আট মাসে ৩৬৪ শিক্ষার্থীর আত্মহত্যা, বেশি স্কুলের

দেশে চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে ৩৬৪ জন শিক্ষার্থী; অর্থাৎ প্রতি মাসে গড়ে ৪৫ জন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। তাদের মধ্যে স্কুল, কলেজ, বিশ^বিদ্যালয়, মাদ্রাসাসহ বিভিন্ন পর্যায়ের শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে স্কুলপড়–য়াদের মধ্যে এ প্রবণতা বেশি। আর সব পর্যায়ের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ছাত্রীদের আত্মহত্যার প্রবণতা ছাত্রদের তুলনায় বেশি। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন আঁচল ফাউন্ডেশনের এক সমীক্ষায় এসব তথ্য উঠে এসেছে।

গতকাল শুক্রবার এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে এ সমীক্ষার প্রতিবেদন তুলে ধরে আঁচল। দেশের দেড় শতাধিক জাতীয় ও স্থানীয় পত্রিকা এবং অনলাইন পোর্টালে গত আট মাসে প্রকাশিত শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার তথ্য নিয়ে প্রতিবেদনটি তৈরি করা হয়েছে।

আঁচলের প্রতিবেদন অনুযায়ী, আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া শিক্ষার্থীদের মধ্যে ১৯৪ জনই স্কুলপড়–য়া। এ ছাড়া ৭৬ জন কলেজপড়–য়া, ৫০ জন বিশ^বিদ্যালয়পড়–য়া এবং ৪৪ জন মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আত্মহত্যার পথ বেছে নিয়েছে। শিক্ষাস্তর বিবেচনায় দেখা গেছে, এ সময়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিকের ৫৩ দশমিক ৩০, কলেজপড়–য়া ২০ দশমিক ৮৮, বিশ্ববিদ্যালয়পড়–য়া ১৩ দশমিক ৭৪ এবং ১২ দশমিক শূন্য ৯ শতাংশ মাদ্রাসার শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত আট মাসে আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৩২ দশমিক ৯৯ শতাংশ ছাত্র এবং ৬৭ দশমিক শূন্য ১ শতাংশ ছাত্রী। এ ছাড়া বিশ^বিদ্যালয়পড়ুয়াদের মধ্যে ৬০ শতাংশ ছাত্র ও ৪০ শতাংশ ছাত্রী। কলেজপড়–য়াদের মধ্যে ৪৬ দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ ছাত্র ও ৫৩ দশমিক ৯৫ শতাংশ ছাত্রী এবং মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের ৩৯ দশমিক ২৯ শতাংশ ছাত্র ও ৬০ দশমিক ৭১ শতাংশ ছাত্রী এ পথ বেছে নিয়েছে।

সংগঠনটি বলছে, আত্মহননের পথ বেছে নেওয়া শিক্ষার্থীদের অবস্থান বিবেচনায় এগিয়ে রয়েছে ঢাকা বিভাগ। ঢাকায় গত আট মাসে ২৫ দশমিক ২৭ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। চট্টগ্রাম বিভাগে ১৬ দশমিক ৪৮ শতাংশ, খুলনা বিভাগে ১৪ দশমিক শূন্য ১, রংপুর বিভাগে ৮ দশমিক ৭৮, বরিশাল বিভাগে ৯ দশমিক ৬২, ময়মনসিংহ বিভাগে ৭ দশমিক ৪২, রাজশাহী বিভাগে ১৪ দশমিক শূন্য ১ এবং সিলেট বিভাগে ৪ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে।

আঁচল ফাউন্ডেশনের তথ্যমতে, শিক্ষার্থীদের মধ্যে ৬০ দশমিক ৭১ শতাংশ ছাত্রী এবং ৩৯ দশমিক ২৯ শতাংশ ছাত্র আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। তাদের মধ্যে প্রেমঘটিত কারণে সবচেয়ে বেশি ২৫ দশমিক ২৭, অভিমান করে ২৪ দশমিক ৭৩, পরিবারের সঙ্গে চাওয়া-পাওয়ার অমিল হওয়ায় ৭ দশমিক ৪২ এবং পারিবারিক কলহের কারণে ৬ দশমিক ৫৯ শতাংশ এ পথ বেছে নিয়েছে। এ ছাড়া ধর্ষণ কিংবা যৌন হয়রানির কারণে ৪ দশমিক ৬৭, মানসিক সমস্যার কারণে ৬ দশমিক ৫৯, পড়াশোনার চাপে শূন্য দশমিক ৮২, সেশনজটের কারণে হতাশায় নিমজ্জিত হয়ে শূন্য দশমিক ৮২ শতাংশ এবং পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ায় ১ দশমিক ৯২ শতাংশ শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেছে। এ সময়ে চুরির মিথ্যা অপবাদে ১ দশমিক ৬৫, আর্থিক সমস্যায় ১ দশমিক ৯২, বিষাদগ্রস্ত হয়ে শূন্য দশমিক ৫৫, বিয়ের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান এবং স্বামী পছন্দ না হওয়ায় ১ দশমিক ১০ শতাংশ এ পথ বেছে নিয়েছে। বাকি ১৫ দশমিক ৯৩ শতাংশের আত্মহননের পেছনের কারণ জানা যায়নি।

সমীক্ষা প্রতিবেদন অনুযায়ী, ১৩-২০ বছর বয়সী শিক্ষার্থীদের মধ্যে আত্মহত্যার হার সর্বাধিক, ৭৮ দশমিক ৬ শতাংশ। ২১-২৬ বছর বয়সীদের মধ্যে ১৩ দশমিক ৪৬ শতাংশ, ৬-১২ বছর বয়সীদের মধ্যে ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ; অর্থাৎ ২৯ জন আত্মহত্যা করেছে। সবচেয়ে বেশি আত্মহত্যা করেছে ১৪-১৬ বছর বয়সীরা, এ সংখ্যা ১৬০। এ ছাড়া সর্বনি¤œ ৭ বছরের একটি শিশুও আত্মহত্যা করেছে বলে জানিয়েছে সংগঠনটি।

আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে না পারাকে আত্মহত্যার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত করেছেন আঁচল ফাউন্ডেশনের প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি তানসেন রোজ। তিনি বলেন, ‘আমরা দেখেছি শিক্ষার্থীরা পরিবার থেকে কোনো কিছু না পেয়ে অভিমান করেও আত্মহত্যা করেছে। মোটরবাইক, মোবাইল চেয়ে না পাওয়ার কারণে অনেকেই আত্মহননের পথ বেছে নিয়েছে। প্রত্যাশা পূরণ না হলে কীভাবে আবেগ নিয়ন্ত্রণ করতে হয়, সে বিষয়ে আমাদের শিক্ষার্থীদের অনেক বড় ধরনের অভাব পরিলক্ষিত হচ্ছে।’

তিনি আরও বলেন, ‘করোনার সময়ে দীর্ঘদিন ঘরে বসে থাকার ফলে অনেকের মনস্তাত্ত্বিক পরিবর্তন এসেছে। রাগ বেড়েছে, মানসিকভাবে সহজেই ভেঙে পড়ার হারও বেড়েছে, সেই সঙ্গে বেড়েছে পড়াশোনার চাপও। এ ছাড়া পারিবারিক বিভিন্ন সমস্যাও বেড়েছে আগের চেয়ে।’

ঢাকা বিশ^বিদ্যালয়ের ক্লিনিক্যাল সাইকোলজি বিভাগের অধ্যাপক ড. কামাল উদ্দিন আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘আত্মহত্যা উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার পেছনে কোন কারণগুলো আছে তা খুঁজে বের করে যথাযথ উদ্যোগ নেওয়া এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় শিক্ষার্থীরা এখন যে অবস্থার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে তাতে আত্মহত্যা না করলেও তাদের অন্যান্য মানসিক সমস্যায় আক্রান্ত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হচ্ছে। পেশাজীবীদেরও এ বিষয়টি নিয়ে আলোচনা করা উচিত এবং কী উদ্যোগ নেওয়া যায়, সে বিষয়ে সমন্বিত কাজ করা প্রয়োজন। এ ছাড়া সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগে দৃশ্যমান উদ্যোগ নিতে হবে।’

এ সময় আরও বক্তব্য দেন নারায়ণগঞ্জ জেলার এডিসি (শিক্ষা ও আইসিটি ডিভিশন) আজিজুল হক মামুনসহ অন্যরা।