এ মাসের শেষ সপ্তাহে দেশে ফিরছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জাতীয় পার্টির (জাপা) প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ। বর্তমানে তিনি ব্যাংককে চিকিৎসাধীন রয়েছেন এবং তার শারীরিক অবস্থা বেশ ভালো।
এমন তথ্য জানিয়ে এই বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ গতকাল শনিবার দেশ রূপান্তরকে বলেন, সেপ্টেম্বরের শেষ সপ্তাহে তিনি দেশে ফিরবেন। তার শরীর এখন ভালো।
এর আগে গতকাল শনিবার ব্যাংকক থেকে পাঠানো এক বিবৃতিতে দেশে ফিরে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার ঘোষণা দেন রওশন এরশাদ। সেখানে তিনি বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে আমি পুরোপুরি সুস্থ। কোনো ধরনের চাপ নেই, শিগগিরই দেশে ফিরছি।’
জাপার দশম জাতীয় সম্মেলন প্রস্তুতি কমিটির যুগ্ম আহ্বায়ক অধ্যাপক মো. ইকবাল হোসেন রাজু স্বাক্ষরিত দলের প্যাডে পাঠানো এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়।
বিজ্ঞপ্তিতে রওশন এরশাদকে জাপার দশম জাতীয় সম্মেলনের আহ্বায়ক উল্লেখ করা হয়। সেখানে তিনি বলেন, ‘যারা আমাকে বারবার অসুস্থ বলে প্রচার করছেন, তাদের ভিন্ন উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা খতিয়ে দেখা দরকার।’
বিবৃতিতে রওশন এরশাদ বলেন, ‘তৃতীয় পক্ষের ভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করা হচ্ছে বলে যে তথ্য প্রচার করা হয়েছে, তা সম্পূর্ণরূপে মিথ্যা ও বানোয়াট। এর কোনো ভিত্তি নেই। যে মুহূর্তে আমি সুস্থ হয়ে উঠেছি এবং সংসদ কার্যক্রমে অংশ নিতে শারীরিক ও মানসিক প্রস্তুত, সেই মুহূর্তে বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়ানো হচ্ছে। এতে ভিন্ন কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, সেটাই এখন প্রশ্ন।’
রওশন এরশাদ আরও বলেন, ‘গঠনতন্ত্র ২০-এর উপধারা ১-এ উল্লিখিত বিধিতে দেওয়া প্রধান পৃষ্ঠপোষকের ক্ষমতা বলে আমি বিশেষ প্রয়োজন উল্লেখ করেই দশম জাতীয় সম্মেলন ডেকেছি। গত তিন বছর সারা দেশে জাতীয় পার্টির যে বেহাল দশা এবং অসংখ্য দক্ষ যোগ্য নেতাকর্মীর আর্তনাদ আমাকে ব্যথিত করেছে। পল্লীবন্ধু খেতাব ও তার আদর্শ সামনের দিকে এগিয়ে নিতে আল্লাহর অশেষ রহমত এবং লাখো নেতাকর্মীর দোয়ায় সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে পার্টিকে রক্ষা করতেই দশম জাতীয় সম্মেলনের ডাক দিয়েছি।’
বিবৃতিতে জাতীয় পার্টির সবাইকে তার সন্তান ও আত্মার পরম আত্মীয় হিসেবে উল্লেখ এবং ‘স্নেহের ছোট ভাই-বোন ও বন্ধুজন’ বলে সম্বোধন করেন রওশন এরশাদ। সব বিভেদ ও মতপার্থক্য এবং বিভ্রান্তি ভুলে গিয়ে পার্টির দশম জাতীয় সম্মেলন সফল করতে সংশ্লিষ্ট সবার প্রতি উদাত্ত আহ্বান জানান তিনি। রওশন এরশাদ বলেন, ‘আল্লাহর রহমতে শিগগিরই দেশে এসে, সময়ের সাথি হব, বিপদে-আপদে থাকব তোমাদেরই পাশে, ইনশা আল্লাহ।’
বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গেল কয়েক দিন বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত অসত্য তথ্যনির্ভর সংবাদের প্রতিবাদে গতকাল শনিবার এক বিবৃতিতে রওশন এরশাদ এসব কথা বলেন।
এর আগে আট দিন দেশে থেকে গত ৬ জুলাই চিকিৎসার জন্য আবার ব্যাংককে যান রওশন এরশাদ। তার সঙ্গে ছেলে রংপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য রাহগিব আল মাহি (সাদ এরশাদ) যান। ফুসফুসের জটিলতায় আক্রান্ত হয়ে ঢাকার সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) টানা ৮৪ দিন থাকার পর গত বছর থাইল্যান্ড গিয়েছিলেন রওশন। ছয় মাস পর গত ২৭ জুন দেশে ফেরেন। দেশে ফিরে ৩০ জুন বৃহস্পতিবার সংসদ অধিবেশনে যোগ দেন।
পরে ২ জুলাই শনিবার ঢাকার ওয়েস্টিন হোটেলে জাতীয় পার্টির বিভিন্ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের সঙ্গে এক মতবিনিময় সভায় অংশ নেন তিনি। ওই সভায় তিনি অসুস্থতার সময় দলের নেতারা তার কোনো খোঁজ নেননি বলে আক্ষেপ করেন।
সর্বশেষ ব্যাংককে যাওয়ার প্রায় ১ মাস পর গত ৩১ আগস্ট সেখান থেকেই নিজেকে আহ্বায়ক করে জাতীয় পার্টির আট সদস্যের কমিটি ঘোষণা করেন রওশন। একই সঙ্গে আগামী ২৬ নভেম্বর পার্টির দশম কাউন্সিল আহ্বান করেন তিনি। বিরোধীদলীয় নেতার রাজনৈতিক সচিব গোলাম মসীহ স্বাক্ষরিত এ-সংক্রান্ত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, আসন্ন কাউন্সিলে রওশন এরশাদ আহ্বায়ক এবং যুগ্ম আহ্বায়ক হিসেবে বর্তমান পার্টির ৬ জন কো-চেয়ারম্যান থাকবেন। তারা হলেন ব্যারিস্টার আনিসুল ইসলাম মাহমুদ এমপি, সাবেক মহাসচিব রুহুল আমিন হাওলাদার, কাজী ফিরোজ রশীদ এমপি, সৈয়দ আবু হোসেন বাবলা এমপি, মহাসচিব মো. মুজিবুল হক চুন্নু এমপি ও অ্যাডভোকেট সালমা ইসলাম এমপি।
সে রাতেই রওশন এরশাদের এই আহ্বায়ক কমিটি গঠনকে সম্পূর্ণ অবৈধ, অনৈতিক ও গঠনতন্ত্র পরিপন্থী বলে জানান জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের। জাপার চেয়ারম্যানের প্রেস সেক্রেটারি খন্দকার দেলোয়ার জালালী স্বাক্ষরিত এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, গঠনতন্ত্র অনুযায়ী জাতীয় পার্টির আহ্বায়ক কমিটি গঠন ও কাউন্সিল ঘোষণার কোনো এখতিয়ার নেই পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষকের। কাউন্সিলে গঠিত একটি বৈধ কমিটি ভেঙে দেওয়ার কোনো ক্ষমতা পার্টির চেয়ারম্যান ছাড়া আর কারও নেই। গঠণতন্ত্র অনুযায়ী শুধু পার্টির চেয়ারম্যান আহ্বায়ক কমিটি গঠন এবং জাতীয় কাউন্সিল আহ্বান করতে পারেন।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, ‘জাতীয় পার্টির গঠনতন্ত্রের ধারা ১২, উপধারা ১/২ অনুযায়ী কাউন্সিলের তারিখ, স্থান ও সময় প্রেসিডিয়াম কর্র্তৃক নির্ধারিত হবে। তা ছাড়া, জাতীয় পার্টি চেয়ারম্যান যিনি প্রেসিডিয়ামেরও সভাপতি কর্র্তৃক কাউন্সিল অনুষ্ঠানের অনুমোদন প্রয়োজন হবে। এর বাইরে কারও কাউন্সিল আহ্বানের এখতিয়ার নেই।’
তা ছাড়া সম্মেলনের জন্য গঠিত আহ্বায়ক কমিটির ছয় যুগ্ম আহ্বায়কও রওশন এরশাদের আহ্বায়ক কমিটি গঠন ও জাতীয় পার্টির কাউন্সিল ঘোষণার বিষয়ে অবগত নন বলেও বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়।
এরপর ১ সেপ্টেম্বর রওশন এরশাদকে বিরোধীদলীয় নেতার পদ থেকে বাদ দিতে সংসদের স্পিকার ড. শিরীন শারমিন চৌধুরীর কাছে চিঠি দেয় জাপা। দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে বিরোধীদলীয় নেতার মনোনয়ন দিতে এই চিঠি দেওয়া হয়। সেদিন সন্ধ্যায় স্পিকারের কার্যালয়ে চিঠি পৌঁছে দেন জাপার মহাসচিব অ্যাডভোকেট মুজিবুল হক চুন্নু।
এর আগে সেদিন বিকেলে সংসদ ভবনে জি এম কাদেরের সভাপতিত্বে জাতীয় পার্টির সংসদীয় দলের সভা হয়। ওই সভায় রওশন এরশাদকে সরিয়ে দলের চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে জাতীয় সংসদের বিরোধী দলের নেতা মনোনীত করার সিদ্ধান্ত নেয় জাপা। পরে সন্ধ্যায় তাদের এই সিদ্ধান্ত আনুষ্ঠানিকভাবে স্পিকারকে জানানো হয়। স্পিকারকে দেওয়া চিঠিতে জাপার একাধিক সংসদ সদস্য স্বাক্ষর করেন। তবে স্বাক্ষর করেননি রওশন এরশাদের পক্ষের এমপিরা। ২৬ জন এমপির মধ্যে ২৪ জন রওশনের বিপক্ষে স্বাক্ষর করেন।
এ ব্যাপারে জাপার মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু সাংবাদিকদের বলেন, বিরোধীদলীয় নেতা অনেক দিন ধরে অসুস্থ। তিনি স্বাস্থ্যগত কারণে সংসদেও ঠিকমতো আসতে পারছেন না। এ জন্য সংসদীয় দল এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে।
জাপা নেতারা জানান, জাপা চিঠি দিলেও এ ব্যাপারে অনুমোদন দেওয়ার এখতিয়ার স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরীর। তবে দলের সংখ্যাগরিষ্ঠ সদস্য কোনো সিদ্ধান্ত নিলে স্পিকার সাধারণত সেটি অনুমোদন করেন। কিন্তু গতকাল পর্যন্ত এ ব্যাপারে কোনো সিদ্ধান্ত জানাননি স্পিকার।