্রাথমিক পর্যায়ে শিক্ষা নিশ্চিতকরণে চতুর্থ প্রাথমিক শিক্ষা উন্নয়ন কর্মসূচি (পিডিইপি-৪) চলমান। নিরক্ষরতা দূরীকরণে শিশুদের প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির হার শতভাগে উন্নীতকরণ, ঝরে পড়া রোধ ও মানসম্মত শিক্ষা প্রদানে বিনামূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, উপবৃত্তি প্রদান, মিড-ডে মিল, বিদ্যালয়সমূহের অবকাঠামো উন্নয়নসহ বিভিন্ন কর্মসূচি পালন করে যাচ্ছে। এসডিজি-৪-এর লক্ষ্য ‘অন্তর্ভুক্তিমূলক, সমতাপূর্ণ ও মানসম্মত শিক্ষা নিশ্চিত করা এবং সবার জন্য জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টি’ অষ্টম পঞ্চবার্ষিকী পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।

বিশ্বের সব দেশের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় শিক্ষার হার যখন উল্লেখযোগ্য হারে বাড়ছিল, তখনই কভিড-১৯ শিক্ষাব্যবস্থাকে থমকে দিয়েছে। করোনা মহামারীর প্রভাবে প্রায় ২.৪ কোটি শিশু ঝরে পড়ার শঙ্কায় আছে। (সূত্র : ইউনেসকো অ্যাডভোকেসি পেপার ২০২০) বৈশি^ক এই মহামারীর কবলে বিশ্বে ১৯৮টি দেশে বন্ধ ছিল অসংখ্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। ইউনেসকোর মতে, মহামারীর এ সময় স্কুলে যেতে পারেনি কোটি কোটি শিক্ষার্থী। এশিয়ায় শিক্ষা খাতের ওপর ইউনিসেফ ও ইউনেসকো প্রকাশিত ‘কভিড-১৯-এর প্রভাব ও মোকাবিলা কার্যক্রমবিষয়ক পরিস্থিতি বিশ্লেষণ’ প্রতিবেদনে বলা হয় দক্ষিণ এশিয়া, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও পূর্ব এশিয়ার প্রায় ৮০ কোটি শিশুর পড়াশোনা সরাসরি বিঘিœত হয়েছে। বাংলাদেশে এ সংখ্যাটি ৩ কোটি ৭০ লাখ, যা বিশ্বে চতুর্থ সর্বোচ্চ। (সূত্র : ইউনিসেফ) তবে বর্তমান ডিজিটাল যুগে অনলাইনের মাধ্যমে শিক্ষা কর্মসূচি চালিয়ে নেওয়ার চেষ্টা হয়েছে। অনলাইনে শিক্ষাদান কর্মসূচির পাশাপাশি সংসদ বাংলাদেশ টেলিভিশন এবং বাংলাদেশ বেতার ও সব কমিউনিটি রেডিওতে ‘এসো ঘরে বসে শিখি’ অনুষ্ঠান পরিবেশিত হচ্ছে নিয়মিত। কভিড-১৯ পরিস্থিতি এখন অনেকটাই নিয়ন্ত্রণে। তাই অধিকাংশ দেশই তাদের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমূহ খুলে দিয়েছে এবং শিক্ষাব্যবস্থা অনেকটাই স্বাভাবিকভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। দীর্ঘ ১৭ মাস বন্ধ থাকার পর বাংলাদেশও খুলে দিয়েছে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো। দেশের সাক্ষরতা বৃদ্ধি ও শিক্ষার মানোন্নয়নে সরকারি কর্মসূচিগুলোর পাশাপাশি বেশ কিছু বেসরকারি সংস্থা, এনজিও এবং ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রতিষ্ঠান গড়ে উঠেছে।

বর্তমান বিশ্ব প্রযুক্তিগতভাবে অনেক এগিয়ে গেছে। এ সময় শুধু অক্ষর বা বাক্য লিখতে, পড়তে পাড়া ও গণিতের জ্ঞানসম্পন্ন প্রচলিত সাক্ষরতার গুরুত্বও কমে এসেছে। ব্যবহারিক ও প্রযুক্তিগত সাক্ষরতা না থাকলে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলা ও শিক্ষার গুণগত মান নিশ্চিত করা প্রায় অসম্ভব। দারিদ্র্য হ্রাস, শিশুমৃত্যুর হার রোধসহ সুষম উন্নয়নের মাধ্যমে শান্তি ও সমৃদ্ধি বিকশিতকরণের ক্ষেত্রে সাক্ষরতা বড় প্রভাবকের কাজ করে। বর্তমানের এ বদলে যাওয়া কভিড পরিস্থিতিতে আমাদের নতুন নতুন প্রযুক্তি ও পদ্ধতি প্রয়োগ করে শিক্ষাব্যবস্থাকে আরও এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে এবং প্রান্তিক মানুষের কাছে সাক্ষরতার উপযোগিতা বিভিন্ন কর্মসূচির মাধ্যমে পৌঁছে দিতে হবে।

লেখক: সামরিক বাহিনীতে কর্মরত