ডলারের দাম বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে ৪০৩%

স্থানীয় মুদ্রার বিপরীতে ডলারের দাম বাড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের বার্ষিক মুনাফায় উল্লম্ফন দেখা দিয়েছে। বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্মূল্যায়নের কারণে ২০২১-২২ হিসাব বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে ৪০৩ শতাংশ। যদিও এ সময় দেশীয় মুদ্রার লেনদেন থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় কমেছে। সদ্য প্রকাশিত বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় এমন তথ্য মিলেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২১-২২ হিসাব বছরের নিরীক্ষিত প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, এ সময়ে কর পরিশোধের পর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সমন্বিত মুনাফা হয়েছে ২৯ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা, যা ২০২০-২১ হিসাব বছরে ছিল ৫ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা। এক বছরের ব্যবধানে মুনাফায় এমন উল্লম্ফন শুধুমাত্র বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্মূল্যায়নের কারণে। যার ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের করপরবর্তী মুনাফা বেড়েছে চার গুণেরও বেশি।

বাংলাদেশ ব্যাংক তার বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ৭৫ শতাংশ মার্কিন ডলারে বিনিয়োগ করেছে। বাকিটা রেখেছে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) স্পেশাল ড্রয়িং রাইটস (এসডিআর), ইউরো, পাউন্ড, চায়নিজ ইউয়ান ও কানাডিয়ান ডলারে। চলতি বছর বিশ্বজুড়ে মার্কিন ডলারের দাম ২০ শতাংশ বেড়েছে। ডলারের এই দাম বৃদ্ধির কারণে ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্মূল্যায়নে ২৬ হাজার ২৯৯ কোটি টাকা মুনাফা বেড়েছে, যা আগের বছরে ছিল ২ হাজার ৬০৫ কোটি টাকা। পুনর্মূল্যায়নের ফলে এক বছরের ব্যবধানে মুনাফা বেড়েছে ৯০৯ শতাংশ। এর মধ্যে ২ হাজার ৪১৭ কোটি টাকার মুনাফা তুলে নিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।

বৈদেশিক মুদ্রার পুনর্মূল্যায়ন শুধু নয়, রিজার্ভ থেকে ডলার বিক্রি করেও ২০২১-২২ হিসাব বছরে ভালো মুনাফা পেয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। এ সময় বিদেশি মুদ্রার বিনিয়োগ থেকে সুদ আয় হয়েছে ২ হাজার ৮৩৭ কোটি টাকা। আর কমিশন ও ডিসকাউন্ট থেকে আয় হয়েছে ৫২ কোটি টাকা। বিপরীতে এ সময় বিদেশি মুদ্রার দায়ের কারণে সুদ ব্যয়, কমিশন ও অন্যান্য ব্যয় বাবদ ১৪৭ কোটি টাকা খরচ হয়েছে।

এদিকে বিদেশি মুদ্রা ব্যবস্থাপনা থেকে ভালো আয় হলেও স্থানীয় মুদ্রা টাকা থেকে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের আয় কমেছে। সরকার ঋণ কম নেওয়ার পাশাপাশি ব্যাংক রেট কমানো ও করোনার কারণে কম সুদে ব্যাংকগুলোকে টাকা দেওয়ার কারণেও আয় কমেছে। ফলে টাকার লেনদেন করে ২০২১-২২ অর্থবছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা কমেছে। গত অর্থবছরে দেশীয় মুদ্রা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বিত আয় হয়েছে ৩ হাজার ২৪১ কোটি টাকা। এ সময়ে স্থানীয় মুদ্রা লেনদেনে ব্যয় হয়েছে ৮১৪ কোটি টাকা। এতে করে ২০২১-২২ হিসাব বছরে দেশীয় মুদ্রা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের নিট আয় হয়েছে ২ হাজার ৪২৬ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ২ হাজার ৭২১ কোটি টাকা। 

বার্ষিক প্রতিবেদন পর্যালোচনায় দেখা গেছে, ২০২১-২২ হিসাব বছরে বিদেশি ও স্থানীয় মুদ্রা থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মোট আয় হয়েছে ৬ হাজার ১৩১ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ৬ হাজার ২৪০ কোটি টাকা। এ আয়ের সঙ্গে বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ পুনর্মূল্যায়নের ফলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বিত আয় দাঁড়িয়েছে ৩২ হাজার ৫৩৯ কোটি টাকা। এ সময় কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যয়ও বেড়েছে। ২০২১-২২ হিসাব বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বিত সাধারণ ও প্রশাসনিক ব্যয় হয়েছে ২ হাজার ৮৮ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ১ হাজার ৯৪৯ কোটি টাকা। বিদেশি ও স্থানীয় মুদ্রায় খরচসহ এ সময়ে সমন্বিত মোট ব্যয় দাঁড়িয়েছে ৩ হাজার ৫০ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ২ হাজার ৯৩৫ কোটি টাকা।

২০২১-২২ হিসাব বছরে করপূর্ববর্তী মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৩৩৭ কোটি টাকা, যা আগের বছরে ছিল ৫ হাজার ৯১০ কোটি টাকা। কর পরিশোধের পর ২০২১-২২ হিসাব বছরে বাংলাদেশ ব্যাংকের সমন্বিত নিট মুনাফা দাঁড়িয়েছে ২৯ হাজার ৩২৭ কোটি টাকা, যা ২০২০-২১ হিসাব বছরে ছিল ৫ হাজার ৮২৪ কোটি টাকা।

গত অর্থবছরে বিশ^ব্যাপী সোনার দাম বাড়ায় ২০২১-২২ হিসাব বছরে সোনায় বিনিয়োগ পুনর্মূল্যায়ন থেকে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুনাফা বেড়েছে ৯০৯ কোটি টাকা।