শ্রদ্ধা ভালোবাসায় সাজেদা চৌধুরীকে শেষ বিদায়

চিরনিদ্রায় শায়িত হলেন জাতীয় সংসদের উপনেতা ও আওয়ামী লীগের সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী। গতকাল সোমবার সন্ধ্যা ৬টা ২০ মিনিটের দিকে রাজধানীর বনানী কবরস্থানে তার দাফন সম্পন্ন হয়। সে সময় পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দলটির সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের, সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য আব্দুর রহমান, ধর্ম প্রতিমন্ত্রী ফরিদুল হক খান, উত্তর সিটি করপোরেশনের মেয়র আতিকুল ইসলামসহ অনেকেই উপস্থিত ছিলেন।

গত রবিবার রাত ১১টা ৪০ মিনিটে রাজধানীর সম্মিলিত সামরিক হাসপাতালে (সিএমএইচ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান সাজেদা চৌধুরী। গতকাল সকালে প্রথমে জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় তার প্রথম জানাজা হওয়ার কথা থাকলেও বৃষ্টির কারণে সেটি বাতিল হয়। পরে তার মরদেহ নেওয়া হয় নির্বাচনী এলাকা ফরিদপুরের নগরকান্দায়। বেলা ১১টায় নগরকান্দার এমএন অ্যাকাডেমি স্কুল প্রাঙ্গণে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম এই সংগঠকের প্রতি রাষ্ট্রীয় সম্মান জানানোর পর হয় প্রথম জানাজা। জানাজা শেষে সংসদ উপনেতার কফিন নিয়ে পরিবারের সদস্য ও দলের নেতারা দুপুর আড়াইটায় ঢাকা কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে নিয়ে আসেন। যেখানে সর্বসাধারণ নেতার প্রতি ফুলের শ্রদ্ধা জানান।

গতকাল ঢাকা থেকে পদ্মা সেতু হয়ে তার মৃতদেহ সকাল পৌনে ১১টার দিকে নগরকান্দায় পৌঁছায়। ফরিদপুরের জেলা প্রশাসক অতুল সরকারের নেতৃত্বে পুলিশের একটি চৌকস দল তাকে গার্ড অব অনার প্রদান করে। এরপর বৃষ্টি উপক্ষো করেই হাজারো মানুষ তার জানাজায় অংশ নেন। জানাজার আগে সংক্ষিপ্ত বক্তব্য দেন আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সাংগঠনিক সম্পাদক মির্জা আজম ও সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীর রাজনৈতিক প্রতিনিধি ও কনিষ্ঠ পুত্র শাহদাব আকবর লাবু চৌধুরী। এ সময় আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক এস এম কামাল, ফরিদপুরের পুলিশ সুপার মো. শাহ্জাহান, জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি শামীম হক, সাধারণ সম্পাদক ইমতিয়াজ আরিফসহ জনপ্রতিনিধি, রাজনীতিবিদ ও সরকারি কর্মকর্তারা উপস্থিতি ছিলেন। জানাজা ও শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ১২টার দিকে তার মরদেহ নিয়ে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা দেওয়া হয়।

ঢাকায় শহীদ মিনারে প্রথমে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদের পক্ষ থেকে সামরিক সচিব মেজর জেনারেল এস এম সালাহউদ্দিন ইসলাম, প্রধানমন্ত্রীর পক্ষ থেকে সামরিক সচিব মেজর জেনারেল কবীর আহাম্মদ, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরের নেতৃত্বে সভাপতিমণ্ডলীর সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, মতিয়া চৌধুরী, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আব্দুর রহমান, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল আলম হানিফ, হাছান মাহমুদ, দীপু মনি, দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়াসহ কেন্দ্রীয় নেতারা শ্রদ্ধা জানান।

শ্রদ্ধা নিবেদন শেষে ওবায়দুল কাদের বলেন, দলের সংকটে তিনি সাহসী নেতা ছিলেন। তিনি ছিলেন জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের আদর্শের সৈনিক এবং আমাদের নেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার অত্যন্ত বিশ্বস্ত সহকর্মী। বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক বড় অধ্যায় জুড়ে রয়েছেন তিনি। স্বাধীনতা যুদ্ধে তিনি রণাঙ্গনেও ছিলেন সৈনিক। স্বাধীনতা পরবর্তী বঙ্গবন্ধুর দেশ পুনর্গঠনে ভূমিকা রেখেছেন। তারপর আবার সংকট, রক্তাক্ত পঁচাত্তরের পর প্রত্যেকটি সংকটে তিনি ছিলেন। অনেকে জানেন না, তিনি ঢাকা সেন্ট্রাল জেলে অনেক দিন বন্দি ছিলেন। তার শূন্যতা সহজে পূরণ হওয়ার নয়।

১৪ দলের পক্ষ থেকে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন জোটের সমন্বয়ক আমির হোসেন আমু। রাশেদ খান মেননের নেতৃত্বে ওয়ার্কার্স পার্টি, শফিউদ্দিন মোল্লার নেতৃত্বে জাসদ, রেজাউর রশিদের নেতৃত্বে বাসদ, এস কে শিকদারের নেতৃত্বে গণ-আজাদী লীগের নেতাকর্মীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন। পরে ঢাকা মহানগর উত্তর-দক্ষিণ আওয়ামী লীগ, ছাত্রলীগ, যুবলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, মহিলা লীগ, যুব মহিলা লীগ, বঙ্গবন্ধু আওয়ামী আইনজীবী পরিষদসহ আওয়ামী লীগের সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা শ্রদ্ধা নিবেদন করেন।

এছাড়া শ্রদ্ধা জানিয়েছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক আখতারুজ্জামান, বীর মুক্তিযোদ্ধা মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া, স্থানীয় সরকারমন্ত্রী তাজুল ইসলাম, নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী খালিদ মাহমুদ চৌধুরী, সাংস্কৃতিক প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ, পানি সম্পদ উপমন্ত্রী এ কে এম এনামুল হক শামীম, রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন, গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের প্রতিষ্ঠাতা জাফরুল্লাহ চৌধুরী।

সৈয়দা সাজেদা চৌধুরীকে দেশের সবচেয়ে বড় নারী সংগঠক বর্ণনা করে জাফরুল্লাহ চৌধুরী বলেন, এটা আমরা অনেকে ভুলে গেছি। তার অবদান আমাদের মনে রাখতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের সময় আমরা যখন হাসপাতাল করি, যখন লোক পাচ্ছিলাম না, তখন তিনি মেয়েদের পাঠিয়েছিলেন। আমি মনে করি, মুক্তিযুদ্ধে নারী নেতাদের মধ্যে উনি ছিলেন এক নম্বরে।

এ সময় সাজেদা চৌধুরীর ছেলে সাহাব আকবর চৌধুরী লাবু বলেন, বঙ্গবন্ধুর আদর্শ থেকে সারা জীবনে একদিনের জন্যও বিচ্যুত হননি। তার আত্মার মাগফেরাত কামনা করার জন্য সবার কাছে দোয়া চাচ্ছি। সেই পঁচাত্তরের পনেরই আগস্ট হত্যার পর এই মানুষ রাজপথে নেমেছিলেন, তখন বড় বড় আওয়ামী লীগের নেতারা কিন্তু খন্দকার মোশতাকের মন্ত্রিসভায় যোগ দিয়েছিলেন। আর তিনি একজন মহিলা হয়েও যখন ছিয়াত্তরে রাজনীতি করার অনুমতি দেওয়া হয়, তখন আওয়ামী লীগের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব নেন। তার পর থেকে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত প্রতিটা আন্দোলন-সংগ্রামে আওয়ামী লীগের জন্য কাজ করেছেন আমার মা। বঙ্গবন্ধুকন্যা শেখ হাসিনাকে বাংলাদেশে আনার জন্য সর্বোচ্চ চেষ্টা করেছেন এবং তার সঙ্গে আমার বাবাও একজন মুক্তিযোদ্ধা, যিনি মাকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করেছেন। আমার মা মৃত্যুর আগ পর্যন্ত বঙ্গবন্ধুর আদর্শ ও বঙ্গবন্ধুকন্যার প্রতি লয়ালিটি রেখে গেছেন।

ফরিদপুর-২ আসনের নির্বাচনে সাজেদা চৌধুরীর প্রতিদ্বন্দ্বী প্রয়াত বিএনপি মহাসচিব কে এম ওবায়দুর রহমানের মেয়ে শামা ওবায়েদও এসেছিলেন শ্রদ্ধা জানাতে। বিএনপির এই সাংগঠনিক সম্পাদক বলেন, সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী মুক্তিযুদ্ধের সময় থেকে এই পর্যন্ত অত্যন্ত পরিচিত একটি মানুষ, একটি উজ্জ্বল নক্ষত্র। উনি বাংলাদেশের রাজনীতিতে অবিস্মরণীয়। আমার বাবার সঙ্গে উনি রাজনীতি করেছেন, আমার বাবার সঙ্গে উনি প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন, কিন্তু দেখা হয়েছে, রাজনীতি-দলের ওপরেও উনাদের সম্পর্ক ছিল।

শহীদ মিনার থেকে বিকাল ৪টা ২০ মিনিটের দিকে প্রয়াত সাজেদা চৌধুরীর মরদেহ নিয়ে আসা হয় বঙ্গবন্ধু এভিনিউতে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে। আওয়ামী লীগের সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠন যুবলীগ, কৃষকলীগ, স্বেচ্ছাসেবক লীগ, শ্রমিক লীগসহ বিভিন্ন সংগঠনের তরফ থেকে শেষ শ্রদ্ধা জানানো হয়। বাদ আসর বায়তুল মোকাররম জাতীয় মসজিদে আরেকটি জানাজা শেষে বনানী কবরস্থানে দাফন করা হয় এই বীর মুক্তিযোদ্ধাকে।