১৯৮৩ সাল, ১৬ নভেম্বর সকালের কিছু পরেই ট্রেন যোগে শ্রীপুর রেলস্টেশনে নামেন ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ। সেখানে তাকে লালগালিচা সম্মাননা দেওয়া হয়। পরে একটি গাড়ি করে চলে আসেন বৈরাগীর চালা নামের এক নিভৃত পল্লীতে। এর পরই সেই বৈরাগীর চালা গ্রামটি ঐতিহাসিক গ্রামের তকমা পেয়ে যায়।
ব্রিটেনের সদ্য প্রয়াত রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে সময় কাটান। দেখে যান একটি স্বনির্ভর গ্রাম। কথা বলেন প্রান্তিক খেটে খাওয়া সাধারণ মানুষের সঙ্গে। সেই পুরানো দিনের স্মৃতি এখনও ঐতিহাসিক বৈরাগীর চালা গ্রামবাসীর কাছে অমর হয়ে আছে। এখনও চা স্টলের আড্ডায় চলে আসে রানীর গ্রামে বেড়ানোর সেই দিনের গল্প। এ গ্রামের মানুষ রানীকে ভালোবেসে উপহার দিয়েছিলেন রুপার চাবি। রানীর জন্য এ গ্রামের প্রত্যেকটি ঘরের দরজা সারা জীবনের জন্য খোলা থাকলো এমন বার্তা দিতেই রুপার চাবি উপহার দেওয়া হয় বলে গ্রামবাসী জানিয়েছেন।
গ্রামের বয়স্করা পুরানো স্মৃতি মাড়িয়ে বলেন, রানীর গ্রামে আসার ছবি এখনও চোখে ভাসছে ঝলমলে আয়নার মত। সারা গ্রামে নিরাপত্তার বলয় ছিল। গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে আনন্দের বন্যা বইছিল রানীর আসার আনন্দে।
তারা জানান, সে দিনে স্মৃতির সাক্ষী অনেকে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন। এখনও যারা বেঁচে আছেন তারা সময় পেলেই চা স্টল গল্পের আড্ডায় সে দিনের স্মৃতি নিয়ে কথা বলেন। এ সময়ের ছেলে মেয়েরাও আগ্রহ নিয়ে সে সময়ের গল্প শুনতে বায়না ধরে।
প্রত্যক্ষদর্শী সাখাওয়াত হোসেন খান বলেন, ৩৯ বছর আগের স্মৃতি এখনও চোখের সামনে ঝকঝকা ভেসে উঠে। শ্রীপুর রেলস্টেশন থেকে বৈরাগীর চালা গ্রাম পর্যন্ত দ্রুত সময়ের মধ্যে সড়ক মেরামত করা হয়। গ্রামে বিদ্যুতের ব্যবস্থা করা হয়। গ্রামের ঘরে ঘরে স্যানিটেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়। তিনি বলেন, আমার বাবা (মরহুম মিজানুর রহমান খান) দিনরাত পরিশ্রম করেছেন সব কিছুর ব্যবস্থা নিশ্চিত করতে। আমাদের বাড়ির সামনে কাঁঠাল বাগানের নিচে রানীর বসার জন্য সুব্যবস্থা করা হয়েছিল। এখানে বসেই রানী গ্রামের নারীদের হাতে ভাজা মুড়ির স্বাদ নিয়েছেন। জেলেদের মাছ ধরা দেখেছেন। তাঁত বুনা দেখেছেন। রানী গ্রামের এমন সহজ সরল জীবনযাপন দেখে পুলকিত হয়েছিলেন।
তিনি বলেন, আমার দাদী (মৃত হাকিমুন নেছা) গ্রামের পক্ষ থেকে একটি রুপার চাবি উপহার দিয়েছিলেন রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথকে। চাবি দেওয়ার বার্তাটা ছিল এ গ্রামের প্রত্যেক ঘরের দরজা রানী ও তার পরিবারের সকল সদস্যদের জন্য আজীবন খোলা। আমরা গর্বিত এ গ্রামে রানীর পদধূলী পড়েছে এ ভেবে।
তিনি আরও বলেন, রানীর মৃত্যুতে আমরা খুবই শোকাহত। আমরা স্বপ্ন দেখেছিলাম আবারও একবার তিনি এ গ্রামে আসবেন। সে আশা আমাদের অপূর্ণ রয়ে গেল।
বৈরাগীর চালা গ্রামের কলেজছাত্র মিনহাজ আলম বলেন, আমরা এখনও সুযোগ পেলেই বয়স্কদের কাছ থেকে রানী আসার গল্প শুনি। এখনও বিশ্ব গণমাধ্যমে বিভিন্ন কারণে রানীর জীবনের নানা গল্পের মধ্যে আমাদের গ্রামের গল্প উঠে আসে। এটা আমাদের গর্বিত করে। তবে তার মৃত্যুতে আমরা খুবই শোকাহত। গ্রামের মানুষের মাঝে একটা চাপা কষ্ট বিরাজ করছে।
স্থানীয় শিক্ষক শফিকুল ইসলাম বলেন, ছোট্ট বেলার সে স্মৃতি এখনো অম্লান। আমরা শত শত শিক্ষার্থী রাস্তার দু ধারে দাঁড়িয়ে রানীর আগমনকে স্বাগত জানিয়েছি। এ সময় আমাদের হাতে দু দেশের পতাকা শোভা পাচ্ছিল। আমরা দারুণ আনন্দ নিয়ে অপেক্ষা করছিলাম। রানীকে বহন করা গাড়ি যখন আমাদের অতিক্রম করছিল আমরা করতালি দিয়ে তার আগমনে উচ্ছ্বাস প্রকাশ করেছি।
বৃদ্ধা ছালেহা বেগম (৭০) বলেন, আমি রানীর মঞ্চের খুব কাছে বসেছিলাম। রানীকে খুব কাছ থেকে দেখেছি। মুড়ি ভেজে তাকে দেখানো হয়েছে। তাঁত বুনা দেখেছেন। যেমন সুন্দরী ছিলেন তেমনি মিশুক, ভালো মানুষ ছিলেন। গ্রামের সাধারণ মানুষের সঙ্গে খুব আপন হয়েছিলেন অল্প সময়ে। কথা বলেছেন খুব আপন করে। টিভিতে দেখেছি তিনি মারা গেছেন। খুব কষ্ট পেয়েছি।
শ্রীপুর পৌরসভার মেয়র আনিছুর রহমান জানান, ব্রিটেনের রানী দ্বিতীয় এলিজাবেথ আমাদের শ্রীপুরকে বিশ্ববাসীর কাছে পরিচিত করেছেন। তার আগমনে বৈরাগীর চালা গ্রামটি ঐতিহাসিক হয়েছে। তার আগমনে আমরা গর্বিত হয়েছিলাম। সে দিনের স্মৃতি এখনো আমাদের মানসপটে ভেসে বেড়াচ্ছে। তার মৃত্যুতে ব্রিটেনবাসীর সঙ্গে আমরা শ্রীপুরবাসীও শোকাহত। প্রয়াত রানীর আত্মার শন্তি কামনা করছি।