নিরাপদ সড়কের দাবিতে ফের রাজধানীর সড়কে নেমে বিক্ষোভ করেছে শিক্ষার্থীরা। প্রাইভেটকারের ধাক্কায় গত রবিবার রাজধানীর তেজগাঁও সরকারি বিজ্ঞান স্কুলের দশম শ্রেণির ছাত্র মো. আলী হোসেনের (১৭) মৃত্যুর পর ফুঁসে ওঠে শিক্ষার্থীরা। বৃষ্টি উপেক্ষা করে নিরাপদ সড়কের দাবিতে গতকাল সোমবার সকাল থেকে দুপুর পর্যন্ত রাজধানীর ফার্মগেট ও বিজয় সরণি মোড় অবরোধ করে বিক্ষোভ করে তারা। বিক্ষোভে তেজগাঁও সরকারি বিজ্ঞান স্কুল অ্যান্ড কলেজসহ আশপাশের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কয়েকশ শিক্ষার্থী অংশ নেয়।
‘উই ওয়ান্ট জাস্টিস’, ‘জাস্টিস ফর অল’, ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ এমন বিভিন্ন স্লোগান সংবলিত প্ল্যাকার্ড নিয়ে বিক্ষোভে অংশ নেয় শিক্ষার্থীরা। এ সময় তারা প্রশ্ন তোলে, আর কতকাল সড়কে নৈরাজ্য চলতে থাকবে। তাদের আর কত ভাই ও বন্ধু প্রাণ হারাবে।
শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভের সময় সড়কে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হলে পুলিশ ও সরকারি বিজ্ঞান স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষকরা তাদের রাস্তা থেকে সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। তবে শিক্ষার্থীরা আলী হোসেনকে চাপা দেওয়া গাড়ির চালক গ্রেপ্তার না হওয়া পর্যন্ত সড়ক ছাড়বে না বলে ঘোষণা দেয়।
এদিকে আলী হোসেনকে ধাক্কা দেওয়া মাইক্রোবাসটি জব্দ ও চালক জিয়াউল হককে (৫০) গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। গতকাল সকালে ঢাকার আশুলিয়ার বিশমাইল এলাকা থেকে তাকে গ্রেপ্তার করা হয়। তার গ্রেপ্তারের খবর শোনার পর দুপুর ১টার দিকে শিক্ষার্থীরা সড়ক ছেড়ে দেয়।
উল্লেখ্য, গত রবিবার সকাল পৌনে ৭টার দিকে রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল এলাকার বিজি প্রেসের সামনে মাইক্রোবাসের চাপায় গুরুতর আহত হয় সরকারি বিজ্ঞান স্কুলের ছাত্র মো. আলী হোসেন। মুমূর্ষু অবস্থায় তাকে উদ্ধার করে প্রথমে নেওয়া হয় শমরিতা হাসপাতালে। পরে সেখান থেকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নিলে দায়িত্বরত চিকিৎসক আলীকে মৃত ঘোষণা করেন। তেজগাঁও কুনিপাড়ায় পরিবারের সঙ্গে থাকত সে।
নিরাপদ সড়কের দাবিতে এর আগেও একাধিকবার রাস্তা অবরোধ করে আন্দোলন করেছে বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। সর্বশেষ গত ৪ আগস্ট রাজধানীর সায়েন্স ল্যাব মোড়ে নিরাপদ সড়কের দাবিতে বিক্ষোভ করে একদল শিক্ষার্থী। নিরাপদ সড়কের দাবিতে ২০১৮ সালে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে হামলায় জড়িতদের বিচার এবং যানজট নিয়ন্ত্রণের জন্য গণপরিবহনের মানোন্নয়নসহ ৯ দফা দাবিতে তারা এ বিক্ষোভ করে। ওই বিক্ষোভ সমাবেশে সরকারের সমালোচনা করে নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের (নিসআ) যুগ্ম আহ্বায়ক শহীদুল ইসলাম আপন বলেন, ২০১৮ সালে ৯ দফা দাবি পেশ করা হয়েছিল। আন্দোলনের চার বছর পূর্তি হলেও সড়ক এখনো নিরাপদ হয়নি। সরকার এবং সংশ্লিষ্ট মহল বিভিন্ন টালবাহানায় এখনো সেই ৯ দফা বাস্তবায়ন করেনি। তারা চান দ্রুততম সময়ের মধ্যে যেন এই ৯ দফার পূর্ণ বাস্তবায়ন করা হয়।
গতকাল রাজধানীর ফার্মগেট এলাকায় গিয়ে দেখা গেছে, সকাল ১১টার দিকে রাজধানীর ফার্মগেটের মূল সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ কর্মসূচি শুরু করে সরকারি বিজ্ঞান স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষার্থীরা। পরে আশপাশের আরও কয়েকটি স্কুল ও কলেজের শিক্ষার্থীরা তাদের সঙ্গে যোগ দেয়। সবাই একত্র হয়ে ফার্মগেট থেকে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে বিজয় সরণি মোড়ে গিয়ে অবস্থান নেয়। শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে সড়কের সব কটি লেনের যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। একদিকে বৃষ্টি, অন্যদিকে শিক্ষার্থীদের অবরোধের কারণে স্থবির হয়ে পড়ে আশপাশের সড়কের যান চলাচল। পরিস্থিতি স্বাভাবিক করতে যৌথভাবে চেষ্টা চালান পুলিশ ও সরকারি বিজ্ঞান স্কুল অ্যান্ড কলেজের শিক্ষকরা।
দুপুর সোয়া ১২টা থেকে পৌনে ১টা পর্যন্ত বিজয় সরণি মোড় অবরোধ করে রাখে শিক্ষার্থীরা। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে পুলিশ ও শিক্ষকরা বুঝিয়ে শিক্ষার্থীদের বিজয় সরণি থেকে সরিয়ে ফের ফার্মগেটে নিয়ে যান।
বিক্ষোভে অংশ নেওয়া সরকারি বিজ্ঞান স্কুলের দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী রনি বলেন, ‘আমরা চাই নিরাপদ সড়ক। আমাদের কোনো সহপাঠী, কোনো শিক্ষার্থীর যেন সড়কে মৃত্যু না হয়। সেটা নিশ্চিত করার দায়িত্ব পুলিশের।’
শহিদুল ইসলাম নামে আরেক শিক্ষার্থী বলেন, ‘আমাদের কলেজের সামনে দিয়ে বেপরোয়া গতিতে গাড়ি চলাচল করে। এ ব্যাপারে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয় না। আমার এক সহপাঠী খুন হলো। বিচার কখনো হয় না, আমরা বিচারের দাবিতে সড়ক অবরোধ করেছি।’
ডিএমপির তেজগাঁও অঞ্চলের অতিরিক্ত উপ-কমিশনার (এডিসি) রোবায়েত হাসান বলেন, ‘প্রাইভেটকার চালককে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। আমরা প্রথম থেকেই চেষ্টা করেছি শিক্ষার্থীদের সড়ক থেকে সরিয়ে যান চলাচল স্বাভাবিক করার। পরে দুপুর ১টার দিকে তাদের সড়ক থেকে সরিয়ে দিলে যান চলাচল স্বাভাবিক হয়।’
পুলিশের সংবাদ সম্মেলন : মাইক্রোবাসের চালক জিয়াউলকে গ্রেপ্তারের পর গতকাল বিকেলে ডিএমপির তেজগাঁও বিভাগের উপ-কমিশনার (ডিসি) এইচ এম আজিমুল হক তার কার্যালয়ে সংবাদ সম্মেলনে আসেন। তিনি বলেন, দুর্ঘটনার পর ৩৭টি সিটিটিভি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ ও পর্যালোচনার পর মাইক্রোবাসটি শনাক্ত করে পুলিশ। এরপর চালক জিয়াউল হককে আশুলিয়ার বিশমাইল এলাকা থেকে গ্রেপ্তার ও মাইক্রোবাসটি জব্দ করা হয়।
ডিসি আজিমুল হক আরও বলেন, গাড়ির মালিকের কর্মস্থল ঢাকায়। তিনি বৃহস্পতিবার পর্যন্ত ঢাকায় অবস্থান করেন। গাড়িটি সাভারে তার পারিবারিক প্রয়োজনে ব্যবহৃত হয়। চালক আশুলিয়ায় থাকেন। তিনি মালিককে নিতে রবিবার ঢাকায় আসেন।
এদিকে জব্দ করা মাইক্রোবাসটিতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) লেখা স্টিকার ছিল। এ বিষয়ে ডিসি আজিমুলকে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, ‘অনেকেই সাংবাদিক বা পুলিশ না হয়েও সাংবাদিক বা পুলিশ লেখা স্টিকার গাড়িতে ব্যবহার করেন। আমরা তদন্ত করে দেখব মাইক্রোবাসের মালিক আসলে কে। কারণ গ্রেপ্তার চালক জিয়া একেক সময় একেক ধরনের তথ্য দিচ্ছেন। চালকের ড্রাইভিং লাইসেন্স পেয়েছি। সেটা সঠিক কি না, তাও খতিয়ে দেখা হবে।’
এই পুলিশ কর্মকর্তা আরও বলেন, ‘ওই কলেজের সামনে যানবাহনের গতি নিয়ন্ত্রণে সংশ্লিষ্ট কর্র্তৃপক্ষকে জানানো হবে।’