আজ থেকে পঞ্চাশ বছর আগে, অক্টোবর ১৯৭২ সালে, শামসুর রাহমান তার এক গদ্যরচনায়, আবদুল মান্নান সৈয়দকে একজন ‘খ্যাতিমান কবি, কথাশিল্পী এবং নিবন্ধকার’ হিসেবে অভিহিত করেছিলেন। কথাটার যৌক্তিকতা যে ষোলআনা, সেটি অস্বীকার করার উপায় সেদিনও ছিল না, আজও নেই। সবকিছু মিলিয়েই আবদুল মান্নান সৈয়দের সাহিত্যচর্চার সামগ্রিকতা প্রকাশিত হয়েছে। এটি তার চরিত্রের চলিষ্ণুতারই একটি অনুপম দৃষ্টান্ত। যা তার সমসাময়িক সাহিত্যিকদের মধ্যে খুব বেশি-একটা আমরা দেখিনি। শুধুই তার সমসাময়িকদের কথা বলছি কেন, বলা যায়, গোটা বাংলাদেশের সাহিত্যে অনন্যমনার এমন উদাহরণ একদমই কম।
২. সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় তিনি কাজ করেছেন ঠিকই, তারপরও আমাদের মনে কৌতূহল জাগে যে, আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রধান পরিচয়টা কী? অন্তত তিনি নিজেকে কী মনে করতেন? এই প্রশ্নের জবাব দিতে গিয়ে মান্নান সৈয়দ বলেছিলেন, ‘কবিতা লেখার সময় কবি, গল্প লেখার সময় গল্পকার, প্রবন্ধ লেখার সময় প্রাবন্ধিক এইরকম’ মনে হয়। তার নিজের ভাষ্যমতে, এই ‘সব মিলিয়েই আমি। আমার সত্তার সমস্তটাই এগুলি। অনেক পাপড়ি নিয়ে একক ফুল।’ মান্নান সৈয়দের কথা থেকে আমরা বুঝে নিতে পারি যে, তিনি আনন্দের সঙ্গে সাহিত্যের বিভিন্ন মাধ্যমের মধ্য দিয়ে নিজের আবেগ, অনুভূতি আর অভিজ্ঞতাকে প্রকাশ করতে চেয়েছিলেন। নিজের সম্পর্কে রবীন্দ্রনাথ বলেছিলেন, ‘আসলে আমি তো কর্মী নই; আমি কবি, আমি শিল্পী। কবিতা লিখেছি, গল্প লিখেছি, গান বেঁধেছি, ছবিও এঁকেছি।’ আর সেই সূত্র ধরেই তিনি এটাই বলতে চেয়েছিলেন, ‘এই তো আমার তিন পর্যায় সাহিত্য, গান, ছবি। এদের ভিতর দিয়ে আমি প্রকাশ করেছি আমাকে, আমার আনন্দকে। মনে হচ্ছে ব্যর্থ হইনি আমি... যাবার সময় এই বিশ্বাস যদি নিয়ে যেতে পারি, তবে বুঝব কিছু পেলাম।’ তার মানে হচ্ছে, এইসব সৃষ্টিশীল কাজে বিরোধ ও বিপরীতের একটি অবস্থা যেমন রয়েছে, তেমনই আবার বিরোধের মধ্যেও আছে সংহতি এবং ঐক্য বিষয়ের ঐক্য, ভাবের ঐক্য, গঠন-কাঠামোর ঐক্য। এর মধ্যে একজন সাহিত্যিকের ভালো লাগার ব্যাপার যেমন আছে, তেমনই আছে আনন্দের একটা অভিন্ন ও আন্তরিক তাগিদ। যে-কারণে আচার্য নন্দলাল বসু বলতেন, ‘ভালো লাগায়, ভালোবাসায় আনন্দের তাগিদ হতে যা করা যায়, তাতে অহঙ্কার নাই, তাতে জ্ঞান ইত্যাদি তো সব আপনি হয়ে যায়।’ কীভাবে ও কেন সেটা আপনা-আপনি হয়ে যায়? এর উত্তরে তিনি বলেছিলেন, ‘আনন্দ নিজ জ্যোতিতে প্রকাশিত হয়।’ আমরা বলতে পারি, এটিই হচ্ছে শিল্পের সার কথা। এর বাইরে যা কিছুই আমরা বলি না কেন, সেসব বাহুল্য মাত্র।
৩. সাহিত্যের বিভিন্ন শাখায় বিচিত্রভাবে যতই তিনি পদচারণা করুন না কেন, আবদুল মান্নান সৈয়দের প্রধান পরিচয় হচ্ছে তিনি কবি। তিনি নিজেও নিজের এ-বিষয়ে সচেতন ছিলেন। সে-কারণেই ইঙ্গিতে-ইশারায় হলেও বলতে পেরেছিলেন যে, ‘খুব ভালো হতো আমি যদি একটি মাধ্যম নিয়ে চর্চা করতাম।’ তিনি এটিও স্বীকার করেছিলেন যে, ধারাবাহিকভাবে অবিরল কবিতা লিখিনি আমি, কিন্তু কবিতা থেকে সরেও থাকতে পারিনি দীর্ঘদিন।’ তিনি আরও জানিয়েছিলেন, ‘লক্ষ মানুষের স্রোতে পৃথিবীতে এসে আমি আমার নিজস্ব টিপ-ছাপ রেখে যেতে চাই।’ সেই সূত্র ধরেই তিনি বলেছিলেন ‘আমি এসেছিলাম, আমি এসেছিলাম : এই কথা ধ্বনিত হচ্ছে আমার কবিতার হৃৎস্পন্দনে।’
কবির সেই হৃৎস্পন্দনের ধ্বনিত পঙ্ক্তিমালা আমরা প্রথম শুনতে পেলাম তার ‘জন্মান্ধ কবিতাগুচ্ছ’ (১৯৬৭) কাব্যগ্রন্থে। ‘সুবাতাস’ শীর্ষক কবিতার শুরুতেই তিনি জানিয়েছিলেন : ‘কমলালেবুর আলো পেয়েছিলো এখানে সুবিধা,/ ইতিহাস, ভবিষ্যৎউভয়ই যথাযথ ডানা মেলেছিলো একদিন,/ একদিন রাত্রিভোর ছুড়েছে তরল তীর কার্তিক তারার সৈন্যদল :/ চেতনা পায়নি টের শুধু, শিশিরে গিয়ে মন ভিজে/ আবার শুকায় অনন্তের লতা;তখন বুঝেছি/ এসে চলে গেছে সুবাতাস কবে।’
এখানে প্রবল প্রতাপে কবির ওপর রাজত্ব করে চলেছেন জীবনানন্দ দাশ। এইটা কোনো কবির জন্য মোটেও ‘সুবাতাস’ বয়ে যাওয়ার মতো কোনো ঘটনা নয়। কিন্তু এখানে যেটা বলার, তা হচ্ছে মান্নান সৈয়দ তার নিজস্ব কণ্ঠস্বর, নিজস্ব চেতনা-কাঠামো ধীরে-ধীরে রপ্ত করতে সক্ষম হয়েছিলেন। যার স্বাক্ষর আমরা তার পরবর্তী কাব্যগ্রন্থগুলোর মধ্যে স্পষ্টভাবেই দেখতে পেয়েছি। তার ‘পরাবাস্তব কবিতা’ (১৯৮২) কাব্যের একটি কবিতায় দেখতে পাই ‘মসলিন ছিঁড়েছো তুমি ফিনফিনে বৃষ্টির ভিতরে/ অকস্মাৎ নেমে গিয়ে,/ কথা বলে কবিতা ভেঙেছো,/ তুমি কি জানো না/ পরিপূর্ণ ফলটির ভিতরে চলেছে সোনা-পোকা?’ (‘কবি’)। কবিতাটির একেবারে শেষাংশে কবি তার আবেগ ও অনুভূতির শৈল্পিক প্রকাশ এইভাবে ঘটিয়েছেন ‘কবি,/ তুমিই তো সেই সোনা-পোকা/ পৃথিবীর দীর্ঘতম ব্যর্থতম সফরে চলেছো।’
অনেক পাঠকই হয়তো এইসব কবিতায় কবি আদতে কী বোঝাতে চাইছেন, সেই প্রশ্নটি নিয়ে বিব্রত হবেন। কেননা, আমাদের সাহিত্য পাঠের মধ্যে পুরনো সংস্কার অনেকাংশেই প্রবলভাবে জড়িয়ে থাকে। সেদিকে খেয়াল করেই বুদ্ধদেব বসু বলেছিলেন যে, ‘কবিতা সম্বন্ধে “বোঝা” কথাটাই অপ্রাসঙ্গিক। কবিতা আমরা “বুঝিনে”; কবিতা আমরা অনুভব করি। কবিতা আমাদের কিছু “বোঝায়” না; স্পর্শ করে, স্থাপন করে একটা সংযোগ।’ সেইসঙ্গে তিনি এই বিষয়টিও খোলাসা করে বলেছেন, ‘ভালো কবিতার প্রধান লক্ষণই এই যে তা “বোঝা” যাবে না, “বোঝানো” যাবে না।’ পাশাপাশি বুদ্ধদেব বসু বিশদে এইটিও জানিয়েছিলেন, ‘কবিতার ক্ষেত্রে জ্ঞানের কোনো নিজস্ব মহিমা নেই; জ্ঞানের রাসায়নিক সার উজ্জীবিত হয়ে কবিতা হয়ে উঠলে তবে সেটা গ্রাহ্য হয়। শেষ ফল হয় কবিতাই, কবিতাই হচ্ছে আসল।’ ঠিক একইভাবে আবদুল মান্নান সৈয়দ যখন তার গদ্যভাষ্যে বলেন, ‘আমার কবিতার কেন্দ্রীয় চরিত্র সবসময়ই আমি।’ তখন আমরা বুঝে নিতে পারি যে, পাঠকের সঙ্গে একটা ঘনিষ্ঠ সংযোগ তৈরি করাই ছিল এই কবির প্রধানতম লক্ষ্য। এসবের বাইরে তিনি আর কিছুই তেমন-একটা চাননি।
৪. নিজের গদ্য রচনা, বিশেষ করে, সমালোচনামূলক গদ্য সম্পর্কে বলতে গিয়ে আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছেন ‘অধ্যয়ন, অধ্যাপনা, লেখা, সম্পাদনা : এইসব পরস্পরসম্পৃক্ত বিষয় নিয়ে আমি এই দুঃস্বপ্নিল পৃথিবীতে আমার আপন বিশ্ব রচনা করেছি।’ এই ভূমিকাটুকু দেওয়ার পরই তিনি জানিয়েছেন, ‘সমালোচনাত্মক লেখায় আমি মনোনিবেশ করি আমার ষোলো-সতেরো বছর বয়স থেকে। আমার প্রথম প্রেম ছিলেন সুধীন্দ্রনাথ দত্ত।’
কবি নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তার অবিরাম লেখালেখির সূত্রপাত সম্বন্ধে মান্নান সৈয়দ বলেছিলেন, ‘ “নজরুল-রচনাবলি” হাতে পেয়ে ও পড়ে [আমি] নজরুল-বিষয়ে লিখতে শুরু করি।’ তিনি আরও জানিয়েছিলেন যে, নজরুল-রচনাবলি আলোচনা শুরু করেই ‘আমি আমার সমালোচনারীতি আবিষ্কার ও নির্মাণ করি।’ কী সেই আবিষ্কার? এই প্রশ্নের উত্তরে আবদুল মান্নান সৈয়দ বলেছিলেন, সেটি হচ্ছে কাব্যের ‘নিবিড় পাঠের মধ্য দিয়ে শরীর থেকে বিষয়ের আত্মার দিকে যাওয়া।’ তিনি তার সমালোচনার রীতি-পদ্ধতি সম্পর্কে আরও জানিয়েছেন, ‘আমার সমালোচনায় এই শারীরপন্থি রীতি অনুসৃত হয়েছে। আমাদের বিষয়প্রধান সমালোচনার ধারায় আমি এই রীতি প্রবর্তন করেছি।’ নজরুল ইসলাম সম্পর্কে তিনি বলেছিলেন, ‘কবিতামাত্রেই স্বসমুত্থ বটে, তবু নজরুলের কবিতা প্রসঙ্গে এরকম উক্তি তাৎপর্য ধরে রাখে এইখানে যে, তা তাঁর কবিস্বভাবের গভীরদেশ থেকে উত্থিত।’ খানিকটা বিশদে নিয়ে গিয়ে তিনি জানিয়েছিলেন, ‘ঐ কবিস্বভাবে আছে সংরাগের উদ্দীপন : দেশসমাজের জন্যই হোক কি নিসর্গ-দয়িতার স্পর্শেই হোক চিত্ত তাঁর উন্মীল হয়ে ওঠে নীল-উন্মীল।’ তিনি আরও বলেছিলেন, ‘সংরাগী কবিতা-গান তাই তার সর্বাঙ্গে চমৎকার গয়না পরে নেয়। তাই তার ছন্দও হয়ে ওঠে চঞ্চল ও নৃত্যপর।’ এটি আমাদের স্বীকার করতেই হবে যে, কবি নজরুল বিষয়ে এ-রকম গভীর তাৎপর্যপূর্ণ হৃদয়গ্রাহী আলোচনা, এর আগে খুব কম সমালোচকই করতে পেরেছেন। সেই বিবেচনায়, আবদুল মান্নান সৈয়দের সমালোচনা, আমাদের সমালোচনা সাহিত্যকে একটা নতুন দিশা দেখিয়েছে।
আবদুল মান্নান সৈয়দের জীবনানন্দ-সমালোচনার বিষয়ে নতুন করে কিছু বলার জায়গা এইটা নয়। আমরা শুধু এখানে আমাদের অন্যতম প্রধান কবি শামসুর রাহমানের একটি মন্তব্য এখানে উদ্ধৃত করছি। আবদুল মান্নান সৈয়দের ‘শুদ্ধতম কবি’ প্রকাশের পরপরই শামসুর রাহমান বলেছিলেন যে, তার (আ. মা. সৈ.) ‘প্রিয় কবি জীবনানন্দ দাশের বাক্য-পরিচয় বিধৃত হয়েছে “শুদ্ধতম কবি” গ্রন্থে। এই নিষ্ঠাবান তরুণ লেখক জীবনানন্দ দাশের কবি-চারিত্র বিশ্লেষণ করতে গিয়ে যে কাব্যবোধের পরিচয় দিয়েছেন, নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়’। (অক্টোবর : ১৯৭২) একজন তরুণ সমালোচকের জন্য এমন প্রশংসা নিঃসন্দেহে সেদিন উদ্দীপকের কাজ করেছিল, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।
৫. আবদুল মান্নান সৈয়দ বিশ্বাস করতেন যে, সাহিত্যের ‘সমালোচনা শুধু প্রয়োজনীয় নয়, আবশ্যিক। কেননা, সৃষ্টিকে যদি একটি নদীর সঙ্গে তুলনা করা যায়, সমালোচনা তার পাড়। পাড় ছাড়া নদীর ধারণাই সম্ভব নয়।’ আর সে কারণেই তিনি কবিতা-গল্প-উপন্যাস রচনা ও সেসবের পাশাপাশি সাহিত্যসমালোচনাকে একই সৃজনকাজের দুটি ভিন্ন পথে অগ্রগমন হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। বাংলাদেশের সাহিত্যের পথ-পরিক্রমায় এখানেই আবদুল মান্নান সৈয়দের স্বকীয় বৈশিষ্ট্য নিহিত রয়েছে। ৫ সেপ্টেম্বর আমাদের এই গুরুত্বপূর্ণ সাহিত্যিকের প্রয়াণ দিবস। তার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা ও সালাম জানাই!
লেখক: অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়