শ্রদ্ধা ভালোবাসায় চিরনিদ্রায় শায়িত আকবর আলি খান

তিনি শুধু একজন ন্যায়নিষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তাই ছিলেন না, ছিলেন একজন গভীরে যাওয়া গবেষক, নীতিবান শিক্ষক, নাগরিক সমাজের কণ্ঠস্বর এবং দেশকে সত্যিকারের ভালোবাসা একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা। সংকটকালে জাতিকে পথ দেখানো বহুমাত্রিক গুণের অধিকারী এই প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদ, ইতিহাসবিদ, গবেষক ও শিক্ষক ড. আকবর আলি খান নানা শ্রেণি-পেশার মানুষের শ্রদ্ধা, ভালোবাসায় সিক্ত হয়ে চিরনিদ্রায় শায়িত হয়েছেন। সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের এই উপদেষ্টাকে গতকাল শুক্রবার বেলা সোয়া ৩টার দিকে রাজধানীর মিরপুরে শহীদ বুদ্ধিজীবী কবরস্থানে সমাহিত করা হয়।

এর আগে বাদ জুমা তার জানাজা গুলশানের আজাদ মসজিদে সম্পন্ন হয়। জানাজা পড়ান মসজিদটির খতিব ও যাত্রাবাড়ী মাদ্রাসার মাওলানা মো. মাহমুদুল হাসান। বিপুলসংখ্যক মানুষের উপস্থিতির কারণে খোলা মাঠেও স্থান সংকুলান না হওয়ায় গুলশানের প্রধান সড়কে দাঁড়িয়েও জানাজায় অংশ নেন অনেকে। জানাজায় অংশ নেন পরিকল্পনামন্ত্রী এম এ মান্নান, মন্ত্রিপরিষদ সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি জাফরুল্লাহ চৌধুরী, এনবিআরের সাবেক চেয়ারম্যান বদিউর রহমান প্রমুখ।

জানাজার পর ঈদগাহ মাঠে আনা হয় জাতীয় পতাকায় মোড়ানো আকবর আলি খানের মরদেহ। সেখানে প্রথমে ঢাকা জেলা প্রশাসনের পক্ষে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়। এরপর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (এলএ) কাজী হাফিজুল আমিনের নেতৃত্বে সশ্রদ্ধ সালাম প্রদর্শন করা হয়।

রাজারবাগ পুলিশ লাইনসের এসআই আব্দুর রহমানের নেতৃত্বে পুলিশের সশস্ত্র একটি চৌকস দল গার্ড অব অনার দেয়। এরপর প্রয়াত বীর মুক্তিযোদ্ধা আকবর আলি খানকে শ্রদ্ধা জানাতে এক মিনিট নীরবতা পালন করে সশস্ত্র দলটি। এ সময় বিউগলের করুণ সুর সেখানে উপস্থিত হাজারো মানুষের মধ্যে ছড়িয়ে যায়।

জানাজার আগে সকালে এভারকেয়ার হাসপাতালের হিমঘর থেকে আকবর আলি খানের মরদেহ শেষবারের মতো তার রাজধানীর গুলশানের বাসায় নেওয়া হয়। সেখানে স্বজন ও বিশিষ্টজনেরা তার প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। গুলশানে আকবর আলি খানের বাসায় গিয়েছিলেন সাবেক সচিব আবদুল মুয়ীদ চৌধুরী, দুদকের সাবেক চেয়ারম্যান গোলাম রহমান, ব্যাংকার ও অর্থনীতি বিশ্লেষক মামুন রশীদসহ বিভিন্ন পেশার প্রতিনিধিরা।

আকবর আলি খানের জন্ম ১৯৪৪ সালে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায়। ঢাকা বিশ^বিদ্যালয় থেকে ইতিহাসে স্নাতক করার পর তিনি কানাডার কুইন্স ইউনিভার্সিটিতে অর্থনীতি পড়েছেন। একই বিষয়ে পিএইচডিও করেছেন। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসের পরীক্ষার মাধ্যমে তিনি সরকারি চাকরিতে যোগ দেন। অবসর নেন মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে। অর্থসচিব আর এনবিআরের চেয়ারম্যানের দায়িত্বও তিনি পালন করেন।

দেশের সংকটময় সময়ে ২০০৬ সালে ইয়াজউদ্দিন আহম্মেদের নেতৃত্বাধীন তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা হয়েছিলেন আকবর আলি খান। পরে সেই সময় রাজনৈতিক বিরোধের মধ্যে নির্বাচন নিয়ে অনিশ্চয়তা ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে প্রশ্নে তিনিসহ চার উপদেষ্টা পদত্যাগ করেছিলেন। উপদেষ্টা হিসেবে পদত্যাগের এক বছর পর ফখরুদ্দীন আহমদের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় আকবর আলি খান রেগুলেটরি রিফর্মস কমিশনের (আরআরসি) চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। মুক্তিযুদ্ধের সময় দেশের জন্যও তার ছিল অনবদ্য ভূমিকা। পাকিস্তান সিভিল সার্ভিসে কর্মরত থাকা অবস্থায় মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে তিনি ছিলেন হবিগঞ্জের মহুকুমা প্রশাসক (এসডিও)। তখন মুজিবনগর সরকারের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে কাজ করেন। কর্মক্ষেত্রে অনুপস্থিত থাকায় পাকিস্তান সরকার তার অনুপস্থিতিতে তাকে ১৪ বছরের সশ্রম কারাদণ্ড দেয়। দেশ স্বাধীন হলে আবার সরকারি চাকরিতে যোগ দেন আকবার আলি খান। বিশ^বিদ্যালয়ে শিক্ষকতার সঙ্গেও যুক্ত ছিলেন। মন্ত্রিপরিষদ সচিব হিসেবে অবসর নেওয়ার পর বেসরকারি বিশ^বিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন।

একই সঙ্গে তিনি লেখালেখি করেছেন। অর্থনীতি, সমাজ ও স্মৃতিচারণামূলক বই লিখেছেন। পত্রপত্রিকায় নিয়মিত রাজনীতি ও আর্থসামাজিক অবস্থা নিয়ে কলাম লিখেছেন। আকবর আলি খানের প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা ১৭টি। তার জনপ্রিয় প্রকাশনার মধ্যে রয়েছে ডিসকভারি অব বাংলাদেশ, ফ্রেন্ডলি ফায়ারস, হাম্পটি ডাম্পটি ডিসঅর্ডার অ্যান্ড আদার এসেস, গ্রেশামস ল সিনড্রম অ্যান্ড বিঅন্ড, দারিদ্র্যের অর্থনীতি: অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ, পরার্থপরতার অর্থনীতি, আজব ও জবর আজব অর্থনীতি, অবাক বাংলাদেশ: বিচিত্র ছলনাজালে রাজনীতি, চাবিকাঠির খোঁজে : নতুন আলোকে জীবনানন্দের বনলতা সেন, দুর্ভাবনা ও ভাবনা : রবীন্দ্রনাথকে নিয়ে এবং বাংলায় ইসলাম প্রচারে সাফল্য : একটি ঐতিহাসিক বিশ্লেষণ। এ ছাড়া তিনি মুক্তিযুদ্ধের সময়ের এবং সরকারি চাকরির অভিজ্ঞতা নিয়ে স্মৃতিচারণামূলক বই লিখেছেন।