তৈরি পোশাকের পর সবচেয়ে সম্ভাবনাময় খাত হিসেবে খ্যাত চামড়া ও পাদুকা শিল্প এখন প্রায় বন্ধ হতে বসেছে। বাংলাদেশ সরকারের ঘোষিত অগ্রগণ্য শিল্প খাতের তালিকায় থাকা এ শিল্পের প্রবৃদ্ধি গত দুই যুগে সর্বনিম্নে অবস্থান করছে। গত এক যুগেও সাভারের চামড়া শিল্পনগরীতে কেন্দ্রীয় বর্জ্য পরিশোধন ব্যবস্থা প্রস্তুত না হওয়া চামড়া পণ্য রপ্তানিতে অন্যতম বাধা হিসেবে কাজ করছে। সস্তায় কাঁচামাল পেয়েও পরিবেশ, আন্তর্জাতিক বাজারদর ও দক্ষতার ঘাটতির কারণে ২০১৫-১৬ অর্থবছরের পর থেকে এ শিল্পের টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়েছে।
বাংলাদেশ উন্নয়ন গবেষণা সংস্থার (বিআইডিএস) সাম্প্রতিক এক গবেষণায় উঠে এসেছে এসব তথ্য। বিআইডিএস চামড়া ও পাদুকা খাতের ৯৩টি প্রতিষ্ঠানে জরিপ চালিয়েছে। জরিপে অংশ নিয়েছেন ৯০২ জন মাঠকর্মী।
চামড়া শিল্পে সবচেয়ে অগ্রগণ্য ভূমিকা রাখে ট্যানারি শিল্প। এ জরিপে ৩৮টি ট্যানারির ২ হাজার ২৩২ জন কর্মীর মধ্যে গবেষণা করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ২০১৯ সালে এ খাতের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানের গড় আয় ২৫ কোটি ৭৪ লাখ টাকা, যেখানে রপ্তানি আয় হয়েছে গড়ে ১৫ কোটি ৪৫ লাখ টাকা। অর্থাৎ আয়ের ৬০ শতাংশই আসে রপ্তানি বাণিজ্যের মাধ্যমে। এসব প্রতিষ্ঠানের মূলধন-শ্রমের অনুপাত দাঁড়ায় ৭ লাখ ৪৪ হাজার টাকা।
অন্যদিকে ৫৫টি চামড়া ও পাদুকা শিল্পের ১৪ হাজার ৩০৫ জন কর্মীর ওপর জরিপ করে দেখা গেছে, একই বছরে প্রতিষ্ঠানগুলো গড়ে ৭৭ কোটি ৬৪ লাখ টাকা আয় করেছে, যার মধ্যে রপ্তানি আয় হয়েছে গড়ে ৪৮ কোটি ৭৩ লাখ টাকা। এ শিল্পের মূলধন-শ্রমের অনুপাত দাঁড়িয়েছে ১ লাখ ৭০ হাজার টাকা।
বিআইডিএসের জরিপে ট্যানারি এবং লেদার ও ফুটওয়্যার শিল্পের বিভিন্ন পেশায় উল্লেখযোগ্য পরিমাণে দক্ষতার ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। ট্যানারিগুলোতে বেশিরভাগ অদক্ষ শ্রমিক, তবে কিছু আধা-দক্ষ শ্রমিক আছে। অদক্ষ শ্রমিকের পাশাপাশি নিম্নমানের প্রযুক্তির কারণে খাতটির অর্থনৈতিক পরিস্থিতি আরও অবনতির আশঙ্কা রয়েছে এবং খাতটি সর্বোচ্চ ৫ থেকে ১০ বছর টিকে থাকতে পারে। যদিও আগামী ১০ বছরে ট্যানারি খাতে প্রচুর কর্মীর চাহিদা তৈরি হবে। এই খাতে উচ্চ প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা রয়েছে কিন্তু দক্ষ কর্মীর অভাবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছে। প্রচলিত প্রশিক্ষণ এ খাতের প্রশিক্ষিত কর্মীদের চাহিদা পূরণে যথেষ্ট নয়।
এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশ ট্যানারি অ্যাসোসিয়েশনের (বিটিএ) সিনিয়র সহ-সভাপতি ও আরব ট্যানারির ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইলিয়াসুর রহমান দেশ রূপান্তরকে বলেন, এ খাতের দক্ষ জনবল সরবরাহের জন্য সরকার লেদার ইনস্টিটিউট চালু করেছে। কিন্তু এখান থেকে গ্র্যাজুয়েশন সম্পন্ন করে ছাত্ররা চাকরি নিতে চান ব্যাংকে, বিসিএসে। এখানে সুযোগ সুবিধা তাদের পছন্দসই না হওয়ায় অন্য পেশায় আগ্রহী হচ্ছেন তারা।
তিনি বলেন, চামড়া শিল্প সরকারের অসহযোগিতার কারণে খুব সংকটাপন্ন অবস্থায় আছে। চামড়া প্রক্রিয়াজাতকরণের যে রাসায়নিক আমদানি করতে হয় তাতে উচ্চ শুল্ক থাকায় ক্ষতির সম্মুখীন হতে হচ্ছে। গবেষণা বলছে, দক্ষতার ঘাটতি কাটিয়ে উঠতে পারলে চামড়া ও পাদুকা শিল্পে ২০২৫ সালের মধ্যে চাকরির সুযোগ বাড়বে ৩০ শতাংশ। আর ২০৩০ সালের মধ্যে চাকরির বাজার বাড়বে ৬৪ শতাংশ।
এ প্রসঙ্গে ইলিয়াসুর রহমান বলেন, দক্ষতার ঘাটতি এ খাতের বড় সমস্যা। রাসায়নিক পদার্থের ব্যবহার বেশি থাকার কারণে গ্র্যাজুয়েশন করে কেউ এ পেশায় আসতে চান না। তারা মনে করেন, এ শিল্পের রুগ্ণ অবস্থার কারণে কোম্পানিগুলো বেতন দিতে পারবে না। ভারী মেশিনারিজ চালানোর জন্য দক্ষ জনবলের অভাব খুব বেশি। যার ফলে এ খাতের চার থেকে পাঁচটি কারখানা কোনো রকম ভালো ব্যবসা করতে পারছে। বাকিরা প্রায় বন্ধ হওয়ার পথে।
এ শিল্পের উন্নয়নে কয়েকটি সুপারিশ করেছে বিআইডিএস। চামড়া ও পাদুকা শিল্পে দক্ষতার ঘাটতি পূরণে প্রশিক্ষণার্থীদের ব্যবহারিক প্রশিক্ষণ বাড়ানোর পাশাপাশি কর্মীদের আরও তদারকি, মূল্যায়ন, ব্যবহারিক কাজের প্রশিক্ষণ, কাজের পুনর্বণ্টন সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ। এ খাতে শিক্ষানবিশ কর্মীদের অংশগ্রহণ বাড়ানো প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক বাজার ধরতে সাভারের সিইটিপিকে আন্তর্জাতিক মানের করার জন্য পদক্ষেপ নেওয়ার সুপারিশও করেছে বিআইডিএস।
বিআইডিএস দেশের শ্রম বাজারের ৬০ শতাংশ শ্রমিকের ওপর শ্রম জরিপ চালিয়ে দেখেছে, এর মধ্যে ৪০ শতাংশ শ্রমিকের কোনো শিক্ষাগত যোগ্যতা নেই, ২৩ শতাংশের শুধু প্রাথমিক শিক্ষার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
২০১০ সালে প্রণীত জাতীয় শিক্ষানীতি (এনইপি) এবং ২০১১ সালের ন্যাশনাল স্কিল ডেভেলপমেন্ট পলিসি (এনএসডিপি) দেশের শ্রমবাজারে উচ্চশিক্ষা ও প্রশিক্ষণের সূচনা করেছে বলেও মত দিয়েছে বিআইডিএস। এরপর ২০১৪ সালে সরকার স্কিল ফর এমপ্লয়মেন্ট ইনভেস্টমেন্ট প্রোগ্রাম (সেইপ) বহুমুখী বিনিয়োগের মাধ্যমে আরেকটি কর্মসূচি হাতে নেয়। এতে বিনিয়োগ করে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং সুইস এজেন্সি ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড কো-অপারেশন (এসডিসি)। এ বিনিয়োগের আওতায় এনএসডিপির কর্মসূচিকেও অন্তর্ভুক্ত করা হয়।
দুইটি পর্যায়ে শ্রম বাজারের জনশক্তিকে দক্ষতা উন্নয়নের জন্য প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা। এ সময় ৫ লাখ ২ হাজার শ্রমিককে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কথা থাকলেও দুই ধাপে ২ লাখ ২৩ হাজার জনশক্তিকে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে। প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যে ৩০ শতাংশ নারী। প্রশিক্ষণ পেয়ে এ খাতে চাকরির ব্যবস্থা হয়েছে ৭০ শতাংশ প্রশিক্ষণার্থীর। বিআইডিএস সেইপের সহযোগিতায় এসব প্রশিক্ষণার্থীদের মধ্যেও জরিপ করেছে।
এসব প্রশিক্ষণের দুটি উদ্দেশ্য। ২০২০ থেকে ২০৩০ সালের মধ্যে শ্রমবাজারের দক্ষতার ঘাটতি কমিয়ে এনে সরকারকে সহযোগিতা করা। যাতে বেসরকারি শিল্প খাতের দক্ষতা, বাণিজ্য বাড়ানো যায় এবং আন্তর্জাতিক বাজারে সহজে প্রবেশ করার সুযোগ পায়। দ্বিতীয় উদ্দেশ্যে বলা হয়েছে, খাতভিত্তিক অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা, দক্ষতার ঘাটতি কমিয়ে আনা, খাতভিত্তিক গবেষণা করা, পেশাভিত্তিক আলাদা প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা।