পাকিস্তানে বন্যা গ্রামের পর গ্রাম নিশ্চিহ্ন

ইতিহাসের সবচেয়ে বিপর্যয়কর বন্যায় তলিয়ে আছে পাকিস্তান। বন্যায় পাকিস্তানের এক-তৃতীয়াংশ এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। বিধ্বংসী এ বন্যায় ভেসে গেছে রাস্তা, বাড়িঘর ও ফসল। গ্রাম নিশ্চিহ্ন হয়ে বিশাল এলাকা এখন জলাভূমি। হতাহতের সংখ্যা প্রায় দুই হাজার। খাদ্য, বাসস্থানসহ নানা সংকটে অনাহারে দিন কাটাচ্ছে লাখ লাখ মানুষ। 

বন্যাকবলিতদের পাশে দাঁড়াতে দুই দিনের সফরে গত শুক্রবার পাকিস্তানে গেছেন জাতিসংঘ মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস। এমন প্রাকৃতিক দুর্যোগের জন্য জলবায়ু পরিবর্তনের বিরূপ প্রভাবকে দায়ী করেন গুতেরেস। সেই সঙ্গে পাকিস্তানের মানুষের পাশে দাঁড়াতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে সবচেয়ে খারাপ পরিস্থিতি দেশটির সিন্ধু প্রদেশের। নজিরবিহীন বন্যায় প্রদেশটির অবস্থার এতটাই অবনতি হয়েছে যে প্লাবিত হয়েছে প্রতিটি এলাকা। 

তাড়াহুড়ো করে তৈরি করা বাঁধ থেকে একটি বিস্তীর্ণ হ্রদের মধ্যে মেহার শহর, মসজিদের মিনার এবং একটি গ্যাস স্টেশনের মূল্য তালিকার বোর্ডটি কেবল দেখা যায়। ১০ কিলোমিটারের বেশি এলাকা এখন জলাভূমি। দক্ষিণ সিন্ধুর উপকূল পেরিয়ে এখানে শত শত গ্রাম ও বিস্তীর্ণ এলাকা, কৃষিজমি পানির নিচে হারিয়ে গেছে। 

এক গ্রামের বাসিন্দা আয়াজ আলী এএফপিকে বলেন, কেউ জানে না তাদের গ্রাম কোথায়, মানুষ আর তার নিজের বাড়ি চিনতে পারে না। তার গ্রাম এখন সাত মিটার (২৩ ফুট) পানির নিচে ডুবে আছে।

বাস কন্ডাক্টর আয়াজ নৌবাহিনীর নেভিগেটর হিসেবে বিদ্যুতের লাইন এবং উঁচু গাছের অবস্থান দেখে গ্রামগুলো শনাক্ত করছেন।

নৌবাহিনীর স্বেচ্ছাসেবকরা দুটি লাইফবোটে করে সাহায্য পৌঁছে দিচ্ছেন এবং স্থানীয়দের প্রয়োজনীয় চিকিৎসা দিতে তাদের শহরে নিয়ে আসছেন। গ্রাম চিনতে কখনো গাছের মগডাল কিংবা বিদ্যুতের খুঁটিকে চিহ্ন হিসেবে ধরে নিয়ে নৌকা চালাতে হচ্ছে। 

অনেকে এখনো তাদের বাড়িঘর ছাড়তে অস্বীকার করছেন। গবাদিপশু চুরি হয়ে যাবে বা মারা যাবে কিংবা অস্থায়ী ত্রাণ শিবিরে আরও খারাপ পরিস্থিতির ভয়ে তারা নিজের ঘরবাড়ি ছাড়তে চাইছেন না।

আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে বের হতে দিতে অস্বীকৃতি জানিয়ে হাঁটুপানিতে ডুবে আছির আলী বলেন, ‘আমাদের জীবন-মৃত্যু আমাদের গ্রামের সঙ্গে জড়িত। আমরা কীভাবে চলে যাব?’

তবু জ¦রে আক্রান্ত পুরুষ, ডায়রিয়ায় আক্রান্ত শিশু, একজন বয়স্ক নারী এবং নৌকায় থাকা স্বেচ্ছাসেবক সব মিলে ধারণক্ষমতার দ্বিগুণ লোক ডুবে যাওয়ার ঝুঁকি নিয়ে শহরে যাচ্ছে নৌকাটি।

১০ কিলোমিটারের একটি মাটির বাঁধ এখন পর্যন্ত কয়েক লাখ জনসংখ্যার মেহার শহরকে বন্যার গ্রাস থেকে কোনোমতে আটকে রেখেছে। শহরে খোলা হয়েছে আশ্রয় শিবির।

‘আরও পরিবার ক্যাম্পে আসছে। তারা একটি ভয়ানক অবস্থার মধ্যে রয়েছে।’ পাকিস্তানভিত্তিক মানবাধিকার সংস্থা আলখিদমত ফাউন্ডেশনের মুহাম্মদ ইকবাল এ কথা বলেন। তার সংস্থা শহরের বৃহত্তম ক্যাম্পে সেবা দিয়ে যাচ্ছে, যেখানে প্রায় ৪০০ জন লোক রয়েছে।

তিনি বলেন, ‘প্রচুর পানীয় জল এবং টয়লেট সুবিধা প্রয়োজন, কিন্তু এসবের জন্য তাদের আরও অপেক্ষা করতে হতে পারে। আপাতত সরকারের অগ্রাধিকারের দিকে তাকিয়ে সবাই।’

স্ফীত বাঁধ এবং জলাধারের ওপর চাপ সৃষ্টি হয়েছে, সবাই শহররক্ষার বাঁধ বজায় রাখতে সর্বাত্মকভাবে এগিয়ে এসেছে, কিন্তু গ্রামীণ দরিদ্র এলাকায় তা হয়ে ওঠেনি। ক্যাম্পের কাঠের চৌকিতে বসে ৩০ বছর বয়সী উমাইদা সোলাঙ্গি বলছিলেন এসব। গ্রাম তলিয়ে যাওয়ায় বাচ্চাদের নিয়ে এখানেই মাথা গুঁজেছেন তিনি।