ডলারের দাম বৃদ্ধিতে বেড়েছে আমদানি ব্যয়, জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বেড়েছে পরিবহন খরচ ও পণ্যের দাম। মহামারী, বৈশ্বিক মন্দা, ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের প্রভাবের বাইরে নয় বাংলাদেশও। জ¦ালানি, সার ছাড়াও ভোজ্য তেল, গমসহ বিভিন্ন খাদ্যপণ্যের আমদানিনির্ভরতার কারণে বেশ চাপ তৈরি হয়েছে দেশের অর্থনীতিতে। দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ নিয়ে শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এসব সামলাতে সরকারকে উন্নয়ন সহযোগীদের কাছে বড় অঙ্কের ঋণ চেয়ে আবেদন করতে হচ্ছে। সংকটের সময়ে বন্ধুপ্রতিম অনেক দেশের মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার নজির সাম্প্রতিক কালেই আমরা দেখেছি।
জমির স্বল্পতা থাকলেও প্রযুক্তি, উদ্ভাবনী ক্ষমতা এবং সর্বোপরি কৃষকের চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মানসিকতা দেশের কৃষি খাতকে বরাবরই ব্যাপক সম্ভাবনাময় করে রেখেছে। দেশের খাদ্য চাহিদার সবচেয়ে বেশি পূরণ করা হয় চালের মাধ্যমে। চাল উৎপাদন আগের চেয়ে কয়েকগুণ বাড়লেও চাহিদা মেটাতে মাঝেমধ্যেই আমদানি করতে হয়। দ্বিতীয় হলো গম। এই শস্য সবচেয়ে বেশি আমদানি করতে হয়। এই দুটি শস্যের উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে খাদ্য আমদানির একটি বড় চাপ সামলানো সম্ভব।
দেশের সাড়ে ১৬ কোটি মানুষের খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করা খুবই চ্যালেঞ্জিং। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় কম উৎপাদনশীল ধানের জাত ব্রি ২৮ ও ২৯ এর পরিবর্তে উচ্চ উৎপাদনশীল নতুন জাত ব্রি ৮৮, ৮৯, ৯২ ও বঙ্গবন্ধু ধান ১০০ এর চাষ দ্রুত সম্প্রসারণে কাজ চলছে। এ পরিকল্পনা দ্রুত বাস্তবায়ন করতে পারলে দেশে চালের সংকট অনেকটাই মেটানো যাবে। বর্তমানে ধান উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয় অবস্থানে রয়েছে।
বিবিএসের প্রকাশিত পরিসংখ্যান পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত আড়াই দশকে দেশে উন্নত জাতের ধানের কারণে চাল উৎপাদন দ্বিগুণেরও বেশি বেড়েছে। ১৯৯৪-৯৫ অর্থবছরে দেশে চাল উৎপাদন হয়েছিল ১ কোটি ৬৮ লাখ ৩৮ হাজার মেট্রিক টন, যা ২০২০-২১ অর্থবছরে ৩ কোটি ৭৬ লাখ ৮ হাজার টনে উন্নীত হয়। এক্ষেত্রে প্রবৃদ্ধি ১২৩ শতাংশ।
ধান, গমসহ ২৮টি ফসলের ভবিষ্যৎ চাহিদা ও জোগান নিয়ে সাম্প্রতিক এক গবেষণায় বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা কাউন্সিল (বিএআরসি) জানিয়েছে, ২০৩০ সালে মানুষের খাদ্য হিসেবে এবং অন্যান্য প্রয়োজনে (বীজ, প্রাণী ও মৎস্য খাদ্য, শিল্প, অপচয় ইত্যাদি) চালের মোট চাহিদা হবে ৩ কোটি ৯১ লাখ টন এবং ২০৫০ সালে ৪ কোটি ২৬ লাখ টন। বর্তমান উৎপাদন অবস্থা বিদ্যমান থাকলে আগামী ২০৩০ ও ২০৫০ সাল নাগাদ স্থানীয় উৎপাদনের মাধ্যমে চালের মোট জোগান হবে যথাক্রমে ৪ কোটি ৩২ লাখ এবং ৫ কোটি ৪৯ লাখ টন। গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়, স্বাভাবিক অবস্থা বিবেচনায় ২০৩০ ও ২০৫০ সালে উদ্বৃত্ত চালের পরিমাণ দাঁড়াবে যথাক্রমে ৪১ লাখ টন ও ১ কোটি ২৩ লাখ টন।
চালে ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও হতাশা রয়েছে গমে। জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে দেশে শীতের তীব্রতা ও স্থায়িত্ব হ্রাস, মারাত্মক ব্লাস্ট রোগের আক্রমণ ইত্যাদি কারণে একরপ্রতি উৎপাদনশীলতা হ্রাস পাওয়ায় দেশে গমের উৎপাদন কমেছে। চাহিদার তুলনায় উৎপাদনের পরিমাণ পাঁচ ভাগের এক ভাগে নেমে আসায় দেশ গমে প্রায় পুরোপুরি আমদানিনির্ভর হয়ে পড়েছে।
জাতিসংঘের কৃষি ও খাদ্য সংস্থার তথ্যানুযায়ী, বিশ্বে সবজি উৎপাদনে বাংলাদেশের অবস্থান তৃতীয়। এ ক্ষেত্রে চীন প্রথম ও ভারত তৃতীয়। যেখানে চীন বাংলাদেশের তুলনায় ৬৫গুণ বড় আর ভারত ২২ গুণ বড়। সে হিসেবে এই অবস্থান বেশ গর্বের।
অর্থনীতির একটি প্রাথমিক বিষয় হলো- বাজারে কোনো পণ্যের দাম এবং সরবরাহ কেমন হবে তা চাহিদা ও জোগানের মধ্যকার সম্পর্ক দ্বারাই নির্ধারিত হয়। গত ৫ বছরে সবকিছুর দাম বাড়লেও রুই-কাতলার দামে ছিল স্থিতিশীলতা। এর মানে হচ্ছে সরবরাহ স্বাভাবিক ছিল। মৎস্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০১৬-১৭ অর্থবছরে রুই মাছের মোট উৎপাদন ছিল ৩ লাখ ৭০ হাজার ৬২৭ টন। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪ লাখ ৪৬ হাজার ১৪৩ টন। আর ২০১৬-১৭ অর্থবছরে দেশে কাতলা মাছের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ২৪ হাজার ১৯১ টন। সেটা ২০২০-২১ অর্থবছরে বেড়ে হয়েছে ২ লাখ ৬৪ হাজার ৮৫৫ টন। রুই, কাতলা, পাঙাশ ও তেলাপিয়ার পাশাপাশি পাবদা, কৈ, শিং, শোল, বোয়াল, সরপুঁটি, আইড়, মলা, টেংরা মাছ এখন দেশে চাষ করা হচ্ছে। জাতিসংঘের খাদ্য ও কৃষি সংস্থার (এফএও) ‘দ্য স্টেট অব ওয়ার্ল্ড ফিশারিজ অ্যান্ড অ্যাকুয়াকালচার ২০২০’ প্রতিবেদন অনুসারে, বিশ্বে মুক্ত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ তৃতীয় স্থান এবং চাষকৃত জলাশয়ে মাছ উৎপাদনে পঞ্চম স্থানে রয়েছে। অন্যদিকে সামুদ্রিক মৎস্য আহরণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের অবস্থান বিশ্বে ১১তম।
২০১৯-২০ অর্থবছরে মাছের উৎপাদন দাঁড়িয়েছে ৪৫ দশমিক শূন্য ৩ লাখ টনে। অষ্টম পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনার শেষ অর্থবছরে (২০২৪-২৫) দেশে মাছ উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৯ লাখ ৯৫ হাজার টন। ইতিমধ্যে মাছ ও মৎস্যজাত পণ্য রপ্তানির মাধ্যমে দেশ মূল্যবান বৈদেশিক মুদ্রা আয় করছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর তথ্য অনুযায়ী, ২০২১-২২ অর্থবছরে হিমায়িত মাছ ও মৎস্যজাতপণ্য রপ্তানি করে দেশ ৫৩ কোটি ডলার অর্জন করেছে। মিঠাপানির মাছ উৎপাদনে বাংলাদেশ শীর্ষস্থানীয় অবস্থানে থাকলেও রপ্তানি থেকে এ খাতের আয় কিছুটা কমেছে। ২০১৫-১৬ অর্থবছরে ৭৫ হাজার ৩৩৭ টন মাছ ও মৎস্যজাতপণ্য রপ্তানির মাধ্যমে ৭ হাজার ২৮২ কোটি টাকার সমপরিমাণ বৈদেশিক মুদ্রা অর্জিত হয়। তবে এ খাতে সচেতনতা তৈরি করা গেলে ব্যাপক বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করা সম্ভব।
পরিসংখ্যান বাদ দিয়ে এবার বাস্তব অভিজ্ঞতার কথাই বলি। কয়েক বছর আগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ঘুরতে গিয়ে দেখলাম ১০-২০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে বিদেশি স্ট্রবেরি মাখানো। দামি এই সুস্বাদু ফলটিকে দেশের মানুষের সবার নাগালের মধ্যে আনা সম্ভব হয়েছে কেবল কৃষকের চ্যালেঞ্জ নেওয়ার মনোভাবের কারণেই। আমার গ্রামের বাড়ি ঝিনাইদহে, সেখানে ড্রাগন ফল চাষ করে কত মানুষ যে স্বাবলম্বী হয়েছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। সেখানে দেখেছি শখের বসে কৃষিজমি, বাড়ির পাশে, ছাদে মানুষ ড্রাগন ফল চাষ করছে। আম পেয়ারার মতোই দেশের বাজারে পাওয়া যাচ্ছে এই বিদেশি ফলটিও। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের (ডিএই) তথ্যমতে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে দেশে ড্রাগন ফলের উৎপাদন ছিল মাত্র ৬৬ হাজার কেজি। ২০২০-২১ অর্থবছরে তা উন্নীত হয়েছে প্রায় ৮৬ লাখ ৫৯ হাজার কেজিতে। সদ্যসমাপ্ত ২০২১-২২ অর্থবছরে উৎপাদন প্রায় কোটি কেজি হয়েছে বলে মাঠ পর্যায় থেকে প্রাথমিক তথ্যে উঠে এসেছে। শুধু ড্রাগন নয় অ্যাভোকাডো, স্কোয়াশ কমলা, মাল্টা ইত্যাদি বিদেশি ফল দেশি ফল আম, লিচু, পেয়ারা ও শরীফার মতোই দেশের বিভিন্ন স্থানে ব্যাপক ভাবেই চাষ হচ্ছে। যা কিনা বেকারত্বের পাশাপাশি খাদ্য ও পুষ্টিতে অনেক বড় অবদান রাখছে।
কৃষিতে সাফল্য পাওয়া গেছে কেবল কৃষকরা আগ্রহ প্রকাশ করেছে বলেই। পাশাপাশি এ খাতে উৎপাদন বৃদ্ধিতে প্রযুক্তিগত উন্নয়নও সাধিত হয়েছে ব্যাপক। কৃষিতে আমদানিনির্ভরতা কমিয়ে আনতে হবে। বস্ত্রশিল্পের পাশাপাশি কৃষিপণ্য রপ্তানিতে বাংলাদেশের এগিয়ে যাওয়ার সুযোগ রয়েছে। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্যমতে ২০২১-২২ অর্থবছরে, কৃষিপণ্য এবং প্রাসঙ্গিক প্রক্রিয়াজাত খাদ্য ১১৬ কোটি মার্কিন ডলার মূল্যের বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেছে, যা আগের বছরের চেয়ে ১৩ শতাংশ বেশি।
তবে খাদ্যপণ্য রপ্তানিতে ফসল বা পণ্যের মান সঠিকভাবে বজায় রেখে উৎপাদন করতে হবে। এর জন্য প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা, সাপ্লাই চেইন তৈরি, কৃষিতে শিক্ষিত জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ, কৃষি উৎপাদনে প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোসহ ই-কমার্স ও সোশ্যাল মিডিয়াকে কাজে লাগিয়ে কৃষিপণ্যে উৎপাদক-ভোক্তার বাণিজ্য বৃদ্ধি করতে হবে।
খাদ্যপণ্য রপ্তানি বৃদ্ধি করে বাণিজ্য ঘাটতি কমানো যাবে। এতে বৈশ্বিক অর্থনীতির মন্দায় কৃষি হতে পারে আমাদের জন্য একটি সুরক্ষা দেয়াল।
লেখক: আর্থিক প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তা
rashed2034jcc@gmail.com